বাংলা ফন্ট

মিলেমিশে মাদক ব্যবসা করছেন জনপ্রতিনিধিরা

29-05-2018
নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম

 মিলেমিশে মাদক ব্যবসা করছেন জনপ্রতিনিধিরা


ঢাকা: সাবরাং ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ নম্বর সংরক্ষিত ওয়ার্ডের মহিলা মেম্বার মরজিনা আক্তার। একই ইউনিয়নের ৪, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মহিলা মেম্বার হচ্ছেন আনোয়ারা ছিদ্দিকা। ২০১৩ সালের ৯ মার্চ গৃহপরিচারিকা নিলু আক্তারকে নিয়ে টেকনাফ থেকে কক্সবাজার যাচ্ছিলেন তারা। কিন্তু উপজেলার মরিচ্যা চেকপোস্টে তাদের তল্লাশি করে চার হাজার পিস ইয়াবা পায় বিজিবি। হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার শাহ আলমকেও ইয়াবাসহ আটক করেছিল আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। এভাবে মাদকের সঙ্গে সখ্য করেই সীমান্তবর্তী উপজেলা টেকনাফকে জনপ্রতিনিধিরা বানিয়েছেন 'মাদকাসক্ত' এক শহর।

টেকনাফ ও উখিয়ার বর্তমান ও সাবেক অন্তত ৫০ জনপ্রতিনিধির নাম আছে মাদক পাচারের তালিকায়!

এ প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ বলেন, 'একটি জনপদের বেশিরভাগ জনপ্রতিনিধির সঙ্গে এভাবে মাদকের সখ্য তৈরি হওয়া পুরো দেশের জন্য অশনিসংকেত। এরা প্রায় প্রত্যেকেই জনপ্রতিনিধি হওয়ার আগেই অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। অঢেল টাকার মালিক হয়ে পরে জনপ্রতিনিধি হয়েছেন সবাই। এদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি মাদকের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট  কেউ যাতে জনপ্রতিনিধি হতে না পারে, সে ব্যাপারে কঠোর অবস্থানে যেতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোকেও।'

টেকনাফে মাদক ব্যবসা করছেন জনপ্রতিনিধিরা :টেকনাফ-উখিয়ার সাংসদ এমপি বদির পাঁচ ভাই, এক ফুফাতো ভাই, দুই বেয়াই ও এক ভাগ্নের নাম আছে তালিকায়। সাবেক সাংসদ মোহাম্মদ আলীর দুই ছেলে মোর্শেদ ও রাশেদেরও নাম আছে। আছেন টেকনাফের উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর আলম ও তার তিন ছেলে মোস্তাক, দিদার ও শাহজাহান মিয়াও। এর মধ্যে তিন বছর ধরে নিখোঁজ রয়েছেন মোস্তাক। উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান রফিক উদ্দিনও আছেন মাদক পাচারের তালিকায়।

শুধু এমপি বা উপজেলা চেয়ারম্যানরা নন, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরাও মিলেমিশে করছেন মাদক পাচারের ব্যবসা। তালিকায় তাই নাম আছে টেকনাফের সাবরাং ইউপির চেয়ারম্যান নূর হোসেন, সাবেক চেয়ারম্যান হামিদুর রহমান, প্যানেল চেয়ারম্যান শামসুল আলম, নয়াপাড়ার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মোহাম্মদুর রহমান, ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন দানু ও হাবিবুর রহমান ওরফে হাবিব মেম্বারের। এ ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি মেম্বার আকতার কামাল সম্প্রতি নিহত হয়েছেন বন্দুকযুদ্ধে। সম্পর্কে এমপি বদির বেয়াই ছিলেন তিনি।

টেকনাফের সদর ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান শাহজান মিয়া, একই ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান ২ নম্বর ওয়ার্ড হাতিয়াঘোনার ইউপি সদস্য মো. আবদুল্লাহ, ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আজমুল্লাহ, ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য হামিদ হোসেন ওরফে হামিদ ডাকাত, ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য মো. হামজালাল ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য এনামুল হকের নামও আছে মাদক পাচারের তালিকায়।

টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আজিজ উদ্দিন, হ্নীলা ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য জামাল হোসেন, একই ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নুরুল হুদা, লেদার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মোহাম্মদ আলী, ৩ নম্বর ওয়ার্ডের শামসুল আলম ওরফে বাবুল, মহিলা মেম্বার মরজিনা আক্তার ও আনোয়ারা ছিদ্দিকার সঙ্গেও আছে মাদক পাচারকারীদের সখ্য।

টেকনাফের 'মাদকাসক্ত' আরেক ইউনিয়ন হচ্ছে হোয়াইক্যং। এ ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য রাকিব আহমেদ, ১ নম্বর ওয়ার্ডের সিরাজুল মোস্তফা ওরফে লালু, ৬ নম্বর ওয়ার্ডের শাহ আলম, ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নুর বশর নুরসাদ, ১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর শাহ আলম, ৫ নম্বর ওয়ার্ডের রেজাউল করিম মানিক ও সাবেক কাউন্সিলর হাজি মো. ইউনুছকেও মাদকের পৃষ্ঠপোষক বলছে সরকারি তালিকা। এখানকার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. একরামুল হক সম্প্রতি র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন।

মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এর আগে করা তালিকায় নাম আছে এমপি বদির আপন ভাই মো. আবদুল শুক্কুর, মজিবুর রহমান ও শফিকুল ইসলামের। সৎভাই আবদুল আমিন, ফয়সাল রহমান, ভাগ্নে নিপু, এমপির মামা হায়দার আলী, এমপির মামাতো ভাই কামরুল ইসলাম রাসেল এবং বেয়াই শাহেদ কামালের নামও আছে তালিকায়। এর মধ্যে বদির ভাই মুজিবুর রহমান ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর। তিনি টেকনাফ পৌরসভার প্যানেল চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করছেন।

আঙুল ফুলে কলাগাছ উখিয়ার জনপ্রতিনিধিরাও :টেকনাফের মতো উখিয়ায়ও মাদকের সখ্য রয়েছে বেশ কিছু জনপ্রতিনিধির। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তালিকায়ও বিভিন্নভাবে এসেছে এদের নাম। পালংখালী ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের হাজি আবদুল মজিদের ছেলে ইউপি সদস্য বখতার আহম্মদ সম্প্রতি ৫০ হাজার পিস ইয়াবাসহ ঢাকায় গ্রেফতার হয়েছেন। একসময়ে তিনি গাড়ির হেলপার হিসেবে কাজ করলেও এখন কোটিপতি। ওই ব্যবসা এখন নিয়ন্ত্রণ করছেন তার ছোট ভাই জাহাঙ্গীর আলম। একই ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মো. হোছেনের ছেলে ইউপি সদস্য মো. জয়নাল। ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৃহত্তর সিন্ডিকেট গঠন করে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন তিনি। নিয়মিত ইউনিয়ন পরিষদের কার্যালয়েও দাপ্তরিক কাজ করছেন।

একইভাবে ৫ নম্বর ওয়ার্ডের হাছিম আলীর ছেলে ইউপি সদস্য নুরুল আমিন মেম্বার। একসময়ের লাকড়ি বিক্রেতা ছিলেন তিনি। এখন ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। এলাকায় পরোয়া করেন না তিনি কাউকেই। পালংখালী ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য ফজল কাদের ভুট্টো। পুলিশ শীর্ষ সন্ত্রাসী ও অস্ত্র ব্যবসায়ী হিসেবে চেনে তাকে।

রাজাপালং ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মৃত গোরা মিয়ার ছেলে ইউপি সদস্য আবদুর রহিম। একসময়ে গরু-মহিষের রাখাল হিসেবে কাজ করলেও এখন ইউপি সদস্য তিনি। বর্তমানে ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে বৃহত্তর সিন্ডিকেট তৈরি করেছেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে লাখ লাখ পিস ইয়াবা পাচার করে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন রাতারাতি। জনশ্রুতি রয়েছে, ইয়াবার কালো টাকার দাপটেই ইউপি সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। হলদিয়া পালং ইউনিয়নের বড়বিল এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য জাহাঙ্গীর আলম। দিনমজুর ছিলেন একসময়। ইয়াবা ব্যবসা করে এখন অনেক টাকার মালিক।

কে কী বলেন : টেকনাফ-উখিয়ার সাংসদ আবদুর রহমান বদিকে গতকাল বিকেলে এসএমএস পাঠানো হলেও ফোন রিসিভ করেননি তিনি। তবে বেসরকারি একটি টিভি চ্যানেলকে রোববার দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, তার নাম মাদকের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পেছনে মিডিয়ার কারসাজি রয়েছে। তিনি নিজে কখনই মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। কেউ প্রমাণও করতে পারবে না বলেও দাবি করেন তিনি।

এদিকে, তালিকায় দুই ছেলের নাম থাকার কথা স্বীকার করে সাবেক সাংসদ মোহাম্মদ আলী বলেন, 'এমপি বদি ও তার অনুসারীরা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকেই আমার দুই ছেলের নাম তালিকাভুক্ত করেছে। এলাকার মানুষ জানে, আমার ছেলেরা কে কী করে।'

উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর আহমেদ বলেন, 'আমাকে বিতর্কিত করতেই দুই ছেলের সঙ্গে আমার নামও সরকারি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যারা আমার রাজনৈতিক উত্থানে ঈর্ষান্বিত, তারাই প্রভাব খাটিয়ে আমাদের নাম তালিকাভুক্ত করেছে।' জনপ্রতিনিধিদের কেউ কেউ মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি আরও বলেন, 'তালিকায় অনেক জনপ্রতিনিধির নাম আছে। বেশিরভাগই কোনো না কোনোভাবে মাদকের সঙ্গে যুক্ত। অনেকে একসময় নিম্নবিত্ত পরিবারের থাকলেও এখন অঢেল সম্পদের মালিক। তবে কেউ কেউ রাজনৈতিক হয়রানি থেকেও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, সত্য এটাও।' সূত্র: সমকাল

ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম/এইএমএল


সর্বশেষ সংবাদ