বাংলা ফন্ট

বাণিজ্যিক পানির নামে আমরা আসলে কী খাচ্ছি?

08-01-2018
অমিত বণিক

বাণিজ্যিক পানির নামে আমরা আসলে কী খাচ্ছি?


রাস্তাঘাট ও বাজার থেকে আমরা কী পানি কিনে খাচ্ছি, আমরা ‘বিশুদ্ধ’ নামের দূষিত পানি পান করছি? তাতে যদি এই অবস্থা দেখা যায়, তাহলে ‘সমন্বিত ব্যবস্থাপনা’ কতটা যে সঠিকতর, তা বলাই বাহুল্য। আমরা মনে করি, বৃহত্তর ব্যবস্থাপনার আগে সুপেয় পানির সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই হবে। সেই পানি নিয়েই এখন চলছে প্রতারণা ও বাণিজ্য!

ওয়াসা নগরবাসীর জন্য যে পানি সরবরাহ করছে তার মানও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। ‘ঢাকা ওয়াসা যে পানি সরবরাহ করে থাকে তাকে পুরোপুরি সুপেয় পানি বলা যাবে না। এর প্রধান কারণ হচ্ছে, ওয়াসা যেসব জায়গাকে পানির উৎস হিসেবে ব্যবহার করে তা এতটাই দূষিত যে পরিশোধনের পরও স্বাভাবিক অবস্থায় আসে না। এ ছাড়া ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টেও (পানি শোধনাগার) সঠিকভাবে পরিশোধন হয় না। পানি দুর্গন্ধমুক্ত করতে যে কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয় তা নিয়েও আরেক সমস্যা। পরিমাণে বেশি ব্যবহার করলে পানিতে কেমিক্যালের গন্ধ থাকে। আর পরিমাণে কম দিলে পানিতে দুর্গন্ধ থাকে। সব কিছু মিলিয়ে পানি সরবরাহের বিষয়টি নিয়ে ওয়াসাকে আরো যুগোপযোগী চিন্তাভাবনা করার এখনই সময়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যার বিষাক্ত হয়ে পড়া পানি শোধন করতে মেশানো হচ্ছে মাত্রাতিরিক্ত ক্লোরিন, লাইম (চুন) ও অ্যালাম (ফিটকিরি)। ফলে শোধনের পর অনেক সময় পানিতে ক্লোরিনের গন্ধ পাওয়া যায়। আবার পুরনো পাইপের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করায় পানিতে অনেক সময় দুর্গন্ধ পাওয়া যায়। কিছু এলাকায় পাইপলাইনে ফুটা করে অবৈধভাবে পানির লাইন দেওয়া হয়েছে। সেসব ফুটা দিয়ে ময়লা-আবর্জনা প্রবেশ করে পানিতে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে ফোটানোর পরও সেই পানি দূষণ মুক্ত করা যাচ্ছে না।

যদিও ওয়াসা কর্তৃপক্ষ বরাবরই তাদের সরবরাহ করা পানির মান নিয়ে সব আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়। ওয়াসার পানির পাইপলাইন লিকেজ হয়ে তাতে স্যুয়ারেজ লাইনের ময়লা পানি ঢুকে পড়ার আশঙ্কা থাকায় অনেকেই আমরা সাধারণ মানুষ নিরাপদ ভেবে ব্যবহার করছে জারের পানি। কিন্তু সম্প্রতি গবেষণায় দেখা গেছে, জারের পানি বিক্রি করে বিভিন্ন পানি বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান দুই হাতে টাকা আয় করলেও সে পানিও জনস্বাস্থ্যের জন্য মোটেই নিরাপদ নয়।

পানি সঙ্কট
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) একদল গবেষক জানিয়েছেন, রাজধানীর বাসাবাড়ি, অফিস-আদালতে সরবরাহ করা ৯৭ ভাগ জারের পানিতে ক্ষতিকর মাত্রায় মানুষ ও প্রাণীর মলের জীবাণু ‘কলিফর্ম’ রয়েছে। যা আমাদের জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নের জন্য বড় বাধা! বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই জার ভর্তি পানি জনস্বাস্থ্যের জন্য কতটা মারাত্মক ও হুমকিস্বরূপ। বিশুদ্ধ পানির নামে অপরিশোধিত দূষিত পানি সরবরাহের রমরমা ব্যবসা চলছে খোদ রাজধানী সহ সারাদেশেই। এসব কি দেখার কেউ নেই? কার কাছে উত্তর জানতে চাইবো? জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নের বড় বড় বক্তব্য যখন রাজধানীর দেয়ালে দেয়ালে পরিলক্ষিত হয় তখন বাস্তবিক অবস্থার চিত্র যে এর কতটা নিম্নমানের তা সহজেই অনুমেয়।

শাক-সবজিতে কীটনাশক দূষণ, বোতলজাত ও জার পানিতে বিদ্যমান খনিজ উপাদানের মাত্রা ও গুণাগুণ নির্ণয়ে বিএআরসি পরিচালিত গবেষণায় উল্লিখিত অনেক ভীতিকর তথ্য পাওয়া গেছে। গবেষকরা জানিয়েছে, তারা ঢাকাসহ সারা দেশ থেকে জার পানির গবেষণায় ২৫০টি নমুনা সংগ্রহ করেন। সংগ্রহ করা নমুনাগুলোতে টোটাল কলিফর্মের ক্ষেত্রে প্রতি ১০০ মিলিলিটার পানিতে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ মাত্রা পাওয়া গেছে যথাক্রমে ১৭ ও ১৬০০ এমপিএন এবং ফেকাল কলিফর্মের ক্ষেত্রে প্রতি ১০০ মিলিলিটার পানিতে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ মাত্রা ছিল যথাক্রমে ১১ ও ২৪০ এমপিএন। রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোড, চকবাজার, বাসাবো, গুলশান, বনানী থেকে পানির নমুনায় উল্লেখযোগ্য মাত্রায় টোটাল কলিফর্ম ও ফেকাল কলিফর্মের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। সদরঘাট এলাকার নমুনা সবচেয়ে দূষণযুক্ত নির্দেশ করে; যেখানে সর্বোচ্চ টোটাল কলিফর্ম ও ফেকাল কলিফর্মের উপস্থিতির পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ১৬০০ ও ২৪০ এমপিএন। গবেষকদের মতে, পানিতে টোটাল কলিফর্ম ও ফেকাল কলিফর্মের পরিমাণ শূন্য থাকার কথা, সেখানে ৯৭ ভাগ জারের পানিতেই দুটো জীবাণুর উপস্থিতি রয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, কলিফর্ম মূলত বিভিন্ন রোগ সৃষ্টিকারী প্যাথোজেন যেমন, ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও প্রোটাজেয়ার সৃষ্টিতে উৎসাহ জোগায় বা সৃষ্টি করে। বিভিন্ন রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া মানবদেহে নানাবিধ রোগ সৃষ্টি করে ক্রমাগত মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। ফলস্বরূপ পরবর্তী সময়ে যে কোনো রোগ সৃষ্টিকারী অণুজীব দ্বারা এই দেহ খুব সহজেই আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। আমরা জানি, সব মরণব্যাধির জন্ম দেয় দূষিত পানি। ডায়রিয়া, কলেরা, ক্যান্সার, হেপাটাইটিস, টাইফয়েট, ডায়াবেটিস ও কিডনি রোগের মূল কারণ এই দূষিত পানি। ঢাকাসহ সব সিটি করর্পোরেশন, পৌরসভায় সরবরাহ করা পানি সাল্পাই লাইন দূষিত। বোতল বা জারজাত পানির ৯০ ভাগই বিশুদ্ধ নয়। এমন ভয়াবহ চিত্র দেখতে পাচ্ছি। কেবল জারের পানিতে প্রাণঘাতী জীবাণুর উপস্থিতিই নয়, বাজারে থাকা বিভিন্ন কোম্পানির বোতলজাত পানিতেও বিএসটিআই নির্ধারিত মান না পাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।

নিরাপদ পানির গুরুত্ব উপলব্ধি করে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ১৭টির মধ্যে প্রথমটিই নির্ধারিত হয়েছে পানি-সংশ্লিষ্ট। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, বাংলাদেশের মানুষ ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছে। কারণ ১৬ কোটি মানুষের দেশটিতে ৯৮ ভাগের জন্য পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা হলেও বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করতে না পারা এবং মৌসুমভেদে পানি সংকটের কারণে স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিঘিœত হচ্ছে। জনগণের বিশুদ্ধ পানির চাহিদা পূরণ করার জন্য সরকারের ১৩টি মন্ত্রণালয়ের ৩৫টি সংস্থার নানা উদ্যোগের কথা শুনেছি কিন্তু বিশুদ্ধ পানির চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্টদের মতে, এর অন্যতম কারণ তাদের মধ্যে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের বড় অভাব। এর সুযোগ নিচ্ছে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী। বিশুদ্ধ পানির নামে জারে করে অপরিশোধিত ও দূষিত পানিই তারা বিক্রি করছে চড়া দামে। সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অপরিহার্য শর্ত হলো নিরাপদ সুপেয় পানি এবং ভেজালমুক্ত খাদ্য। এটা নিশ্চিত করা মূলত সরকারের দায়িত্ব। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে সরকারের বিভাগ রয়েছে, জনবল রয়েছে। বাজারজাত পণ্যের মান নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তাদের কাজ টা কী? যেসব অসাধু ব্যবসায়ী বিশুদ্ধ পানির নামে দূষিত মানহীন পানি বাজারজাত করছে, তাদের অবশ্যই প্রতিরোধ করতে হবে, শাস্তির আওতায় আনতে হবে। এ ছাড়া ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে ভয়াবহ ভূমিকম্পন ও দুর্যোগ হওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেন অনেকে। বর্তমানে ৮০ ভাগ পানি ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে সরবরাহ করা হয়। আর ২০ ভাগ ভূ-উপরিস্থ উৎস থেকে করা হয়। এ কারণে দেশের পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে পুরো দেশ এক সময় মরুভূমি হয়ে যাবে।

এসব বিবেচনায় সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এখন থেকে ৮০ ভাগ পানি ভূ-উপরিস্থ উৎস হতে সরবরাহ করা হবে। এরপরও পানির যদি প্রয়োজন হয় তাহলে ২০ ভাগ ভূ-গর্ভস্থ উৎস থেকে সরবরাহ করা হবে। এজন্য মেগা পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে।’ঢাকার আশপাশে অনেক খাল, ঝিল, জলাধার, পুকুর প্রভাবশালীরা দখল করেছেন সেগুলোর দখল মুক্ত করতে হবে। যেহেতু আমরা জনগণের সরকার কথাটা শুনি সেহেতু জনগণের বাঁচার জন্যই এসব সংরক্ষণ করা উচিত। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে ইতোমধ্যে জাতীয় পানি নিরাপত্তা ফ্রেমওয়ার্ক বিষয়ে সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। তবে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে এ বিষয়ে পর্যবেক্ষণ ও নজরদারি কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় থাকা জরুরী মনে করি।

পানির নূন্যতম মান বজায় রাখতে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ও প্রক্রিয়ায় ধারাবাহিক অভিযান ও নজরদারির বিকল্প নেই। চালাতে হবে জনসচেতনতামূলক প্রচারণাও। যেসব প্রতিষ্ঠান সুনামের সঙ্গে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করে থাকে, তাদেরও উচিত হবে, এ ব্যবসা থেকে প্রতারকদের হটিয়ে দিয়ে কর্তৃপক্ষকে সার্বিক সহযোগিতা করা।

ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম/এইএমএল


সর্বশেষ সংবাদ