বাংলা ফন্ট

হ্যাটট্রিক জয়ের লক্ষ্যে ছক কষেই প্রচারণায় আ.লীগ

28-02-2018
নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম

  হ্যাটট্রিক জয়ের লক্ষ্যে ছক কষেই প্রচারণায় আ.লীগ
ঢাকা: আগামী ডিসেম্বরেই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে— এমনটা ধরে নিয়েই রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তুতি চলছে জোরেশোরে। হ্যাটট্রিক জয়ের লক্ষ্যে ছক কষে দেশজুড়ে প্রচারণায় নেমেছে আওয়ামী লীগ। মার্চ মাসের প্রথম থেকে আওয়ামী লীগ সারা দেশে কেন্দ্রভিত্তিক ১২ লাখ পোলিং এজেন্টদের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করবে। দুর্নীতি দায়ে সাজাপ্রাপ্ত খালেদা জিয়ার মুক্ত করতে আইনি লড়াই ও ভোটের প্রস্তুতি দুটিই চালাচ্ছে বিএনপি। জাতীয় পার্টি (এ)সহ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক রাজনৈতিক দলগুলোও নির্বাচনী মাঠে নেমে পড়েছে। সব দলেই চলছে প্রচার, প্রার্থী বাছাই, নির্বাচনী ইশেতহার তৈরিসহ নির্বাচনভিত্তিক সার্বিক প্রস্তুতি।

জানা গেছে, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার পাঁচ বছরের সাজা, বিএনপির কর্মসূচি, আন্দোলন বা সমঝোতা কোনোদিকেই নজর না দিয়ে আওয়ামী লীগের ভাবনা এখন শুধু্ই নির্বাচন ও ভোটের দিকে। এ লক্ষ্যে দলের হাইকমান্ডের নির্দেশে মাঠে কাজ করছেন সর্বস্তরের নেতারা। সম্ভাব্য এমপিপ্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় এখন নিয়মিত যাতায়াত করছেন। স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছেন। গত ৩০ জানুয়ারি সিলেটের জনসভায় নৌকা মার্কায় ভোট চাওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি শুরু করেন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনী প্রচারণা। এরপর ৮ ফেব্রুয়ারি বরিশাল এবং সর্বশেষ ২২ ফেব্রুয়ারি রাজশাহীর জনসভায় নৌকামার্কায় ভোট চেয়েছেন। একই সঙ্গে জনসভাগুলোতে প্রধানমন্ত্রী জানিয়ে দিয়েছেন যে, ডিসেম্বরে আগামী নির্বাচন হবে। এদিকে আগামী ৩ মার্চ খুলনায় এবং ৭ মার্চ রাজধানীতে জনসভা করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এসব জনসভায়ও শেখ হাসিনা নৌকার পক্ষে ভোট চাইবেন। পর্যায়ক্রমে বিভাগীয় শহর শেষে গুরুত্বপূর্ণ জেলায়ও সফল করবেন শেখ হাসিনা।

এদিকে নির্বাচনী প্রস্তুতি অংশ হিসেবে আগামীকাল বৃহস্পতিবার থেকে কেন্দ্রভিত্তিক পোলিং এজেন্ট নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের কাজ শুরু করতে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ। ৮ মাসব্যাপী এ প্রক্রিয়ায় প্রায় ১২ লাখ কর্মীকে পোলিং প্রশিক্ষণ দেবে দলটি। ইতিমধ্যে ৬ পর্বে ৩শ’ সংসদীয় আসনে প্রশিক্ষণের জন্য একটি খসড়া সিডিউলও প্রস্তুত করা হয়েছে। সূত্র জানায়, পোলিং এজেন্টদের জন্য আওয়ামী লীগ এবার প্রথমবারের মতো দলীয় নির্দেশনামূলক কাগজপত্র ও নির্বাচনভিত্তিক বই সরবরাহ করবে। নিজস্ব ছাপাখানায় চলছে পোলিং এজেন্ট প্রশিক্ষণ গাইড ছাপানোর কাজ। এ গাইড বই ছাড়াও প্রশিক্ষণের সময় প্রশিক্ষণার্থীদের দেয়া হবে বিএনপি-জামায়াতের সহিংসতার ভিডিও সিডি, একটি স্থিরচিত্রের অ্যালবাম ও দলের মনোগ্রামসংবলিত একটি ব্যাগ।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের অধীনেই নির্বাচন হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নির্বাচনকালীন সরকার শুধু রুটিনমাফিক কাজ করবে। সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন পরিচালনার জন্য নির্বাচন কমিশনের চাহিদা মতো সব রকম সহায়তা করবে সরকার।

গত সপ্তাহে সাংবাদিক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘সংবিধানে যেভাবে রয়েছে সেভাবেই সময়মতো আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কারও জন্য নির্বাচন ঠেকে থাকবে না।’

২০১১ সালের ৩০ জুন সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলোপ করা হয়। সংবিধানের ১২৩ (৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে- (ক) মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভাংগিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাংগিয়া যাইবার পূর্ববর্তী নব্বই দিনের মধ্যে, এবং (খ) মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোন কারণে সংসদ ভাংগিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাংগিয়া যাইবার পরবর্তী নব্বই দিনের মধ্যে।’ সংবিধানের এই বিধান মতে, বর্তমান দশম জাতীয় সংসদের মেয়াদপূর্ণ করলে ২০১৮ সালের ৩১ অক্টোবর থেকে ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারির মধ্যে যে কোনো দিন ভোট হতে হবে। সর্বশেষ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। একই বছরের ২৯ জানুয়ারি নির্বাচিত সদস্যরা সংসদের প্রথম অধিবেশনে বসেছিলেন। এদিন থেকেই সংসদের ৫ বছরের মেয়াদ শুরু হয়েছে।

সরকারের চার বছর পূর্তি উপলক্ষে গত ১২ জানুয়ারি জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘সংবিধান অনুযায়ী ২০১৮ সালের শেষদিকে একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কীভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে তা আমাদের সংবিধানে স্পষ্টভাবে বলা আছে। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের আগে নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হবে। সেই সরকার সর্বতোভাবে নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচন পরিচালনায় সহায়তা দিয়ে যাবে।’

নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে দেশের প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই মেরুতে অবস্থান করছে। তবে খালেদা জিয়ার সাজা হওয়ার প্রেক্ষিতে বিএনপি এখন বিষয়টি নিয়ে আপাতত কিছু বলছে না। খালেদা জিয়াকে মুক্ত করেই নির্দলীয় সরকারের দাবি আদায়ে মাঠে নামার টার্গেট আছে তাদের। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা না দিলেও ভিতরে ভিতরে প্রস্তুতিতে পিছিয়ে নেই বিএনপি। দলটির বর্তমান হাইকমান্ড এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছেন। প্রার্থী বাছাই, ইশেতাহার তৈরি থেকে শুরু করে ভেতরে ভেতরে সব ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। সূত্র জানায়, দলের থিঙ্কট্যাঙ্কদের সহায়তায় সিনিয়র কয়েক নেতা আগামী নির্বাচনে ইশতেহার তৈরির কাজ করছেন। ভিশন-২০৩০ আলোকে এ ইশতেহার তৈরি করা হচ্ছে। চলেছে সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাইও। তিন ক্যাটাগরিতে প্রার্থী বাছাই করা হচ্ছে।

এদিকে নির্বাচনকে সামনে রেখে সম্ভাব্য প্রত্যেক প্রার্থীকেই এলাকায় গিয়ে কাজ করতে বলেছেন শেখ হাসিনা। ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগের ১৫টি টিম সারাদেশে কাজ শুরু করে দিয়েছে। টিমের নেতারা বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছেন, সাংগঠনিক সভা করছেন। কোনো জেলায় কোনো সমস্যা থাকলেও সেটারও সমাধান করছেন। নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের মধ্যে অন্তঃকোন্দলও মিটিয়ে ফেলছেন।

জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি (এ) বলছে, নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নিলেও মাঠে থাকবে তারা। অর্থাত্ বিএনপি না এলে জাপাসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াবে না। গত ২০ ফেব্রুয়ারি রংপুরে এক অনুষ্ঠানে জাপা চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ বিএনপির নির্বাচনে অংশ নেওয়া না নেওয়ার বিষয়ে বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করুক আর না করুক তাতে কিছু যায় আসে না। তাদের জন্য নির্বাচন বন্ধ হবে না, নির্বাচন হবে। ওই নির্বাচনে জাতীয় পার্টি (এ) অংশ নেবে। জানা গেছে, ইতিমধ্যে নির্বাচনে অংশ নেয়ার সার্বিক প্রস্তুতিও নিয়েছে দলটি। চূড়ান্ত করা হয়েছে ৩০০ আসনের প্রার্থীও।

১৪ দলীয় জোটের শরিকদের প্রস্তুতিও চলছে। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি ইতিমধ্যেই জেলা কমিটিগুলোকে নির্বাচনী প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশনা পাঠিয়েছে। দলটি প্রার্থী মনোনয়নের জন্য জেলা থেকে প্রস্তাব আহ্বানের পাশাপাশি যেসব স্থানে কমিটি গঠন বাকি আছে সেগুলো দ্রুত শেষ করছে। জাসদেরও নির্বাচনী প্রস্তুতি রয়েছে। যারা নির্বাচন করতে ইচ্ছুক তারা এলাকায় যাচ্ছেন, গণসংযোগ করছেন। বিভিন্ন ইসলামী দলসহ বাম ধারার দলগুলোও নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করবে ১৪ দলীয় জোট। এরসঙ্গে বেশ কয়েকটি প্রগতিশীল ধারার রাজনৈতিক দল নির্বাচনের আগে যুক্ত হতে পারে। এর বাইরে গণফোরাম, বিকল্পধারা, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, কমিউনিস্ট পার্টি, ইসলামী ধারার দলগুলো নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে।

ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম/এইএমএল


সর্বশেষ সংবাদ