বাংলা ফন্ট

রেল কর্মচারীদের ছত্রছায়ায় টিকিট কালোবাজারি

11-06-2018
নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম

 রেল কর্মচারীদের ছত্রছায়ায় টিকিট কালোবাজারি

ঢাকা: রেলওয়ের টিকিটের কালোবাজারি বন্ধ হচ্ছে না। টিকিট বিক্রির পদ্ধতি যত আধুনিক হচ্ছে, অপকর্মের ধরনও তত পাল্টে যাচ্ছে। এর সঙ্গে রেলওয়ের কতিপয় কর্মচারী-কর্মকর্তা যুক্ত থাকায় অগ্রিম টিকিট ছাড়ার দিন থেকে টিকিট কালোবাজারি হচ্ছে।

বুকিং সহকারীদের ছত্রছায়ায় কালোবাজারি চক্রের সদস্যরা প্রায় ৭৫ শতাংশ টিকিট কেটে নেয়। এরপর টিকিটের কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে চক্রটি বেশি দামে টিকিট বিক্রি করে। বছরের পর বছর এমনভাবে চলে আসছে ট্রেনের টিকিটের কালোবাজারি।

ঢাকার কমলাপুর ও বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন হয়ে প্রতিদিন ৬৪টি আন্তঃনগর ও ১৩২টি লোকাল যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করে। ঈদ এলে ট্রেনের সংখ্যা আরও বেড়ে যায়। তবে ট্রেনের সংখ্যা বাড়লেও যাত্রীরা স্বাভাবিকভাবে টিকিট কাটতে পারেন না। কারণ ঈদের সময় কালোবাজারি চক্র বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে।

এ চক্রের সঙ্গে শুধু টিকিট বুকিং সহকারী নয়, বুকিং মাস্টার থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট স্টেশন মাস্টার ও ম্যানেজার জড়িত। বিশেষ কোটার নামেও চক্রটি টিকিট কেটে নেয়। এতে করে দ্বিগুণ দামে যাত্রীদের টিকিট কিনতে হচ্ছে।

এভাবে চক্রটি কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। আবার অতিরিক্ত টাকায় টিকিট কিনে অনেক যাত্রী ঝামেলায়ও পড়ছেন। কারণ চক্রটি জাল টিকিটও বিক্রি করছে।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, স্টেশন মাস্টার ও সহকারী বুকিং মাস্টারদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে আসছে কালোবাজারিরা। এক একটি চক্র একাধিক স্টেশনও নিয়ন্ত্রণ করছে। অভিযোগ, দুই অঞ্চলের (পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চল) বাণিজ্যিক কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততা ছাড়া কাউন্টার থেকে টিকিট কালোবাজারি করা সম্ভব নয়।

বুকিং মাস্টারদের সঙ্গে তাদের অবৈধ লেনদেন রয়েছে বলে জানা গেছে। রেলওয়ে বাণিজ্য বিভাগ, রেলওয়ে গোয়েন্দা বাহিনী সূত্র বলছে, প্রতিটি স্টেশনে টিকিট কালোবাজারি হচ্ছে। এ চক্রের সঙ্গে স্টেশন মাস্টার, ম্যানেজার, সহকারী বুকিং মাস্টার, রেলওয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও জড়িত রয়েছে। রেলপথে নিয়মিত চলাচলকারী হারুন-অর-রশিদ জানান, মাঝেমধ্যে বাধ্য হয়ে কালোবাজারি চক্রের কাছ থেকে তাকে অতিরিক্ত টাকায় টিকিট কাটতে হয়েছে।

একাধিক যাত্রীর অভিযোগ, প্রতিটি স্টেশনে শক্তিশালী টিকিট কালোবাজারি চক্র রয়েছে। পূর্বাঞ্চলের প্রতি স্টেশনে কাউন্টার থেকে টিকিট না পাওয়া গেলেও স্টেশন চত্বর থেকে অতিরিক্ত টাকায় টিকিট পাওয়া যায়। নিরুপায় হয়ে যাত্রীরা বেশি দামে টিকিট কাটে।

রেলওয়ে থানা জানায়, বুকিং সহকারী মাস্টারসহ টিকিট কালোবাজারিদের গ্রেফতার করা হলেও কয়েক মাস পর তারা জেল থেকে বের হয়ে আবার এ অবৈধ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে। চক্রের সদস্যরা পশ্চিমাঞ্চলের স্টেশন থেকে টিকিট কেটে অতিরিক্ত দামে সাধারণ যাত্রীদের কাছ বিক্রি করছে। কালোবাজারি চক্রের সদস্যরা টিকিট বিক্রির সময় নানা কৌশল অবলম্বন করে।

তাদের একটি সাধারণ কৌশল হল- ‘ভাই, নিজেদের জন্য টিকিটগুলো কেটেছিলাম। কিন্তু বিশেষ ঝামেলা হওয়ায় যাচ্ছি না, এখন টিকিটগুলো বিক্রি করতে চাই।’ এমন সব কৌশলে তারা টিকিট বিক্রি করে।

রেলওয়ে বাণিজ্য বিভাগ সূত্র জানায়, সারা দেশে ৪০০ জন টিকিট কালোবাজারির নামের তালিকা হলেও স্টেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নাম তালিকাভুক্ত করা হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাণিজ্য বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, স্টেশন মাস্টার কিংবা বুকিং মাস্টারের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব নয়। অধিকাংশ স্টেশন মাস্টার ও বুকিং সহকারীকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়ায় তাদের বিরুদ্ধে কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না। তাদের অনেকে সরাসরি টিকিট কালোবাজারির সঙ্গে জড়িত। অবৈধ টিকিট উদ্ধারসহ চক্রের সদস্যদের আটক করার পরও কালোবাজারি রোধ করা যাচ্ছে না।

খোদ রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগ সূত্র বলছে, সারা দেশে প্রায় ৪০০ টিকিট কালোবাজারি স্টেশন মাস্টার কিংবা সহকারী বুকিং মাস্টারদের সঙ্গে একটি নেটওয়ার্ক গড়ে টিকিট কালোবাজারি করে আসছে। একেকটি চক্র একাধিক স্টেশনও নিয়ন্ত্রণ করছে।

এদিকে কালোবাজারি ঠেকাতে ট্রেনের টিকিটে যাত্রীর নাম, বয়স যুক্ত করাসহ পরিচয়পত্র দেখিয়ে টিকিট কাটার উদ্যোগ নেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। ভোক্তভোগী যাত্রীদের ভাষ্য, বাণিজ্য বিভাগে সম্পৃক্ত কর্মকর্তা থেকে শুরু করে কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব দুদক কর্তৃক দেখা প্রয়োজন। অভিযোগ রয়েছে, দুই অঞ্চলের (পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চল) প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তার সম্পৃক্ততা ছাড়া বিশেষ করে কাউন্টার থেকে টিকিট কালোবাজারি সম্ভব নয়। বুকিং মাস্টারদের সঙ্গে তাদের অবৈধ লেনদেন রয়েছে বলে জানা গেছে।

এদিকে টিকিট কালোবাজারি প্রতিরোধে সোচ্চার থাকা কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের সাবেক বুকিং ক্লাক ইস্রাফিলকে (৬০) হত্যা করা হয়েছে। ২০১৩ সালের ৫ অক্টোবর কাউন্টারের ভেতর তাকে হত্যা করে তার কাছ থেকে ১৫ লাখ টাকা লুট করে নেয় দুর্বৃত্তরা।

কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন ম্যানেজার সীতাংশু চক্রবর্তী জানান, টিকিট কালোবাজারি রোধে রেলওয়ে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সতর্কাবস্থায় থাকলেও তা রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। এজন্য যাত্রীদের সচেতন হতে হবে। তিনি আরও বলেন, কালোবাজারির টিকিট প্রায় ক্ষেত্রে নকল।

তিনি বলেন, টিকিটে যাত্রীদের নাম-বয়স সংযুক্ত করার উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে কলোবাজারি বন্ধ হবে। অপর এক কর্মকর্তা জানান, ই-টিকিটও কালোবাজারি হচ্ছে। একশ্রেণীর লোক ই-টিকিটের মাধ্যমে টিকিট কেটে স্টেশন চত্ব¡রে বেশি দামে বিক্রি করছে।

এ বিষয়ে জানতে পূর্বাঞ্চল রেলের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা সরদার শাহাদত আলীকে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি তা ধরেননি।

তবে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে সহকারী প্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক স্নেহাশীষ দাশগুপ্ত জানান, বাণিজ্যিক বিভাগের বিশেষ করে কোনো কর্মকর্তা টিকিট কালোবাজারির সঙ্গে জড়িত নয়। আমরা দিনরাত চেষ্টা করছি টিকিট কালোবাজারি রোধ করতে। আমি মনে করি, যাত্রীদের জন্য ১০ দিন আগে টিকিট ছাড়া নয়, ৫ দিন আগে টিকিট ছাড়া হলে কালোবাজারি কমে আসবে। আমরা অত্যন্ত স্বচ্ছতার মধ্য দিয়ে কাজ করছি।

রেলওয়ে মহাপরিচালক মো. আমজাদ হোসেন জানান, ট্রেনের টিকিট কালোবাজারি রোধে বিভিন্ন কৌশল নিয়েছি। এরপরও তা রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। যাত্রীদের চাহিদা বেশি থাকায় সুযোগটি নিচ্ছে কালোবাজারি চক্র। দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

এরপরও কতিপয় রেলওয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারী টিকিট কালোবাজারির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। তাদের গ্রেফতারসহ চাকরিচ্যুতও করা হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে টিকিট কালোবাজারিদের বিরদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

রেলপথ মন্ত্রণালয় সচিব মো. মোফাজ্জেল হোসেন জানান, রেলপথে যাত্রীদের চাহিদা অনেক। সীমিত টিকিট থাকায় সবাইকে টিকিট দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। কালোবাজারি রোধে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ কঠোর হচ্ছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, এর সঙ্গে রেলওয়ের কেউ সম্পৃক্ত থাকলে তাকে ছাড় দেয়া হবে না। কালোবাজারিদের কাছ থেকে টিকিট না কিনে তাদের ধরিয়ে দিতে তিনি যাত্রীদের প্রতি আহ্বান জানান। সূত্র: যুগান্তর

ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম/এইএমএল



সর্বশেষ সংবাদ