বাংলা ফন্ট

জামদানি শিল্পে দুর্দশা, তাঁতিরা ঝুঁকছেন অন্য পেশায়

26-09-2018
নিজস্ব প্রতিবেদক

জামদানি শিল্পে দুর্দশা, তাঁতিরা ঝুঁকছেন অন্য পেশায়
বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পরও দুর্দশা কাটেনি জামদানি শিল্পের। ভালো নেই এ শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। পেটের ভাত জোটে না এর কারিগরদের। সংশ্লিষ্টরা জানান, সৌন্দর্য, নকশা, বুনন আর ঐতিহ্যে এ দেশের গর্বের পণ্য জামদানি। ইউনেস্কোর ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজ তালিকাতেও রয়েছে জামদানি। কিন্তু জামদানির ব্র্যান্ডিংয়ে সরকারি-বেসরকারিভাবে যে উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল তা নেওয়া হয়নি। এই শিল্পের উদ্যোক্তাদের জন্য নেই স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদী ব্যাংক ঋণের সুবিধা। ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় তাঁতিরা ঝুঁকছেন অন্য পেশায়।

প্রাচীনকালের মিহি মসলিন কাপড়ের উত্তরাধিকারী হিসেবে জামদানি শাড়ি বাঙ্গালী নারীদের অতি পরিচিত। মসলিনের উপর নকশা করে জামদানি কাপড় তৈরি করা হয়। জামদানি বলতে সাধারণতঃ শাড়িকেই বোঝান হয়। তবে জামদানি দিয়ে নকশী ওড়না, কুর্তা, পাগড়ি, রুমাল, পর্দা প্রভৃতিও তৈরি করা হত। ১৭০০ শতাব্দীতে জামদানি দিয়ে নকশাওয়ালা শেরওয়ানির প্রচলন ছিল। এছাড়া, মুঘল নেপালের আঞ্চলিক পোশাক রাঙ্গার জন্যও জামদানি কাপড় ব্যবহৃত হত।

জামদানি শাড়ির নামকরণ নিয়ে বিভিন্ন মত প্রচলিত আছে। ‘জামদানি’ শব্দটি ফারসি শব্দ। ফারসিতে ‘জামা’ শব্দের অর্থ কাপড় ও ‘দানা’ শব্দের অর্থ হল বুটি। অর্থাৎ ‘জামদানি’ শব্দের অর্থ হল বুটিদার কাপড়। অনেকে মনে করেন মুসলমানেরাই ভারতীয় উপমহাদেশে জামদানি শাড়ির প্রচলন করেছিলেন। তবে আজকের জামদানি শাড়ি বাংলার এই সুপ্রাচীন ঐতিহ্যর প্রতীক হলেও এটি কিন্তু পুরোপুরি দেশীয় ঐতিহ্যেরও নয়। বরং মুঘল ও পারসিক ঐতিহ্যের এক সুন্দর মেলবন্ধন জামদানি শাড়িতে মিশে আছে।

তবে নকশা অনুযায়ী জামদানীর নানা নাম হয়ে থাকে যেমন তেরছা, জলপাড়, পান্না হাজার, করোলা, দুবলাজাল, সাবুরগা, বলিহার, শাপলা ফুল, আঙ্গুরলতা, ময়ূরপ্যাচপাড়, বাঘনলি, কলমিলতা, চন্দ্রপাড়, ঝুমকা, বুটিদার, ঝালর, ময়ূরপাখা, পুইলতা, কল্কাপাড়, কচুপাতা, প্রজাপতি, জুঁইবুটি, হংসবলাকা, শবনম, ঝুমকা, জবাফুল ইত্যাদি।

জামদানির প্রাচীনতম উল্লেখ পাওয়া যায়, কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র গ্রন্থে, পেরিপ্লাস অব দ্য এরিথ্রিয়ান সি বইতে এবং বিভিন্ন আরব, চীন ও ইতালীর পর্যটক ও ব্যবসায়ীর বর্ণনাতে। কৌটিল্যের বইতে বঙ্গ ও পুন্ড্র এলাকায় সূক্ষ্ম বস্ত্রের উল্লেখ আছে, যার মধ্যে ছিল ক্ষৌম, দুকূল, পত্রোর্ণ ও কার্পাসী।

নবম শতাব্দীতে আরব ভূগোলবিদ সোলায়মান তার গ্রন্থ স্রিল সিলাই-উত-তওয়ারিখে রুমি নামের রাজ্যে সূক্ষ্ম সুতি কাপড়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। তার বর্ণনা অনুসারে বোঝা যায়, রুমি রাজ্যটি আসলে বর্তমানের বাংলাদেশ। চতুর্দশ শতাব্দীতে বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা বাংলাদেশ পরিভ্রমণ করেন এবং সোনারগাঁও এলাকাস্থিত সুতিবস্ত্রের প্রশংসা করেছেন। যোড়শ শতাব্দীর শেষের দিকে ইংরেজ পর্যটক র্যালফ ফিচ ও ঐতিহাসিক আবুল ফজলও ঢাকার মসলিনের প্রশংসা করেছেন।

আরেক ঐতিহাসিক টেলরের জামদানির বর্ণনা দিয়েছেন। তার বর্ণনানুসারে সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে ১০*২ হাত মাপের ও ৫ শিক্কা ওজনের একটুকরা আব-ই-রওয়ান এর দাম ছিল ৪০০ টাকা। সম্রাট আওরঙ্গজেবের জন্য তৈরি জামদানির দাম ছিল ২৫০ টাকা। ১৭৭৬ সাল পর্যন্ত ঢাকায় সবচেয়ে উৎকৃষ্টমানের জামদানির মূল্য ছিল ৪৫০ টাকা।

ঐতিহাসিক বর্ণনা, শ্লোক প্রভৃতি থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় দুকূল বস্ত্র থেকে মসলিন এবং মসলিনে নকশা করে জামদানি কাপড় তৈরি করা হত। মূলতঃ ঢাকা জেলাতেই মসলিন চরম উৎকর্ষ লাভ করে। ঢাকা জেলার সোনারগাঁও, ধামরাই, তিতাবাড়ি, বাজিতপুর, জঙ্গলবাড়ি প্রভৃতি এলাকা মসলিনের জন্য সুবিখ্যাত ছিল। ইউরোপীয়, ইরানী, আর্মেনিয়ান, মুগল, পাঠান প্রভৃতি বণিকেরা মসলিন ও জামদানি ব্যবসায়ের সাথে যুক্ত ছিলেন। এ কারণে তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধানেরাও এই শিল্প বিকাশে ভূমিকা রেখেছেন।

ঢাকাই মসলিনের স্বর্ণযুগ বলা হয় মুঘল আমলকে। এ সময় দেশে-বিদেশে মসলিন, জামদানির চাহিদা বাড়তে থাকে এবং শিল্পেরও ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়। আঠারো শতকে ইংরেজ দলিল থেকে জানা যায় মলমল খাস ও সরকার-ই-আলি নামের মসলিন সংগ্রহ করার জন্য দারোগা-ই-মলমল পদবীর উচ্চ পর্যায়ের রাজ কর্মচারী নিযুক্ত ছিলেন। প্রতিটি তাঁতখানায় একটি দপ্তর ছিল এবং এখানে দক্ষ তাঁতি, নারদিয়া, রিপুকার প্রভৃতি কারীগরদের নিবন্ধন করে রাখা হত। দারোগার প্রধান কাজ ছিল মসলিন ও জামদানি তৈরির বিভিন্ন পদক্ষেপে লক্ষ্য রাখা। তৎকালীন সময়ে ঢাকা থেকে প্রায় একলক্ষ টাকা মূল্যমানের মলমল-খাস মোঘল দরবারে রপ্তানি করা হত।

১৭৪৭ সালের হিসাব অনুযায়ী দিল্লীর বাদশাহ, বাংলার নবাব ও জগৎ শেঠের জন্য প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টাকার জামদানি কেনা হয়। এছাড়া ইউরোপীয় ব্যবসায়ীগণ প্রায় নয় লাখ টাকার মসলিন কেনে। তবে আঠারো শতাব্দীর শেষের দিকে মসলিন রপ্তানি অনেকাংশে হ্রাস পায়। ১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার শাসনভার গ্রহণ করে। এদের নিযুক্ত গোমস্তারা নিজেদের স্বার্থে তাঁতিদের উপর নির্যাতন শুরু করে। তাঁতীরা কম মূল্যে কাপড় বিক্রি করতে রাজী না হলে তাদের মারধোর করা হতো। অবশ্য তাঁতীদের উপর অত্যাচার ঠেকাতে কোম্পানি আইন প্রণয়ন করেছিল।

১৭৮৭ সালে জেমস ওয়াইজ এর মতে ৫০ লাখ এবং জেমস টেইলরের মতে ৩০ লাখ টাকার মসলিন ইংল্যান্ডে রপ্তানি করা হয়েছিল। কিন্তু ১৮০৭ সালে এই পরিমাণ ৮.৫ লাখ টাকায় নেমে আসে এবং শেষ পর্যন্ত ১৮১৭ সালে রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে ব্যক্তিবিশেষের মাধ্যমেই কেবল ইউরোপে মসলিন পাওয়া যেত।

উনিশ শতকের মাঝামাঝি জামদানি ও মসলিনের এক হিসেব থেকে দেখা যায় সাদা জমিনে ফুল করা কাজের ৫০,০০০ টাকার জামদানি দিল্লী, লক্ষ্মৌ নেপাল, মুর্শিদাবাদ প্রভৃতি এলাকার নবাবরা ব্যবহার করতেন। এই শিল্প সংকুচিত এবং পরে বিলুপ্ত হওয়ার পেছনে কিছু কারণ ছিল, যার মধ্যে প্রধান কারণ ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লব। এর ফলে বস্ত্রশিল্পে যন্ত্রের আগমন ঘটে এবং কম মূল্যে ছাপার কাপড় উৎপাদন শুরু হয়। এছাড়া দেশী সূতার চেয়ে তখন বিলেতি সূতার দাম কন ছিল। তৎকালীন মোঘল সম্রাট ও তাদের রাজ কর্মচারীরা এ শিল্পের প্রতি অমনোযোগী হয়ে পড়েন। ফলে ধীরে ধীরে মসলিন ও জামদানি শিল্প কালের গহ্বরে হারিয়ে যায়।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর জামদানি কিছুটা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পায়। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ঢাকার অদূরে  ডেমরা-য় জামদানি পল্লীর তাঁতিরা কিছুটা আর্থিক সাহায্য পেয়েছেন। তবে মেধা ও শিল্পের সঠিক পারিশ্রমিক না পাওয়ায় অন্যান্য অঞ্চলের তাঁতিরা ইদানীং এ শিল্প টিকিয়ে রাখতে উৎসাহ বোধ করছেন না। কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার মাধুরাপুর গ্রামের অচল তাঁতগুলি তাঁর নীরব সাক্ষী। অথচ এখানেই এক সময় সূক্ষ্ম মিহি কাপড় থেকে শুরু করে ১০০/৩০০ কাউন্টের সুতার চাদর ও নকশি কাপড় অর্থাৎ জামদানি তৈরি হতো। জামদানি শিল্পখ্যাত কিশোরগঞ্জের জঙ্গলবাড়িরও একই দশা।

তবে বহু বাধা অতিক্রম করে জামদানি একবিংশ শতাব্দীতে এসেও তাঁর ঐতিহ্য রক্ষা করে টিকে আছে। বর্তমানে এর প্রধান সমস্যা, তাঁতশিল্পীরা সঠিক পারিশ্রমিক পান না। একটি ভাল জামদানি শাড়ি তৈরি করতে তাদের এক থেকে দুই মাস সময় লেগে যায়। সে তুলনায় তারা মজুরি পান খুব কম।

অথচ কারুকার্য ও বাহারি নকশার ফলে আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে এখনো জামদানি শাড়ির কদর দেশের পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে। আর এটাকেই পুঁজি করে নকল জামদানিতে বাজার ভরে গেছে। দাম কম হওয়ায় ক্রেতারা নকল জামদানি কিনে প্রতারিত হচ্ছেন। শুধু তাই নয়, ভারত তাদের উপ্পাদা জামদানিকে ঢাকাই জামদানি বলে বিক্রি করছে। অথচ ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ায় জামদানির স্বত্ত্ব কেবল বাংলাদেশেরই। কোনো দেশ জামদানি উত্পাদন কিংবা বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি করতে চাইলে স্বত্ব দিতে হবে বাংলাদেশকে।
 
জামদানি শাড়ীর চাহিদাকেই পুঁজি করে নকল জামদানিতে বাজার ভরে গেছে। কিভাবে চিনবেন কোনটি আসল আর কোনটি নকল জামদানি?
 
জামদানি শাড়ি কয়েক ধরনের হয়, যেমন সূতি জামদানি, হাফ সিল্ক জামদানি, সিল্ক জামদানি। সম্পূর্ণ হাতের বুননের জামদানিই প্রকৃতপক্ষে আসল জামদানি। হ্যান্ডলুমের জামদানি পরতে যেমন আরামদায়ক, টিকেও অনেক বছর। অন্যদিকে পাওয়ার লুমের জামদানি; যেগুলো আসলে কোনো জামদানিই না। জামদানির ডিজাইন নকল করে পলিস্টার সূতায় বুনে অল্প দামে তা বিক্রি করা হচ্ছে।
 
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজধানীর এক জামদানি শাড়ি বিক্রেতা বলেন, আসল-নকল জামদানির পার্থক্যতো দামেই। ৬/৭ হাজার টাকার নীচে তো কোনো জামদানিই হবে না। অথচ ২ হাজার টাকাতেও জামদানি পাওয়া যাচ্ছে। আমাদের ক্রেতাদের জামদানির প্রতি দুর্বলতা আছে। আর এটাকেই পুঁজি করে টাঙ্গাইল ও রাজশাহীর শাড়ীতে জামদানির নকশা করে তা জামদানি বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ভারত থেকেও এ ধরনের শাড়ী প্রচুর আসছে। এগুলো আসলে নকল জামদানি। তবে দাম কম হওয়ায় ক্রেতাদের কাছে এর চাহিদা রয়েছে। এই পলিস্টার জামদানি দীর্ঘক্ষণ পরে থাকলে অস্বস্তি বোধ হয়। এছাড়া ত্বকের নানা সমস্যা হতে পারে।
 
এদিকে দেশের পাশাপাশি ভারতের বাজারেও নকল জামদানি বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যা ‘ঢাকাই জামদানি’ নামে বিক্রি হচ্ছে। এতে জামদানির বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ক্ষুণ্ন হচ্ছে সুনামও।
 
বর্তমানে জামদানি শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে ৬৮ হাজারেরও বেশি মানুষ সম্পৃক্ত। জামদানির চাহিদা থাকার পরও ভালো নেই এ শিল্পের কারিগররা। কারণ নকল জামদানিতে বাজার ভরে যাওয়ায় হাতের তৈরি জামদানির আসল কারিগররা মার খাচ্ছেন। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী পাওয়ার লুম দিয়ে পলিস্টার সুতায় জামদানি তৈরি করছেন। এতে ঐতিহ্য হারাচ্ছে জামদানি। অথচ হাতে একটি জামদানি তৈরি করতে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লাগে।
 
জামদানি কারিগররা বলছেন, এ শিল্প টিকিয়ে রাখতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব রয়েছে। এছাড়া কাঁচামাল ও উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি, দেশি কাপড়ের বাজার তৈরিতে সংকট, নতুন প্রযুক্তির যন্ত্রচালিত তাঁতের সঙ্গে সক্ষমতায় পেরে না ওঠা, বিপণন ব্যর্থতা, যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের অভাব ও পুঁজি সংকটে ধুঁকে ধুঁকে চলছে সম্ভাবনাময় এ শিল্প।

সর্বশেষ সংবাদ