বাংলা ফন্ট

পার্বত্য জেলায় সশস্ত্র গ্রুপের দ্বন্দ্বে চলছে টার্গেট কিলিং

06-05-2018
নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম

 পার্বত্য জেলায় সশস্ত্র গ্রুপের দ্বন্দ্বে চলছে টার্গেট কিলিং
ঢাকা: তিন পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি এলাকা এখন সশস্ত্র চার গ্রুপের অভরণ্যে পরিণত হয়েছে। ভূমি যার বেশি, চাঁদা তার বেশি এই আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতায় নেমেছে সশস্ত্র চার গ্রুপ। এটাই তাদের মূল দ্বন্দ্ব। তারা শান্তি চুক্তির বাস্তবায়নে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকটাই খুন করার নিরাপদ এলাকা যেন এখন পাহাড়ী এলাকা। শান্তি চুক্তির পর এ পর্যন্ত ২১ বছরে সশস্ত্র গ্রুপের দ্বন্দ্বে ৮ শতাধিক খুন হয় এবং ১৫শ’ গুম হয়েছে। গুম হওয়াদের মধ্যে ৬০ ভাগ মুক্তিপণের টাকা দিয়ে জীবন বাঁচিয়েছে। বাকিদের বিভিন্ন জঙ্গলে লাশ ফেলে দেওয়া হয়। পরে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে। আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ বিভিন্ন দলে যোগদান করা নিয়ে পাহাড় অশান্ত হওয়ার তথ্য আগেই পায় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। জানা গেছে, আগে চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার ও ভাগবাটোয়া নিয়ে খুনখারাপি হলেও এখন আগামী নির্বাচনে কে কোন দলে যাবে তাই নিয়েই দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে।

পাহাড়ের জনপদে এখন অস্ত্রের ঝনঝনানি। সংস্কারপন্থি হিসেবে পরিচিত আরো তিন জনকে প্রকাশ্যে হত্যার ঘোষণা দিয়েছে। এই তিন নেতা হলেন জেএসএস সংস্কার নেতা তাতিন্দ্র লাল পেলে ওরফে মেজর পেলে (সাবেক শান্তি বাহিনীর কর্মকর্তা),  সুদর্শন চাকমা ও উজিত চাকমা। এ কারণে জনমনে ভর করেছে নানা শঙ্কা, ভয় ও আতঙ্ক। কোথায় কখন কার লাশ পড়ে সেই আতংকই যেন তাড়া করে ফিরছে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষকে। এই আতঙ্কের যথেষ্ট কারণও আছে। বার বার ঝরছে রক্ত। একটি খুনের রেশ না কাটতেই হচ্ছে আরেক খুন। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) নেতা শক্তিমান চাকমাকে হত্যা এবং পরদিন তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দিতে যাওয়ার পথে রাঙামাটিতে একটি মাইক্রোবাসে গুলি চালিয়ে পাঁচজনকে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া এমনও সংবাদ আছে সংঘাতের কারনে মৃতুবরনকারী অনেকের লাশ পাওয়া যাচ্ছে না।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, স্থানীয় রাজনৈতিক কোন্দলসহ নানা কারণে খুন-খারাবিতে জড়িয়ে পড়ছে পাহাড়ের সশস্ত্র আঞ্চলিক চার সংগঠন। এসব ঘটনায় যেমন খুন হচ্ছেন রাজনীতিক ও জনপ্রতিনিধি, আবার এসব ঘটনায় সন্দেহের তীর গিয়ে পড়ছে তাদের ওপরেই। একের পর এক খুন, অপহরণ ও চাঁদাবাজির ঘটনায় পাহাড়বাসীর মধ্যে বড় ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে। সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক ছড়াচ্ছে টার্গেট কিলিং। পক্ষ-প্রতিপক্ষ কেউ কাউকে ছাড় দিচ্ছে না। এত কিছুর পরও পাহাড়ে তত্পর সশস্ত্র গ্রুপগুলোর অপতত্পরতা ঠেকাতে পারছে না স্থানীয় প্রশাসন। জানা গেছে, পাহাড়ে খুনোখুনি, অপহরণ ও চাঁদাবাজির ঘটনায় বরাবর দায় প্রতিপক্ষের ওপরই চাপাচ্ছে আঞ্চলিক সংগঠনগুলো। ফলে নির্বিচারে একের পর এক খুন, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় আর চাঁদাবাজির ঘটনা বাড়ছে। উত্তপ্ত হচ্ছে পাহাড়ের পরিস্থিতি। অগ্নিসংযোগ, ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদের সঙ্গে ঘটেছে নারীনেত্রী অপহরণের মতো ঘটনাও। এতে আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে ৩ পার্বত্য জেলা।  অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িদের আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠন রয়েছে চারটি। এগুলো হলো- পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি, ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ), জনসংহতি সমিতি সংস্কারবাদী (এমএন লারমা) ও গণতান্ত্রিক ইউপিডিএফ। এখন হত্যাকান্ড পরিচালনা করছে ইউপিডিএফ।  এদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে জেএসএস-এমন অভিযোগ গণতান্ত্রিক ইউপিডিএফ থেকে করা হয়। এদিকে পার্বত্য বাঙ্গালি ছাত্র পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি আব্দুল মজিদ ও সাধারণ সম্পাদক শাহাদাত ফরাজী শাকিব এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে মাটিরাঙায় অপহূত তিন বাঙালি উদ্ধার ও বাঙালি গাড়ি চালক সজীব হাওলাদার হত্যাকারীদের গ্রেফতার ও উপজাতি সশস্ত্র সংগঠন জেএসএস ও ইউপিডিএফকে নিষিদ্ধ করার দাবি জানায়।

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর সরকারের সঙ্গে জনসংহতি সমিতির পার্বত্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর হয়। শান্তি চুক্তির পর ২০১৫ সনে জনসংহতি সমিতি ও ইউপিডিএফের মধ্যে অলিখিত সমঝোতা হলে সংঘাত বন্ধ থাকে। নবগঠিত ইউপিডিএফের হাতে গত বছরের ডিসেম্বর থেকে ৪ মে পর্যন্ত আক্রমন পাল্টা আক্রমনে উভয় পক্ষের অন্তত ৩৫ জন নিহত হয়েছে। সর্বশেষ যিনি ইউপিডিএফ থেকে বেরিয়ে গনতান্ত্রিক ইউপিডিএফ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সেই আলোচিত তপন জ্যোতি চাকমা ডাক নাম বর্মা গত ৪ মে প্রতিপক্ষের ব্রাশ ফায়ারে অপর তিনজন সঙ্গী এবং তাকে বহনকারী মাইক্রোবাসের চালকসহ নিহীত হন। ৩ মে নানিয়ারচর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমা নিহত হওযার পরদিনই জ্যোতি চাকমা বর্মা নিহত হন। শক্তিমান চাকমা এককালে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা ছিলেন। ছাত্রলীগ ছেড়ে তিনি যোন দেন সন্ত লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতিতে। পরবর্তীতে সেখানে থেকে ছুটে গিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) গড়ে তোলেন। সেই কমিটির তিনি ছিলেন কেন্দ্রীয় সহসভাপতি। শক্তিমান চাকমাদের এ অংশটি জনসাধারণ্যে সংস্কারপন্থি জেএসএস নামে পরিচিত হলেও তারা নিজেরা লেখে জেএসএস (এমএন লারমা)। পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক দল জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ভেঙে এ দলের সৃষ্টি হয়। দলভাঙ্গা আর চাঁদাবাজির ভাগাভাগি নিয়ে সম্পতিকালে টার্গেট কিলিং শুরু হয়।

মাঝখানে গত বছরের নভেম্বর পর্যন্ত বছরতিনেক পার্বত্যাঞ্চল অনেকটাই শান্ত ছিল। এ সময়ে পাহাড়ের তিন আঞ্চলিক সংগঠন জেএসএস (সন্তু লারমা), ইউপিডিএফ ও জেএসএস সংস্কারের (এমএন লারমা) মধ্যকার ‘অস্ত্র বিরতি’ চলছিল; কিন্তু ২০১৭ সালের ১৫ নভেম্বর ‘ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক’ নামের আরেক আঞ্চলিক পাহাড়ি সংগঠনের আত্মপ্রকাশের পর এই ‘সমঝোতা শান্তি’তে ছেদ পড়ে। অভিযোগ ওঠে- সংগঠনটি আত্মপ্রকাশের মাত্র ১৮ দিনের মাথায় খাগড়াছড়িতে ইউপিডিএফ সংগঠক মিঠুন চাকমাকে (৩৮) খুন করার পর পাহাড়ে খুন-খারাবি ছড়িয়ে পড়ে। এদিকে ২২ এপ্রিল খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার  মরাটিলা এলাকায় ইউপিডিএফ এর সাংগঠক ছিয়াং ত্রিপুরা  ওরফে কাতাং ত্রিপুরা (৪০) কে গুলি করে খুন করে। আহত হয় অনন্ত ত্রিপুরা।  জেএসএস(সংস্কার) হামলা চালায়। ১৯ এপ্রিল  মাটিরাংগার হাতিমুড়া এলাকায়  নতুন কুমার ত্রিপুরা(৪৫) এর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সে ইউপিডিএফ এর সদস্য।  তাকে কুপিয়ে  হত্যা করা হয়। ১৬ এপ্রিল খাগড়াছড়ি সদরের পেরাছড়ায় গুলি করে খুন করা হয় ইউপিডিএফ নেতা সূর্য বিকাশ ত্রিপুরা(৫০)কে।  ১৫ এপ্রিল খাগড়াছড়ি রাঙ্গামাটি সীমান্তে মারিশ্যা দীঘিনালা সড়কের জোরা ব্রিজ নামক স্থানে ইউপিডিএফ  কর্মী তপন চাকমা+৪০) ও একই সড়কের ৯ কিলো নামক স্থানে বিজয় চাকমা(৩২)কে  গুলি করে হত্যা করা হয়। ১৩ এপ্রিল ইউপিডিএফ এর সন্ত্রাসীদের হামলায়  গুইমারায়  মারমা  ঐক্য পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক কংজাই মারমাসহ দুইজনকে বেদম প্রহার করে আহত করে। ১১ মার্চ বাঘাইছড়িতে ইউপিডিএফ  সদস্য নতুন মনি চাকমা (৪২)কে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ৪ মার্চ রামগড়ের  পাতাছড়া নিজ বাড়ি  থেকে ইউপিডিএফ সন্ত্রাসীরা  চাইথুই  মারমা(৪৫) কে অপহরণ করে। সে বিএনপির  নেতা। এখনও  তাকে উদ্ধার  করা যায়নি। খাগড়াছড়িতে ইউপিডিএফ (প্রসিত) গ্রুপের সাথে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)  এবং জেএসএস (সংস্কার)  চাঁদাবাজি ও এলাকার আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘাত সংঘর্ষে লিপ্ত আছে।

রাঙামাটি পুলিশ সুপার মো. আলমগীর কবীর বলেন, ‘পাহাড়ে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পাহাড়ে শান্তি বজায় রাখতে পুলিশ প্রস্তুত। নানিয়ারচর উপজেলার উক্ত দুটি হত্যাকান্ডের ঘটনায় জড়িত কেউ এখনো গ্রেফতার হয়নি।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, পাহাড়ে হত্যাকান্ডে জড়িতদের খুঁজে বের করা হবে।

ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম/এইএমএল


সর্বশেষ সংবাদ