বাংলা ফন্ট
জনদুর্ভোগ

সমাবেশ-শোভাযাত্রায় নিয়ন্ত্রণ আনুন

11-01-2017
আলী ইমাম মজুমদার

সমাবেশ-শোভাযাত্রায় নিয়ন্ত্রণ আনুন সম্প্রতি একটি ছাত্রসংগঠনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সমাবেশ ও মিছিল রাজধানীর বিপর্যস্ত ট্রাফিক–ব্যবস্থার ওপর মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে নেমে আসে। গোটা মহানগরীর ট্রাফিক–ব্যবস্থা একরকম অচল হয়ে পড়ে। লাখ লাখ মানুষ বেশ কয়েক ঘণ্টার যানজটে আটকা পড়ে। এর মাঝে ছাত্র, শ্রমিক থেকে গৃহবধূ, বৃদ্ধ আর রোগীও ছিলেন। আমরা দীর্ঘস্থায়ী যানজটে আটকে রইলাম। ছাত্রসংগঠনটি কয়েক ঘণ্টা ধরে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রের রাস্তাগুলোর উভয় দিক দখলে রেখে করল মিছিল।

এ প্রসঙ্গে ঈশপের একটি গল্পের কথা স্মরণে এসে যায়। ওই গল্পে একটি কুয়োতে বসবাসকারী বেশ কিছু ব্যাঙের দিকে বালকদের ইট নিক্ষেপ সম্পর্কে বলতে গিয়ে একটি বর্ষীয়ান ব্যাঙ মন্তব্য করেছিল, ‘যা তোমাদের জন্য খেলা, তা আমাদের জন্য মরণ’। ওই মিছিলকারীদের উদ্দেশ্যে এ ধরনের কথা বলার মতো তখন হয়তো কেউ ছিলেন না। তবে পরদিনের কিছু সংবাদপত্রের সাহসী সম্পাদকীয়তে এমন মন্তব্যই দেখা যায়।

এ ছাড়া ছাত্রসংগঠনটির মূল প্রতিষ্ঠান আওয়ামী লীগের মহাসচিব জনদুর্ভোগের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এ ব্যাপারটিও কিন্তু বিরল এবং প্রশংসনীয়।

তবে এভাবে রাস্তা আটকে রেখে সমাবেশ ও মিছিল করার বিষয়টি অনেককেই নতুনভাবে ভাবিয়ে তুলছে। বেশ কিছু ছাত্র, যুব ও শ্রমিক সংগঠন এমনটি করে থাকে। অনেক রাজনৈতিক দলও করে থাকে। আর যে দল যখন রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকে, তাদের অনুসারীরাই করেন বেশি।

জনবহুল ও যানজটে আক্রান্ত আমাদের রাজধানী শহরটি কিংবা এর অংশবিশেষ সময়ে সময়ে একধরনের অচল হয়ে পড়ে। এর কারণ নানাবিধ। কখনো ভারী বর্ষণে জলজট, কোনো কোনো সময়ে ভিভিআইপি গমনাগমনের জন্য রাস্তা বন্ধ আর সময়ে সময়ে রাজনৈতিক এমনকি সরকারি কোনো সংস্থা আয়োজিত মিছিল কিংবা শোভাযাত্রা এ অচলাবস্থা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ওপর আমাদের হাত নেই। তবে সামান্য বৃষ্টিতেই পানি জমে অচলাবস্থা সৃষ্টির জন্য যতটা না প্রকৃতি দায়ী, তার চেয়ে বেশি দায়ী আমাদের লোভ, দুর্নীতি ও অযোগ্যতা।

ভিভিআইপি চলাচলের জন্য দীর্ঘক্ষণ রাস্তা বন্ধ রাখা আমাদের অনেকটা যুগবাহিত রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। অবশ্য বিশ্বজনীন নিরাপত্তা হুমকির মুখে এ নিরাপত্তাব্যবস্থায় ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এটা নিশ্চিত করেই জনভোগান্তি কত কমানো যায় সে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবা দরকার।

সাধারণত দেখা যায়, রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র সোহরাওয়ার্দী উদ্যান কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে কোনো রাজপথে সভা-সমাবেশের আয়োজন করা হয়। অবশ্য হাল আমলে সরকার কিংবা তাদের সহযোগী সংগঠন ছাড়া অন্যেরা তা করতে পারছে না। যতটুকু করছে তাও নিয়ন্ত্রিত। এসব সমাবেশস্থলের দিকে বিভিন্ন দিক থেকে মিছিল আসতে থাকে পায়ে হেঁটে কিংবা বাসে–ট্রাকে। সূচনা হয় যানজটের। আর ওই সমাবেশস্থল এবং গাড়ি পার্কিংয়ের স্থানগুলো যান চলাচলের জন্য প্রায় ক্ষেত্রে বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি মিছিল চলাকালেও হয় তাই।

অথচ তারা ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কোনো অনুমোদন নিয়েছিল কি না তা আমরা জানি না। আর জনদুর্ভোগ সৃষ্টিকারী এ ধরনের কর্মসূচির অনুমতি পুলিশ দেয় কী করে কিংবা না দিলে হয় কীভাবে তা আমাদের বোধগম্য নয়।

অনুমতি দিতে হলেও সরকারি ছুটির দিনকে বেছে নিলে জনদুর্ভোগ অনেকটা হ্রাস পায়। আর কোনো দিবস উদ্যাপন সে বিশেষ দিনটিতেই করতে হবে, এমন তো কথা নয়। নির্ধারিত দিনে প্রতীকীভাবে তা উদ্যাপন করে পরবর্তী ছুটির দিনে বড় আকৃতিতে করা যায়। যেমন ঈদ বা নববর্ষের উত্সবও আমাদের পাশ্চাত্য নিবাসী প্রবাসীরা পরবর্তী ছুটির দিনেই করে থাকেন। ঈদের দিনে শুধু পড়েন নামাজ। আর অনুমতি যদি দিতেই হয় তবে খোলামেলাভাবে জনগণকে বিশেষ বিশেষ পথ নির্ধারণ করে এ সময়ে তা এড়িয়ে চলতে পরামর্শ দেওয়া হয় না কেন? সময়ে সময়ে তো বিজ্ঞপ্তি দিয়েই কিছু কিছু রাস্তাঘাট বন্ধ করা হয়।

যেমন: নববর্ষ, শহীদ দিবস এমনকি বিশ্ব ইজতেমার আখেরি মোনাজাতের দিনেও। জনগণ অসুবিধা হলেও এর সঙ্গে মিল রেখে চলতে চেষ্টা করে। কিন্তু রাস্তায় বের হয়ে হঠাৎ এ ধরনের যানজটের মুখোমুখি হওয়া কতটা বিপর্যয়কর তা ভুক্তভোগীমাত্রই জানেন।

রাজধানীর প্রধান রাজপথগুলোর পরিসর এতই কম আর গাড়ির চাপ এতই বেশি যে সামান্য কিছুক্ষণের ট্রাফিক–বিভ্রাটেও দীর্ঘস্থায়ী যানজটের সৃষ্টি হয়। আর এর রেশ ছড়িয়ে পড়ে অন্য রাস্তায়ও। তাই গ্রহণযোগ্য বিকল্প যে পর্যন্ত না হচ্ছে সে পর্যন্ত অতি সাবধানতার সঙ্গে এর মোকাবিলা করা দরকার। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অনেক দিবসে মিছিলের আয়োজন করা হয়। এটা অনেক ক্ষেত্রেই অত্যাবশ্যক বলে মনে হয় না। বিশেষ করে ঢাকার মতো জনবহুল মহানগরীতে তো নয়ই।

এ দিবসগুলোর প্রায় সবই পালিত হয় সরকারিভাবে। আর অনেক ক্ষেত্রেই কর্মদিবসে। মিছিলের গন্তব্যপথ থাকে সাধারণত ওসমানী মিলনায়তন থেকে মত্স্য ভবন শাহবাগ হয়ে জাতীয় জাদুঘর। শুরু হয় মোটামুটি সকাল নয়টা থেকে। আধঘণ্টার মিছিল। কিন্তু ট্রাফিক–ব্যবস্থার ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব থাকে দুপুর পর্যন্ত।

এ মিছিল সচিবালয়, সুপ্রিম কোর্টসহ নিকটস্থ অফিসগুলোতে যাতায়াতকারীদের যে বিঘ্ন সৃষ্টি করে তা ভুক্তভোগী ছাড়া অন্য কেউ বুঝবেন না। এ রাস্তায় চলাচলকারী যানবাহনের একটি অংশ অন্য রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে। ফলে সৃষ্টি হয় যানজটের। ছুটির দিন ছাড়া অন্য সব দিনে প্রথাসিদ্ধ এ ধরনের মিছিলের আয়োজন থেকে বিরত থাকা খুবই সম্ভব এবং যৌক্তিক।

আমাদের বিভিন্ন জাতীয় দিবস ও নববর্ষ উপলক্ষে ছুটি থাকে। সেসব দিনে কোথাও কোথাও দীর্ঘস্থায়ী যানজট হয়। এ নিয়ে পুলিশও আগাম সতর্ক করে। বিশেষ প্রয়োজন না পড়লে সবাই সেসব রাস্তা পরিহার করে চলেন। নববর্ষের দিন সবচেয়ে জনাকীর্ণ শাহবাগ অঞ্চলে দেশের দুটো গুরুত্বপূর্ণ হাসপাতালে অবস্থানকারী রোগীদের আত্মীয়স্বজনও সেভাবেই নিজেদের আগে থেকেই প্রস্তুত রাখেন। এমনকি এ অঞ্চলেই অবস্থিত ঢাকা ক্লাব তাদের বর্ষবরণ কর্মসূচি করে এক দিন আগে বা পরে।

ঠিক একই অবস্থা হয় বিশ্ব ইজতেমার আখেরি মোনাজাতের দিনে উত্তরা বা সংলগ্ন এলাকার কয়েক লাখ লোকের। প্রায় দিনভর নিজ অঞ্চলেই থাকতে হয়। বিষয়টা যেহেতু জানা, তাই সবার প্রস্তুতিও তাই থাকে। ঠিক তেমনি আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো ও এদের সহযোগী সংগঠন তাদের কর্মসূচির জন্য এ পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় যতটা সম্ভব ছুটির দিন বেছে নিতে পারে। আর যানজটে রাস্তাঘাট বন্ধ হয়ে যাবে, এমন কর্মসূচি করতে হলে তা আগাম জানান দেওয়াই সংগত। সেসবের অনুমতি দিতে গিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করার দায়িত্ব পুলিশের।

তবে রাজনৈতিক কারণে নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচি পালনে বাধাদান অনভিপ্রেত। কোনো কোনো সংগঠনের জন্য এ ধরনের অনুমতি বাধ্যতামূলক করা হলেও অন্যদের জন্য কেন তা হয় না, এটা বোধগম্য নয়। আর জনশৃঙ্খলার স্বার্থে কিছু কিছু ক্ষেত্রে একটি মাত্রায় এ ধরনের অনুমতির প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে। তাই অনুমতি দিতেই যদি হয় সেখানে ট্রাফিক কর্তৃপক্ষ আগাম জনগণকে সতর্ক করবে, এ দাবি অত্যন্ত সংগত ও যৌক্তিক।

দেশ স্বাধীন হয়েছে প্রায় অর্ধশতক আগে। রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় সব সংগঠনই জনগণের সুযোগ-সুবিধা এবং ভোগান্তির প্রতি উত্তরোত্তর অধিকতর সংবেদনশীল হবে, এটা আশা করাও সংগত। তাদের নেতা-কর্মীরা কোনো কর্মসূচি নিতে এবং তা বাস্তবায়নকালে এসব বিবেচনায় রাখার দাবি তোলাও অসংগত নয়। আমরা একটি প্রাণোচ্ছল জাতি চাই। কবরের শান্তি নয়। তাই সভা-সমাবেশ, মিছিল, শোভাযাত্রা—সবই হতে হবে। আমাদের সংবিধান আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বিধিনিষেধ সাপেক্ষে এর অধিকার রেখেছে।

রাষ্ট্রব্যবস্থায় কোনোটিকেই উপেক্ষা করা যায় না। তেমনি তা করতে গিয়ে লাখ লাখ নগরবাসীর কোটি কোটি কর্মঘণ্টা নষ্ট হবে, এটাও প্রত্যাশিত নয়। একটু সচেতন হলে বেশ কিছু ক্ষেত্রে তা পরিহার করা সম্ভব। হ্রাস করা সম্ভব জনভোগান্তি। সবার সংবেদনশীল আচরণ ও প্রশাসনের দৃঢ়তায় এটা হ্রাস পেতে পারে। সভা-সমাবেশ, মিছিল, শোভাযাত্রায় যৌক্তিক নিয়ন্ত্রণ এর একটি প্রত্যাশিত দিক বটে।

আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম/এইচএমএল

সর্বশেষ সংবাদ