বাংলা ফন্ট

দেশের গ্রাম অঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবা পরিস্থিতির উন্নয়ন প্রয়োজন

04-02-2018
অমিত বণিক

 দেশের গ্রাম অঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবা পরিস্থিতির উন্নয়ন প্রয়োজন
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক ।এ দেশের বেশিরভাগ মানুষই সঠিক স্বাস্থ্যসেবা পায় না। দেশে যে সব সরকারি হাসপাতাল রয়েছে অধিকাংশ হাসপাতালেই নেই পর্যাপ্ত ডাক্তার। যে সব ডাক্তারকে গ্রামে পোস্টিং দেয়া হয় তাদের বেশিরভাগই গ্রামে যেতে চরম অনীহা প্রকাশ করে। এতে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, তাদের মধ্যে সেবার মানসিকতা নেই। সরকারি ডাক্তারদের গ্রামে যাওয়ার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার নির্দেশ দিয়েছেন। এর ফল কতটুকু হয়েছে তা বলাই বাহুল্য। বেসরকারি হাসপাতালগুলোর চিত্রও সন্তোষজনক নয়। এসব হাসপাতালে গলাকাটা ফি নিয়ে থাকে। এর পাশাপাশি রোগী ও রোগীর আত্মীয়দের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু এসব তো নৈমিত্তিক ঘটনা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় লোকবল নেই। রয়েছে ওষুধ সঙ্কট যন্ত্রপাতির অভাবসহ নানা সঙ্কটে বলতে গেলে সারাদেশের স্বাস্থ্যসেবা ভেঙে পড়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে ইদানীং সরকারি নিয়মনীতির কোনো তোয়াক্কা না করেই ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। সারাদেশের সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পাশাপাশি বিভিন্ন চটকদার নামের বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসার নামে চলছে প্রতারণা।

সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে চলছে দালালদের দৌরাত্ম্য। চিকিৎসার মতো মহান পেশা এখন পুরোদমে লাভজনক বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা জনগণের মৌলিক অধিকার। অথচ সেই মৌলিক অধিকার থেকে দেশের মানুষ আজ বঞ্চিত। দেশে উচ্চবিত্তের জন্য চিকিৎসা সুবিধা বাড়ছে। একের পর এক তৈরি হচ্ছে অত্যাধুনিক হাসপাতাল। কিন্তু নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর চিকিৎসা ব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। চিকিৎসা ব্যয় কম থাকায় সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো সাধারণ মানুষের প্রধান ভরসা। কিন্তু এগুলোতে চিকিৎসা সেবার মান এতটাই নিম্নমুখী যে, মানুষ নিরুপায় না হলে সহজে সেদিকে পা বাড়াতে চায় না। সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স গুলোতে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, সুন্দর পরিবেশ এবং মানসম্মত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে। চিকিৎসা ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে সব ধরনের পদক্ষেপ নেয়াও জরুরি। বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে দিয়ে সবার জন্য সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা দরকার।

আমরা মনে করি, স্বাস্থ্য সেবা খাত সরকারের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। সরকারের কিছুটা অবহেলার ফলে চিকিৎসা সেবার খাতটি দিন দিন প্রাইভেট সেক্টরের দখলে চলে যাচ্ছে, বেড়ে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয়। এর ফলে মানসম্মত চিকিৎসা সেবা নেয়াটা দিন দিন নিম্নমধ্যবিত্ত ও গরিবের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। সরকার যদি স্বাস্থ্যখাতের দিকে মনোযোগী না হয় তবে কোনোভাবেই দেশের সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যাবে না।
সম্প্রতি স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরোর এক গবেষণায় দেখা যায় যে, বিভিন্ন রোগ ও স্বাস্থ্য সমস্যার পরামর্শ ও সেবা নেবার জন্য বাংলাদেশের মানুষদের শতকরা ২৩.৪ ভাগ ওষুধের দোকান বা ফার্মেসিতে যায়, শতকরা ১৯.৭ ভাগ মানুষ পরামর্শ ও ওষুধের জন্য গ্রাম্য ডাক্তারের শরণাপন্ন হন, শতকরা ১৬.২ ভাগ মানুষ ব্যক্তিগতভাবে এমবিবিএস বা বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নেন, শতকরা ৯.০ ভাগ মানুষ প্রাইভেট ক্লিনিকে যায়। অপরপক্ষে শতকরা ১২.১ ভাগ মানুষ উপজেলা হাসপাতাল, শতকরা ৯.০ ভাগ মানুষ জেলা হাসপাতাল বা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যায় এবং শতকরা ৪.১ ভাগ মানুষ সরকারি কমিউনিটি ক্লিনিক বা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে যায়। আন্তর্জাতিক গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআর,বি পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায় যে, শতকরা ৮৫ ভাগ মানুষ শারীরিক অসুস্থতার কারণে চিকিৎসাসেবা নিতে হাতুড়ে ডাক্তারের কাছে যায় এবং মাত্র শতকরা ১৫ ভাগ মানুষ শারীরিক অসুস্থতার কারণে চিকিৎসাসেবা নিতে এমবিবিএস ডাক্তারের কাছে যায়।

যদিও বাংলাদেশে গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, বিভাগ ও রাজধানী পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবাদানের জন্য পর্যাপ্ত হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবাদান কেন্দ্র নির্মিত হয়েছে ও বহু দক্ষ জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে কিন্তু এখনও দেশের ৪৩.১% মানুষকে কেন ফার্মেসী ও ডিগ্রিবিহীন ডাক্তারের কাছ থেকে স্বাস্থ্যসেবা ও ওষুধের ব্যবস্থাপত্র নিতে হচ্ছে । বিষয়টি নিয়ে জরুরী ভিত্তিতে স্বাস্থ্যখাতের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের বিবেচনা করা উচিত । সরকার চিকিৎসাসেবা প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছে । ২০১৪ সালে একযোগে ছয় হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দিয়ে পাঠানো হয়েছিল গ্রামে। তাঁদের ৭৫ শতাংশ এরই মধ্যে গ্রাম ছেড়েছেন। বাকিরাও গ্রাম ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। চিকিৎসকদের গ্রাম ছাড়ার নানা অজুহাত থাকে। অনেকেই উচ্চশিক্ষার জন্য গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় চলে আসেন। আবার ঢাকায় অনেক বিশেষায়িত হাসপাতালে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের চিকিৎসক না থাকলেও প্রেষণে নিযুক্ত অনেক চিকিৎসক আছেন, যাঁদের কোনো কাজ নেই। অনেকেই নিয়মিত হাসপাতালে হাজিরা দেন না। প্রেষণে কোনো না কোনো হাসপাতালে বদলি হয়ে এসে কাজ করেন বাইরের কোনো ক্লিনিক বা বেসরকারি হাসপাতালে। অন্যদিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রসহ সরকারি হাসপাতালগুলোর অবস্থা শোচনীয়। সেখানে ভবন আছে, বরাদ্দ আছে, চিকিৎসা সরঞ্জামও আছে; কিন্তু চিকিৎসা নেই। চিকিৎসা যারা দেবেন, সেই চিকিৎসকরা সেখানে থাকেন না।

পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, পটুয়াখালীর দুর্গম উপজেলা রাঙ্গাবালীতে কোনো সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নেই। পাশের উপজেলা গলাচিপার ওপর ভরসা করতে হয় ওই এলাকার মানুষকে। অবস্থা বিবেচনা করে গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকের পদ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল ৩৯টি। বাস্তবে সেখানে আছেন মাত্র ১৪ জন চিকিৎসক। গাইনি ও অ্যানেসথেসিয়ার কোনো চিকিৎসক নেই। পরিত্যক্ত হয়ে আছে আধুনিক যন্ত্রপাতিসংবলিত অপারেশন থিয়েটার। একইভাবে শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ২৫ চিকিৎসক পদের ২০টিই ফাঁকা। গাইবান্ধার কোনো উপজেলায়ই তিন-চারজনের বেশি চিকিৎসক নেই । সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলায় চিকিৎসকের পদ ৩৪টি। সেখানে আছেন সাতজন। কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাসহ চিকিৎসকের ২২টি পদ থাকলে ও সেখানে কর্মরত রয়েছেন ৭জন। অন্তত অর্ধেক সংখ্যক চিকিৎসকের পদায়নের বিকল্প নেই।
দেখা যাচ্ছে, সরকারিভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের কেউই গ্রামে থাকতে চান না। চিকিৎসকদের উচ্চশিক্ষার প্রয়োজন আছে। শিক্ষকতার মতো চিকিৎসাও এমন একটি পেশা, যেখানে নিরন্তর পাঠপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। একজন চিকিৎসককে সব সময় আপডেট থাকতে হয়। কিন্তু গ্রাম ছেড়ে চলে আসার মানসিকতা কেন? এটাও ঠিক যে সরকারি হাসপাতালে বদলি হওয়া চিকিৎসকদের জন্য এখন পর্যন্ত সর্বত্র পর্যাপ্ত আবাসনের ব্যবস্থা নেই। প্রয়োজনীয় আবাসিক অবকাঠামোর পাশাপাশি নিরাপত্তা নিয়েও ভাবতে হবে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকরা যেসব সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন, তা দূর করার উদ্যোগ দ্রুত নিতে হবে। পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলার মানসিকতাও চিকিৎসকদের থাকতে হবে। গ্রামে বদলির ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের সুযোগ-সুবিধার দিকটি সরকারের পক্ষ থেকে দেখা হচ্ছে। চিকিৎসকদের নিজ নিজ জেলা বা পার্শ্ববর্তী জেলায় পদায়ন করা হচ্ছে। স্বামী-স্ত্রী উভয়ে চিকিৎসক হলে তাঁদের একই কর্মস্থলে বা পাশাপাশি কর্মস্থলে পদায়নের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। শুধু মানসিকতা পরিবর্তনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। যা খুবই বিবেচ্য বিষয়।

দেশের গ্রামপর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে নানা ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ৩১ বেডের হাসপাতাল ৫০ বেডে উন্নীত করা হয়েছে, দেওয়া হয়েছে আধুনিক যন্ত্রপাতি। কিন্তু চিকিৎসকের অভাবে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে গ্রামের মানুষ। এ অবস্থা থেকে সবাই মিলে উত্তরণের পথ খুঁজে বের করতে হবে। তাহলেই গ্রাম অঞ্চলের স্বাস্থ্য সেবার মান উন্নয়ন সম্ভব।

সর্বশেষ সংবাদ