বাংলা ফন্ট

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও বর্তমান প্রজন্মের ভাবনা

05-12-2017
অমিত বণিক

 আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও বর্তমান প্রজন্মের ভাবনা

আমরা বর্তমান প্রজন্ম নিজের চোখে মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি। ভাষা আন্দোলনের পর থেকে ধাপে ধাপে স্বাধীনতা অর্জনের পথগুলি যে কত বন্ধুর ছিল তার কিছুটা মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রামান্য দলিলগুলো থেকে পাওয়া যাবে। বহু সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাঙালি স্বাধীন বাংলাদেশ ও স্বাধীন জাতি হিসেবে মর্যাদা পেয়েছে। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে অনেক অশ্রু ও রক্তের ইতিহাস রয়েছে।

মহান ত্যাগের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করে দিয়ে গেছেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।  তিনি বাংলার মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে চেয়েছিলেন; বাংলার শোষিত বঞ্চিত মানুষকে শোষণের হাত থেকে মুক্তি দিয়ে উন্নত জীবন দিতে চেয়েছিলেন।

আমরা মায়ের গর্ভ থেকে ভূমিষ্ট হয়েই একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছি। আমাদের চোখে অদেখা ছিলো সাধারণ বাঙালির উপর পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর দমন পীড়ন শোষণ নির্যাতন অতঃপর ঐক্যবদ্ধ মুক্তিকামী বাঙালির বলিষ্ঠ প্রতিবাদ আর জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়া, ফলাফলে প্রিয় মাতৃভূমিকে বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের বুকে প্রতিষ্ঠা করা।

আজ হয়তো বিজয় দিবস আমাদের কাছে কেবলই একটা অনুষ্ঠানিকতা মাত্র! মুক্তিযুদ্ধের সাথে সংশ্লিষ্ট জাতীয় দিবসগুলো দায়সারা ভাবে বা কোন এক ভাবে পালন করেই যেন এই দেশে জন্মাবার দায় এড়াতে চাই। তারপর মুক্তিযুদ্ধ ভুলে গিয়ে জড়িয়ে পড়ি জীবনযুদ্ধে, জীবন এভাবেই ছুটে চলছে তিল তিল করে। যারা এই দেশকে জন্ম দিয়েছেন কেবল তারাই জানেন এই দেশকে পৃথিবীর আলোয় আনতে কতটা অবর্ণনীয় কষ্ট তাদের পোহাতে হয়েছে, আমরা তা সঠিকভাবে জানিনা বলেই কারণে অকারণে দেশকে ছোট করে ফেলি বিশ্বের কাছে। যা অত্যন্ত দুঃখের বিষয়। প্রসব বেদনায় কাতর একজন মা-ই কেবল জানেন একজন সন্তান জন্ম দিতে কতটা ব্যথা-বেদনা সহ্য করতে হয়। অতঃপর ভূমিষ্ট সন্তানের দিকে তাকিয়ে সব যন্ত্রণা হাসি মুখে ভুলে যান এবং সেই সন্তানকে জীবনের চেয়েও ভালোবেসে বুকের মধ্যে সারাজীবন আগলে রাখেন।

কিন্তু আমাদের কাছে সেই কষ্টানুভূতি পৌঁছায়নি বলেই ছোট ছোট কারণেই আমরা তুচ্ছ তাচ্ছিলো করে ফেলি। আমাদের কাছে সেই কষ্টানুভূতি পৌঁছায়নি বলেই এখনো বাংলাদেশের স্বাধীনতার মন্ত্রে দীক্ষিত হতে পারিনি। মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস আমাদের কাছে পৌঁছায়নি বলেই আমাদের পূর্বসূরীদের কষ্টার্জিত স্বাধীনতা আমাদেরকে নাড়া দেয়না, আমাদের অর্জিত মহান বিজয় আমাদেরকে সত্যিকার অর্থে উল্লসিত করেনা, উজ্জীবিত করেনা। শুধুমাত্র মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসই নয়, আমাদের নবীন প্রজন্মের অনেকেই জানেনা আমাদের বাংলা সংস্কৃতি। সঠিক তত্ত্বাবধানের অভাবেই এই দেশে জন্মে এই দেশের আলো বাতাস গায়ে মেখে তারা বড় হচ্ছে বিজাতীয় সংস্কৃতিতে। তারা জানেনা ষড়ঋতু মানে কী বা কয়টি ঋতু আছে আমাদের, তারা জানেনা বাংলা বারো মাসের নাম, তবুও তারা বিশ্বাস করে তারা বাঙালি, তারা বাংলাদেশি।

আমাদের জীবনে ধর্ম যেমন একটা বিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে আছে ঠিক তেমনি করে আমাদের প্রজন্মের কাছে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসটাও এখন যেন একটা বিশ্বাসের উপর হাত পা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যেহেতু আমরা প্রকৃত ইতিহাস থেকে বঞ্চিত তাই যে যেভাবে আমাদেরকে মুক্তিযুদ্ধের বর্ণনা দিচ্ছে আমাদেরকেও ঠিক সেভাবেই বিশ্বাস করতে হচ্ছে। নানান ধর্মে যেমন নানা রকম বিশ্বাস প্রচলিত, ঠিক তেমনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধেও যেন নানান রকম বিশ্বাস প্রচলিত হয়ে আসছে আর এমনটা হয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধকে দলীয়করণ করে। একটা সময় শুনতাম ব্যক্তির চেয়ে দল বড় আর দলের চেয়ে দেশ বড় কিন্তু সেই প্রবাদটা আজ বড়ই শেকেলে মনে হয়।

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস না জানলেও আমরা যতটুকু জানি, আর নিশ্চিতভাবে যা জানি সেগুলোর মধ্যে হলো আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়েছিলো ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চে, মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল আতাউল গণি ওসমানীর নেতৃত্বে প্রায় নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বিজয়ের প্রধান ফটকে পৌঁছে যায়। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ছিলো বিজয়ের দিন, সেদিন বিকেলে রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বাংলাদেশে অবস্থিত পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর অধিনায়ক লে. জে. এ এ কে নিয়াজী হাজার হাজার উৎফুল্ল জনতার সামনে প্রায় ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য নিয়ে আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেন, বাংলাদেশের পক্ষে ভারতের লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা আত্মসমর্পনের নির্দশনপত্র গ্রহণ করেন। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনী আত্মসমর্পন করলেও সারা দেশে পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণ করাতে ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত লেগে যায়।

একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে আমাদের এই প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশ বিশ্বের মাত্রচিত্রে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এটা আমাদের জন্য কম গর্বের কথা নয়, কম অহংকারের নয়। আর এই গর্ব ও অহংকারের সূচনা হয়েছিলো আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজয় অর্জনের মাধ্যমে। কিন্তু ৪৬ বছর আগে বিজয় অর্জন করেও কি সত্যিকার অর্থে আমরা বিজয়ী হতে পেরেছি? আমরা কি পেরেছি স্বাধীনতার সুফল সবার কাছে ঘরে পৌঁছে দিতে? আমাদের বিজয়, আমাদের অহংকার আজ কেবল কাগজে কলমে কিন্তু বাস্তবে নয়। বাস্তবে এখনো আমরা পরাধীন হয়ে আছি ক্ষমতাসীন কয়েক কর্তা ব্যক্তির কাছে। কার কাছে আমরা বিচার প্রার্থনা করবো?

এই দেশে মানুষের মৌলিক চাহিদার কোন নিশ্চয়তা এখনো নেই। রাজনীতি, সন্ত্রাসী, দখলবাজি, চাঁদাবাজির ও নানান রকম অপরাধের কালো থাবায় দেশের শিক্ষাঙ্গন আজ কলুষিত। শিক্ষকদের কাছেও আজকাল শিক্ষার্থীরা নিরাপদ নয়, স্বীয় শিক্ষক দ্বারাই আজ শিক্ষার্থীরা ধর্ষিত হচ্ছে, লাঞ্ছিত হচ্ছে, শিক্ষকরাও সমান তালে প্রকাশ্যে নানান অপরাধে নিজেদেরকে জড়াচ্ছেন। চিকিৎসকেরাও আজকাল চিকিৎসা সেবাকে মহৎ পেশা হিসেবে দেখছেন না। তারাও রাজনীতিবিদ হয়ে উঠছেন, চিকিৎসা সেবার চাইতে তারা দলা-দলি, মিছিল-মিটিং, মহাসমাবেশ ইত্যাদি কর্মকাণ্ডেই নিজেদের বেশি দেখতে চাচ্ছেন। তাই আমাদের সাধারণ মানুষের জীবন যাপনের মান বাড়েনি।

তারপরও আমি বাংলাদেশি, জন্মেছি এই স্বাধীন বাংলাদেশে। এই দেশের মাটির উপর ভর করেই আমি হাঁটতে শিখেছি, ৪৬ বছর আগে আমার পূর্বসূরীদের রক্তে অর্জিত স্বাধীনতার সুফল আমার গায়ে না লাগলেও এই দেশের আলো-বাতাস গায়ে মেখে বড় হয়েছি। তৃষ্ণায় যখন বুকের ছাতি ফেটে যাবার যোগাড় হয় তখন এই দেশের জল পান করেই তৃষ্ণা নিবারণ করি। এই দেশের মাটি থেকে উৎপাদিত ফল-ফসল খেয়ে এখনো জীবন ধারণ করে আছি, এই ঋণও কখনো শোধিবার নয়। লাখো শহীদের রক্তে, লাখো মা-বোনের সম্ভ্রমে অর্জিত আমাদের এই প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমিকে পাকিদের রেখে যাওয়া উচ্ছিষ্ট থেকে উৎপাদিত বেজন্মারা যতই গালমন্দ করুক যতই ভৎসনা করুক, দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোরেরা দেশটাকে যতই ধ্বংসের পথে নিয়ে যাক আমরা ততই এই দেশটাকে বুকের ভিতর আগলে রাখতে চাই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এই দেশটাকে গড়তে চাই, স্বাধীনতা ও বিজয়ের পূর্ণ স্বাদ সবার ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে চাই।

এবার শুধু আমাদেরকে সুযোগ দাও, মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস আমাদের হাতে তুলে দাও, আমরা সঠিকভাবে দেখতে চাই কিভাবে নিজের জীবন তুচ্ছ করে দেশ মাতৃকার তরে তরতাজা জীবন হাসি মুখে বিলিয়ে দেয়া যায়। গ্রেনেড নয়, বোমা নয়, আমাদের হাতে ন্যায়-নীতি আর সততার অস্ত্রটা তুলে দাও। এই অস্ত্র দিয়ে দেশকে আরো একবার স্বাধীন করতে চাই। পৃথিবীর বুকে এই দেশটাকে সত্যিকার অর্থে একটা বসবাসযোগ্য দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই, আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম যেন জন্ম নেয়ার পর পরই বুক ফুলিয়ে বলতে পারে, স্বার্থক জন্ম আমার জন্মেছি এই দেশে। পরিশেষে একটা কথা বলতে চাই, এই দেশ যে আমার মা, আমি যে দেশকে মায়ের মতো ভালবাসি।






সর্বশেষ সংবাদ