বাংলা ফন্ট

সৌদি আরবে বাংলাদেশি নারী পরিণত হচ্ছে যৌনদাসীতে

09-02-2017
নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম

সৌদি আরবে বাংলাদেশি নারী পরিণত হচ্ছে যৌনদাসীতে ঢাকা: কর্মসংস্থানের জন্য প্রতিবছর বাংলাদেশের অনেক মানুষ বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান খাত হিসেবে উপরের দিকে রয়েছে জনশক্তি রপ্তানি খাত। ১৯৭৬ সালে ৬ হাজার ৬৭ জন কর্মী পাঠানোর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি প্রক্রিয়া শুরু হয়। সরকারিভাবে এক কোটি দশ লাখ মানুষ বিদেশে কাজ করছে বলা হলেও, ধারণা করা হয় দুই কোটিরও অধিক বাংলাদেশি বিভিন্ন দেশে শ্রম দিচ্ছেন । বর্তমানে ১৬০ টি দেশে বাংলাদেশি শ্রমিক রয়েছে, তবে মধ্যপ্রাচ্যেই সবচেয়ে বেশি।

পুরুষের পাশাপাশি কর্মসংস্থানের জন্য নারীদেরও পাঠানো হচ্ছে বিভিন্ন দেশে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) থেকে জানা যায়, ১৯৯১ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত ৩ লাখ ৪৩ হাজার ৮৪৫ জন নারী কর্মী বিদেশে গিয়েছে। এর বেশিরভাগই গিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে যা প্রায় ৮৪ শতাংশ। ১৮ শতাংশের মত গিয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে। বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী বেশি নারী কর্মী গিয়েছে আরব আমিরাতে। ২০০৪ এর জুন থেকে ২০১৬ পর্যন্ত দেশটিতে মোট ১ লাখ ১৬ হাজার ৫৫০ জন নারী কর্মী গিয়েছে।

সৌদি আরবে দীর্ঘদিন শ্রমিক পাঠানো বন্ধ ছিল। গত বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি দেশটির সাথে জনশক্তি রপ্তানির জন্য নতুন করে চুক্তি হয় এবং ন্যূনতম ৮০০ রিয়াল মজুরিতে ২০ হাজার নারী শ্রমিক পাঠানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। সৌদি সরকার দুই লাখের বেশি নারী কর্মীর চাহিদা জানালেও বাংলাদেশ থেকে প্রতি মাসে দশ হাজার নারী কর্মী পাঠানোর কথা বলা হয়। তবে সৌদি সরকার জানিয়েছে তারা প্রায় দুই লাখ নারীর জন্য ভিসা প্রস্তুত রেখেছে।

সৌদি আরবে যাবার ক্ষেত্রে নারীকর্মীদের সমস্ত খরচ বহন করে সৌদি নিয়োগকারী সংস্থা। নারীদের আকৃষ্ট করতে বেসরকারী উদ্যোগে বিনা খরচে এক মাসের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। এছাড়াও সরকারী ২৬টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে আরবি ভাষা, গৃহস্থালীর কাজকর্ম এবং সৌদি নিয়ম-কানুন শেখানো হচ্ছে। এ ব্যাপারে ঢাকায় একটি সৌদি নিয়োগকারী সংস্থা আল শারক’র ব্যবস্থাপক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ‘বাংলাদেশ থেকে আরো বেশি নারীকর্মী সৌদি আরবে দরকার। বাংলাদেশি গৃহপরিচারিকা আমাদের জনগনের পছন্দ, কারণ তারা মুসলিম এবং কাজে বেশ ভালো।’
কিন্তু গত বছরে সৌদি আরবে যাওয়া অনেক নারীই ফিরে এসেছে বাংলাদেশে। এর কারণ খুঁজতে গিয়ে উঠে এসেছে বাংলাদেশি নারী কর্মীদের উপর নানা ধরণের নির্যাতনের কাহিনী। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হল নারী কর্মীরা সেখানে প্রতিনিয়ত যৌন নিগ্রহের শিকার হচ্ছে। সম্প্রতি ময়মনসিংহের এক নারী সৌদিতে গণধর্ষনের শিকার হচ্ছেন বলে জানা গেছে, ফলে সৌদিতে নারী কর্মীদের অবস্থা নিয়ে আবারও বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে।

সৌদি আরবে যাবার ২৬ দিন পর ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার ঐ নারী তার স্বামীকে ফোন করে জানান, ‘আমি প্রতিদিন ওদের গণনির্যাতনের শিকার হচ্ছি, আমাকে বাঁচাও’। নান্দাইলের এই দিনমজুর স্বামী ঢাকার একটি রড সিমেন্টের দোকানে কাজ করতেন। বছর পাঁচেক আগে রড বহন করতে গিয়ে এক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে চলে আসেন বাড়িতে। বাম কাঁধ ভেঙে যাওয়ার ফলে তিনি হয়ে পড়েন কর্মহীন। গত বছর তার স্ত্রী নরসিংদীর কিছু নারীর সাথে সৌদি আরবে যান কাজের জন্য । গত ১৮ ডিসেম্বর তিনি তার স্বামীকে ফোন করে জানান তাকে একটি চারতলা ভবনে আটকে রেখে প্রতিদিন গণনির্যাতন চালানো হয়। স্বামীর পরামর্শে ঐ নারী কৌশলে পালিয়ে গেলেও পুলিশ তাকে ধরে ফেলে এবং ঐ নারীর মালিক তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। পরে আর কোনো যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি তার সাথে। দিনমজুর স্বামী বলতে পারছেন না তার স্ত্রী বেঁচে আছে কিনা। অবশ্য ওই নারীর স্বামী ইতোমধ্যেই একজনের নাম উল্লেখ করে নান্দাইল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। নান্দাইল থানার ওসি দালালদের নাম, পরিচয় জানিয়ে অভিযোগ করার প্রেক্ষিতে ব্যবস্থা নেবার কথা জানিয়েছেন।

সৌদি আরব থেকে ফেরত আসা কয়েকজন নারীর সাথে কথা বলে সেখানকার অবস্থা আরেকটু বোঝা যাবে। এরকম একজনই বলছিলেন তার স্বপ্নভঙ্গের কথা। তিনি বলেন, ‘দশ-পনের দিন ভালই ছিলাম। কিন্তু আমারে বাড়িতে ফোন করতে দেয় না, বাড়ির বাইরেও যাইতে দেয় না।’ তবে এই নারীর ভয়াবহ অভিযোগটি হল যৌন হয়রানির। তিনি বলেন, ‘আমি সারাদিন কাম কাজ-করি, পরে যখন রাইতে ঘুমাইতে যাবো তখন বাড়ির মালিক আমার ঘরে গিয়া ডিস্টার্ব করতো।’ পরে কৌশলে অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করে দেশে ফেরত আসেন তিনি। তিনি বলছিলেন, ‘আমি তো দেহ ব্যবসা করতে যাই নাই। আমি তো গেছি কামের জন্য, কাম করমু, ভাত খামু, পয়সা ইনকাম কইরা পোলাপান মানুষ করমু। কষ্টের লাইগা গেছি।’ একই অভিজ্ঞতার শিকার হয়ে দেশে ফিরে আসেন রূপগঞ্জের রহিমা। অতিরিক্ত কাজের চাপ আর যৌন নির্যাতনে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।

সৌদি আরবে শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে যে চুক্তি ছিল তা ভঙ্গ করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। কারণ চুক্তিতে বলা ছিল- নারীকর্মীরা মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারবে এবং প্রয়োজনে যে কারো সাথে যোগাযোগ করতে পারবে, এক্ষেত্রে মালিক কোনো বাধা দিতে পারবে না। তবে শ্রমমন্ত্রী নুরুল ইসলাম নারী শ্রমিকদের উপর এসব নির্যাতনের অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন,‘ অনেক সময় দেশে ফিরে আসার জন্য নারী শ্রমিকরা নানা মিথ্যা কথা বলেন। তারা সেখানে গিয়ে ভাত খেতে চান। কিন্তু সৌদি আরবের মানুষ ভাত খায় না, রুটি খায়। তখন বাংলাদেশি শ্রমিকেরা ভাত দেয়া হয় না এমন অভিযোগ তোলেন। অনেক নারী

(২য় অংশ)-----শ্রমিকের মধ্যে হোম সিকনেস কাজ করে। তখন তারা ফিরে আসার জন্য নানা কাহিনী সৃষ্টি করে।’ এই বক্তব্যের সাথে প্রতারক দালার চক্রের কথার সাদৃশ্য পাওয়া যায়। এমনকি মন্ত্রীর এই বক্তব্য যে ভিত্তিহীন তা বোঝা যায় সৌদি প্রবাসী বাংলাদেশিদের কথাতেও। তারা বলছেন যে, জঘন্য সব বিকৃত যৌন রুচির অশিক্ষিত-বর্বর এক শ্রেণির সৌদি পুরুষদের ২৪ ঘণ্টা সেক্স ভায়োলেন্সের মুখে বাংলার গ্রামের অবলা নারীরা নিজেদের কতটা সামাল দেবে তা নিয়ে তাদের মাঝে তোলপাড় চলছে। তাছাড়া ইদানিং ইউটিউব-এ প্রায়ই ভেসে আসে সৌদি পুরুষদের দ্বারা প্রবাসী নারীদের যৌন নির্যাতনের নতুন নতুন ভিডিও।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশের তুলনায় সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মীদের বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকতে হয়। আর তাই সেখানে নারী গৃহকর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সরকারকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে।
এদিকে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের অনুসন্ধান বলছে, অভিবাসন বিষয়ক বেসরকারি সংস্থাগুলোর মতে- কর্মস্থলে নির্যাতনের কারণে ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কা তাদের নারীদের সৌদি আরবে পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে সৌদি আরব এখন গৃহকর্মী নিতে বাংলাদেশের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। প্রবাসী সাংবাদিক ও কলামিস্ট মাইনুল ইসলাম নাসিম তার এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলেন, ‘অব্যাহত ও ক্রমবর্ধমান যৌন নির্যাতনের যাবতীয় রেকর্ড আমলে নিয়ে ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া এবং শ্রীলঙ্কা সরকার যেখানে সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মী পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে, সেখানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নিজে একজন ‘ধার্মিক নারী’ হওয়া সত্ত্বেও মা-বোনদের ইজ্জত রক্ষায় কেন নড়েচড়ে বসছেন না, এই প্রশ্ন এখন গোটা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে। অন্যান্য দেশ ‘হাউজ মেইড’ পাঠানো স্থগিত রাখায় সৌদি আরব তার দেশের নাগরিকদের চাহিদা পূরণে সম্প্রতি বেছে নিয়েছে বাংলাদেশকে। অথচ অধিকাংশ সৌদিরাই গৃহকর্মীদের ‘ট্রিট’ করেন দাস-দাসী হিসেবে এবং তাদের সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনকে ‘নিজস্ব শরীয়ত’ মোতাবেক ‘হালাল’ মনে করে থাকেন।

একটা চরম সত্য হল সৌদি বিবাহিত নারীরাই তাদের নিজেদের মেয়ে সন্তানকে নিরাপদ মনে করেন না ঘরের স্বামী-ভাই-দেবর বা অন্য পুরুষের কাছ থেকে। আবার অধিকাংশ সৌদিরা এতটাই বিকৃত রুচির যে, অতীতে ফিলিপাইন ইন্দোনেশিয়া ও শ্রীলঙ্কান নারী গৃহকর্মীদের অধিকাংশকেই বাধ্য করেছেন বিকৃত সেক্সে। এর মধ্যে একটি হল অ্যানাল সেক্স। অর্থাৎ সরাসরি পায়ুপথের সঙ্গম। এমনকি সর্বোচ্চ রেটিং সম্পন্ন পর্নোগ্রাফিতে যা যা থাকে, ঠিক হুবহু তা করানো হয় নারী গৃহকর্মীদের দিয়ে। নিজগৃহে অপেক্ষাকৃত কম বয়সী সৌদিরা তাদের বন্ধু-বান্ধবদের বিনোদন নিশ্চিত করতে বিদেশি গৃহকর্মীদের বাধ্য করেন গ্রুপ সেক্সের মতো কঠিন কাজেও। অনিয়ন্ত্রিত যৌনাচারের ফলে এসব নারীরা বিভিন্ন রোগেও আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। জীবিকার তাগিদে ইচ্ছার বিরুদ্ধে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়া বাংলাদেশিরা জানান, ‘বাসা- বাড়িতে হাউজ মেইড যারা রাখেন তাদের শতকরা নব্বই ভাগই ঐ ক্যাটাগরির’। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে- এক শ্রেণির সৌদিরা উচ্চ মোহরানার বিনিময়ে সৌদি নারীকে বিয়ে করতে রাজী নন এবং সহজলভ্য হাউজ মেইডদের নিয়োগ দিয়ে জৈবিক চাহিদা মিটিয়ে থাকেন। শুধু তাই নয়। সৌদি পুরুষদের এই চরিত্র ছড়িয়ে পড়েছে অন্যান্য দেশেও।  ইয়াহিয়া আ. আলজাহরানি নামের সৌদি আরবের বেইজিং দূতাবাসে নিযুক্ত এক কূটনীতিক সম্প্রতি সিঙ্গাপুরে ছুটি কাটাতে গিয়ে এক হোটেল কর্মীকে যৌন হেনস্থা করেন। ফলে সিঙ্গাপুরের আদালত তাকে সেদেশের আইন অনুযায়ী বেত্রাঘাত এবং ২৬ মাসের বেশি কারাদ- দিয়েছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রামরু’র চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. তাসনীম এ সিদ্দীকি বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের যে রাষ্ট্রগুলো রয়েছে, তার মধ্যে সৌদি আরব একজন নারী শ্রমিকের জন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এখন পর্যন্ত তাদের নিরাপত্তায় সরকার যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, তা দিয়ে সৌদিতে নারী শ্রমিক প্রেরণ করা যাবে না’। বিষয়টি নিয়ে সাবেক রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ জাফর সেখানে আমাদের দূতাবাস এবং প্রাইভেট রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলেছেন।

এই পরিস্থিতিতে সরকার যদি সৌদি আরবের সাথে চুক্তি অনুযায়ী নারী গৃহকর্মী প্রেরণ করা অব্যাহত রাখে তাহলে সেটা হবে একটা আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত। তাছাড়া সেখানকার এমন পরিস্থিতিতে ঠিক কতজন নারী সৌদি আরবে যেতে চাইবে সেটাও একটা প্রশ্ন। সরকার যদি ব্যাপারটাকে দায়সারাভাবে এড়িয়ে যায় তাহলে প্রশ্ন দেখা দেবে, আমরা কি সৌদি পুরুষদের জন্য হাউজ মেইড-এর নামে যৌনদাসী সরবরাহ করছি?

ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম/এইচএমএল


সর্বশেষ সংবাদ