বাংলা ফন্ট
সরকার ও ব্যাংকের সহযোগিতা জরুরী

অসন্ন ঈদে বিপর্যয়ের মুখে পড়বে চামড়া শিল্প

23-07-2018
বিশেষ প্রতিবেদক ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম

 অসন্ন ঈদে বিপর্যয়ের মুখে পড়বে চামড়া শিল্প
ঢাকা:  আসন্ন কোরবানির ঈদে বিপর্যস্ত হয়ে পড়তে পারে দেশের চামড়া শিল্প। কেননা এই সময়ই সংগ্রহ করা হয় অধিকাংশ কাঁচা চামড়া। ট্যানারি স্থানান্তরের ফলে পকেট শূন্য এবং ব্যাংক ঋণে জর্জরিত ট্যানারি মালিকগণ। এমত অবস্থায় সরকার এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে কোরবানির ঈদে সহযোগিতা মূলক বিশেষ উদ্যোগ না নেয়া হয় তাহলে চামড়া শিল্পের বিপর্যয় অনিবার্য।

চামড়া শিল্প দেশের অর্থনীতিতে অন্যতম রপ্তানি খাত। বেশ কিছু বছর ধরে এই শিল্পের ওপর বয়ে গেছে প্রতিবন্ধকতার ব্যাপক ঝড়। ঢাকার হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি মালিকদের নিজ নিজ কারখানা স্থানান্তর করতে হয়েছে সাভার হেমায়েতপুরের নব্য চামড়া শিল্পনগরীতে। এই স্থানান্তর কর্মকাণ্ডের ফলে ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে  ট্যানারি মালিকদের। নতুন শিল্পাঞ্চলে নতুন করে ভবন তৈরি নতুন উৎপাদন যন্ত্র স্থাপনে  ব্যয় করতে হয়েছে বিপুল অর্থ। ফলে উৎপাদন ব্যবস্থা যেমন ব্যাহত হয়েছে তেমনি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে বেড়েছে ট্যানারি মালিকদের ঋণের দায়।

এ বিষয়ে আর কে লেদার কমপ্লেক্সের চেয়ারম্যান মো. নুরুল আমিন সাপ্তাহিক ধাবমানকে বলেন- হাজারীবাগ ট্যানারির অনেক পুরন যন্ত্রাংশই নতুন কারখানায় স্থানান্তর করা সম্ভব ছিল না। ফলে স্ক্রাপ হিসেবে বিক্রি করে দিতে হয়েছে। যে কারণে ব্যাপক অর্থ সংকটে ভুগছে প্রায় সবগুলো ট্যানারি। অন্য দিকে সরকারের পক্ষ থেকে আজ পর্যন্ত রেজিস্ট্রেশন করে দেয়া হয়নি শিল্পাঞ্চলের প্লট। কাজেই আমরা যে ব্যাংকের কাছে কারখানা মডগেজ রেখে কিছু বাড়তি লোণ নেব সে ব্যবস্থাও বন্ধ।

এদিকে অনাদায়ী ঋণের পেরেশানি মাথায় নিয়ে নতুন করে অর্থ সহযোগিতাও দিতে পারছেনা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। নতুন করে অর্থ সহযোগিতার জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংগুলোর চাই বাড়তি মডগেজ কিন্তু সে ক্ষেত্রেও গলার কাঁটার মতো আটকে আছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। নতুন শিল্পাঞ্চলে বরাদ্দকৃত প্লট আজ অবধি সরকারের পক্ষ থেকে রেজিস্ট্রেশন করে দেওয়া হয়নি ট্যানারি মালিকদের। অথচ ট্যানারিগুলো নিজ নিজ প্লটে বিল্ডিং তৈরি করে মেশিনারিজ বসিয়ে রীতিমত উৎপাদন সচল রেখেছে।

এ বিষয়ে সালমা লেদার কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান হাজি আবুল বাসার সাপ্তাহিক ধাবমানকে বলেন- নতুন করে কনস্ট্রাকশনের কাজে চব্বিশ/পঁচিশ কোটি টাকা বাড়তি ইনভেস্ট করতে হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকার বা ব্যাংক কারো কাজ থেকেই কোন সুবিধা পাইনি। অন্তত বিসিক এর এই জমিটুকু যদি সরকার দ্রুত আমাদের নামে রেজিস্ট্রি করে দিত তাহলে হয়তো ব্যাংকের কাছ থেকে আমরা কিছুটা সুবিধা নিতে পারতাম।

দেশের সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে চামড়া শিল্পের গুরুত্ব দিনে দিনে বাড়লেও ব্যবস্থাপনার অভাবে ধ্বংসের পথে চলে যাচ্ছে বাংলাদেশের চামড়া শিল্প। রপ্তানি বাণিজ্যে জাতীয় অর্থনীতিতে চামড়া এবং চামড়াজাত পণ্যের অবস্থান দ্বিতীয়। স্থানীয় বাজারসহ দেশের বাইরেও চামড়া-চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা প্রচুর।প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বছরের ৪৮ ভাগ চামড়া পাওয়া যায় কোরবানীর ঈদে, ১০ ভাগ রোজার ঈদ ও শবেবরাতে, ২ ভাগ হিন্দুদের কালিপূজার সময়। তাই এসব উৎসব পূজা পার্বণে বাংলাদেশ থেকে পশুর চামড়া সংগ্রহের উদ্যোগ নেয় ভারতের সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে দেশের কিছু ভুঁইফোঁড় মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ী রাতারাতি বেশি মুনাফার লোভে পাচার করেন কাঁচা চামড়া। চামড়া পাচারকারীরা কোরবানীর ঈদের কয়েকদিন আগে বিভিন্ন সীমান্তের গ্রামে আশ্রয় নেয়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা, চোরাকারবারিসহ সন্ত্রাসী চক্রের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলে তারা। পরবর্তীকালে তাদের সহায়তায় অপকৌশল অবলম্বন করে সারাদেশ থেকে সংগ্রহ করা গরু, ছাগল, ভেড়া, মহিষ এর চামড়া পাচার করে দেয় ওপারে।

এ বিষয়ে এবিএস ট্যানারি লিমিটেড এর এমডি ইমাম হোসাইন সাপ্তাহিক ধাবমানকে বলেন- আসন্ন কোরবানি ঈদের আগে দেশের চামড়া শিল্পে ভয়াবহ বিপর্যয় আসতে পারে। কেননা আমাদের দেশের অধিকাংশ কাঁচা চামড়া সংগৃহীত হয় কোরবানির ঈদে। যেহেতু ট্যানারি স্থানান্তরের কারনে মালিকরা ঋণে জর্জরিত ফলে কাঁচামাল সংগ্রহের ক্ষেত্রে এটি বড় রকমের প্রভাব ফেলবে। এ অবস্থায় সরকার এবং ব্যাংকগুলো যদি ঈদের আগে সহযোগিতামূলক বিশেষ ব্যবস্থা না নেন তবে বিপর্যয় অনিবার্য।

 
বাংলাদেশে প্রস্তুতকৃত চামড়ার গুণগত মান ভাল হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারেও এর রয়েছে বেশ কদর। চামড়া শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, বড় বড় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি দেশের প্রায় সাড়ে চার হাজারের মতো জুতা, ব্যাগ প্রভৃতি চামড়া জাত পণ্য সামগ্রী তৈরির কারখানা রয়েছে। সুষ্ঠু জাতীয় নীতিমালার অভাব, সরকারের অবহেলা, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় সম্ভাবনাময় চামড়া শিল্প আজ চরম সমস্যা আবর্তে নিমর্জ্জিত। অথচ সম্পূর্ণ দেশীয় কাঁচামাল নির্ভর ও শস্তা শ্রমশক্তি নির্ভর চামড়া শিল্পের মাঝে নিহিত রয়েছে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ।

সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে গার্মেন্টস শিল্পের মতো চামড়া শিল্পও হতে পারে আরেকটি শক্তিশালী রপ্তানি খাত। বাংলাদেশ থেকে প্রধানত ইতালি, নিউজিল্যান্ড, পোল্যান্ড, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, জার্মানি, কানাডা, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়। এছাড়াও আরো বেশ কয়েকটি দেশে বাজার পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এমনকি মানসম্পন্ন হওয়ায় ভারতেও বাংলাদেশি চামড়ার অনেক কদর রয়েছে।

ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম/এইএমএল




সর্বশেষ সংবাদ