বাংলা ফন্ট

সংশোধনের নামে বাড়ছে প্রকল্প ব্যয়

19-05-2018
নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম

 সংশোধনের নামে বাড়ছে প্রকল্প ব্যয়

ঢাকা: দেশের উন্নয়নের স্বার্থে প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। প্রকল্প শুরুর দিকে যে ধরনের লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয় তা শেষ পর্যন্ত অব্যাহত থাকে না। শুরুর পর পরই আবেদন পড়ে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর অথবা সংশোধনের। এ সময় বাড়ানোতে একদিকে যেমন বাস্তবায়নের সময় বাড়ে অন্যদিকে বাড়ে প্রকল্প ব্যয়। এতে উভয় দিকে ক্ষতির সম্মুখীন হয় সরকার। এ কারণে সরকার প্রতি বছরই হাজার কোটি টাকা গচ্ছা দিচ্ছে। প্রকল্পের উন্নয়ন প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রণয়নে ত্রুটি, রেট সিডিউল পরিবর্তন, মাঝপথে নতুন অঙ্গ সংযোজনের নামে কালক্ষেপণ, দূরদর্শিতার অভাব, মনিটরিংয়ের দুর্বলতা, প্রকল্প পরিচালক (পিডি) পরিবর্তন, অর্থছাড়ে বিলম্বসহ কমপক্ষে ১০টি কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে।

সূত্র জানায়, অগ্রসরমান শিল্পের মধ্যে ওষুধ শিল্প বাংলাদেশের অন্যতম। এ শিল্পের আমদানি নির্ভরতা কমাতে ২০০৮ সালে এপিআই শিল্পপার্ক নির্মাণ প্রকল্পের অনুমোদন দেয় সরকার। ওই বছরের ৫ মে প্রকল্পটির অনুমোদন দেয় একনেক। ২১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১০ সালেই মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। অথচ ২০১৮ সালে এসেও প্রকল্পের কাজ শেষ হচ্ছে না। তৃতীয়বারের মতো প্রকল্প সংশোধন করা হয়েছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩১৮ কোটি টাকা এবং শেষ হবে ২০২০ সালে। এতে ২ বছরের এই প্রকল্পের মেয়াদ বেড়েছে প্রায় ১০ বছর। আর এ জন্য সরকারকে অতিরিক্ত গুনতে হবে প্রায় ১৬৮ কোটি টাকা। প্রশ্ন উঠেছে রাজধানীর পাশে এপিআই শিল্পপার্ক স্থাপন প্রকল্পের মতো জাতীয় গুরুত্বপূণ প্রকল্প বাস্তবায়নের এমন করুণ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল দীর্ঘসূত্রিতা রোধে কঠোর পদক্ষেপের কথা জানালেও তা মানা হচ্ছে না। পরিকল্পনামন্ত্রী এ পরিস্থিতি রোধে বাধ্যবাধকতা দেয়ার কথাও উল্লেখ করেন। এ ক্ষেত্রে প্রতি প্রান্তিকে বরাদ্দের ২৫ শতাংশ অর্থ ব্যয়ের নির্দেশ দেন তিনি। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নে যতদিন সময় লাগবে, ঠিক ততদিনই দেয়া হবে। কোনোভাবেই অতিরিক্ত সময় না দেয়ারও হুঁশিয়ারি দেন।

সূত্র আরো জানায়, নানা অজুহাতে বাস্তবায়ন সময় ও ব্যয় বাড়ানোয় ২০১৬ সালে ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পেই সরকারের গচ্ছা গেছে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। এভাবে প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানোয় সরকারের ক্ষতি নিয়ে এ পর্যন্ত কোনো তদন্ত হয়নি। এমনকি দায়িত্বে অবহেলার জন্যও কাউকে দায়ী করা হয়নি। আইএমইডি বলছে, ভবিষ্যতে প্রকল্প প্রণয়নের সময় বাস্তবসম্মতভাবে ব্যয় ও সময় নির্ধারণে অধিক সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। ঘনঘন প্রকল্প পরিচালক বদলি বা পরিবর্তন না করার বিষয়ে সচেষ্ট থাকতে হবে এবং প্রকিউরমেন্ট (কেনাকাটা) সংক্রান্ত সব কাজ যাতে চুক্তি মূল্যের মধ্যে সমাপ্ত হয় সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

এদিকে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে চলতি বছর প্রকল্প সংশোধনের হিড়িক পড়েছে। গত দুটি একনেক সভায়ই ৭টি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প সংশোধন আকারে পাস করা হয়। তারমধ্যে ৪টি প্রকল্পই আবার তৃতীয়বারের মতো সংশোধন করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারির একনেক সভায় ১৪টি প্রকল্প পাস হয়। এর মধ্যে এপিআই শিল্প পার্ক নির্মাণসহ ৫টি প্রকল্পই সংশোধন করে অনুমোদন দেয়া হয়। অন্য প্রকল্পগুলো হলো- নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় ৩য় শীতলক্ষ্যা সেতু নির্মাণ (১ম সংশোধিত)

প্রকল্প, জননিরাপত্তা বিভাগের ৭টি র‌্যাব কমপ্লেক্স নির্মাণ (২য় সংশোধিত) প্রকল্প, জরুরি ২০০৭ ঘূর্ণিঝড় পুনরুদ্ধার ও পুনর্বাসন প্রকল্প (ইসআরআরপি) : এলজিইডি অংশ (৩য় সংশোধিত) প্রকল্প, জরুরি ২০০৭ ঘূর্ণিঝড় পুনরুদ্ধার ও পুনর্বাসন প্রকল্প (ইসআরআরপি) : প্রকল্প সমন্বয় এবং পর্যবেক্ষণ ইউনিট (পিসিএমইউ) অংশ (৩য় সংশোধিত) প্রকল্প। এদিকে গত ২৩ জানুয়ারি একনেকে ১৪টি প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়। যার মধ্যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প সংশোধিত। এদিন পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার গাজনার বিলের সংযোগ নদী খনন, সেচ সুবিধার উন্নয়ন এবং মৎস্য চাষ (৩য় সংশোধিত) (প্রস্তাবিত) প্রকল্প পাস করা হয়। একনেকের ওই সভায় জাহাজ ও সাগর তীরের মধ্যে ২৪ ঘণ্টা যোগাযোগ প্রতিষ্ঠায় জিএমডিএসএস এবং ইন্টিগ্রেটেড মেরিটাইম নেভিগেশন সিস্টেম স্থাপন (১ম সংশোধিত) প্রকল্প পাস করা হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক চাপে নতুন প্রকল্প যুক্ত করার কারণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং দ্রুত সমাপ্তযোগ্য প্রকল্পগুলো অর্থ সংকটে পড়ে। ফলে তা সংশোধন করে ব্যয় বাড়াতে হয়। এতে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ গচ্ছা যাচ্ছে। পাশাপাশি প্রকল্পের গুণগত বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। প্রকল্প সংশোধন একটি পুরনো কৌশল। এতে আর্থিক অনিয়ম অনেক বেড়ে যায়। সরকারের অর্থের অপচয় ঘটে। আর তাই বারবার প্রকল্প সংশোধনের নামে ব্যয় বাড়িয়ে কোটি কোটি টাকা গচ্ছা দেয়ার রীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

সূত্র মতে, প্রকল্পের উন্নয়ন প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রণয়নে ত্রুটি, নানা ধরনের অনিয়ম, রেট সিডিউল পরিবর্তন, মাঝপথে নতুন অঙ্গ সংযোজনের নামে কালক্ষেপণ, দূরদর্শিতার অভাব, মনিটরিং না থাকা বা দুর্বল তদারকি, ঘনঘন প্রকল্প পরিচালক (পিডি) পরিবর্তন, সংশ্লিষ্টদের দক্ষতার অভাব, অর্থছাড়ে বিলম্ব, জটিল ও ব্যতিক্রমী কাজের ক্ষেত্রে অনেক সময় টার্ন কি ঠিকাদারের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা এবং প্রকল্প ঝুলিয়ে রেখে বেতন ও অন্যান্য সুবিধা ভোগের প্রবণতার কারণেই প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় ও ব্যয় বাড়ছে।

এ বিষয়ে সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য ড. শামসুল আলম বলেন, অনেক প্রকল্প প্রস্তাবে খরচ সুনির্দিষ্ট থাকে না। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক বা অন্য পরিকল্পনার কোনো অংশের সঙ্গে প্রকল্পের সামঞ্জস্য করা হয় না। প্রকল্প দলিল তৈরির সময় লগফ্রেম সঠিকভাবে পূরণ করা হয় না। প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সমন্বয়হীনতা, ধারণাগত দুর্বলতা ও ডিপিপির ক্রয় পরিকল্পনায় সুনির্দিষ্ট ক্রয় পদ্ধতি উল্লেখ থাকে না। এসব কারণেও প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি ধীর হয়।

ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম/এইএমএল


সর্বশেষ সংবাদ