বাংলা ফন্ট

কোরবানির মর্মবাণী ও করণীয়

31-08-2017
শাহ মতিন টিপু

 কোরবানির মর্মবাণী ও করণীয় ঈদুল আজহার অপর নাম কোরবানির ঈদ। ‘আজহা’ অর্থ কোরবানি বা আত্মোৎসর্গ। অর্থাৎ হলো আত্মোৎসর্গের ঈদ। উৎসর্গ ও ত্যাগের মাধ্যমে ধর্মীয় কর্তব্য পালনের আনন্দ ঈদুল আজহার সঙ্গে কোরবানি সম্পৃক্ত বিধায় একে কোরবানির ঈদ বলা হয়।

ঈদুল আজহার উদ্দেশ্য স্রষ্টার সন্তুষ্টির জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতে প্রস্তুত থাকা। এরই প্রতীক হিসেবে পশু কোরবানি করা হয়। এই কোরবানির মাধ্যমে মূলত মানুষের মধ্যে বিরাজমান পশুশক্তি, কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহকেই কোরবানি দিতে হয়।

হালাল অর্থে কেনা পশু কোরবানির মাধ্যমেই তা সম্পন্ন হয়। কোরবানির মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি ঐকান্তিক সমর্পণের বহিঃপ্রকাশ ঘটে, যা দিয়ে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভ করা যায়।

কালপরিক্রমায় প্রতিবছর হজের পরে ঈদুল আজহা ফিরে আসে। ঈদুল আজহার প্রধান আকর্ষণ ও গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো কোরবানি। ঈদের দিন কোরবানিকে কেন্দ্র করে ধুমধামের সঙ্গে চলে ঈদের মহোৎসব।

রসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘কোরবানির দিন রক্ত প্রবাহিত করার চেয়ে প্রিয় কোনো আমল আল্লাহর কাছে নেই। কোরবানিকারী কিয়ামতের দিন জবেহকৃত পশুর লোম, শিং, খুর, পশম ইত্যাদি নিয়ে আল্লাহর কাছে উপস্থিত হবে। কোরবানির রক্ত জমিনে পতিত হওয়ার আগেই তা আল্লাহর কাছে বিশেষ মর্যাদায় পৌঁছে যায়। অতএব, তোমরা কোরবানির সঙ্গে নিঃসংকোচ ও প্রফুল্লমন হও।’ (ইবনে মাজা, তিরমিজি)।

পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহর সমীপে না তার গোশত পৌঁছে, আর না তার রক্ত; বরং আল্লাহর কাছে তোমাদের তাকওয়া পৌঁছে থাকে।’ (সূরা আল-হজ, আয়াত: ৩৭)

আল্লাহর মহব্বতে হজরত ইবরাহিম (আ.) তার আদরের সন্তান হজরত ইসমাইলকে জবাই করার পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করছিলেন, যা ছিল মর্মস্পর্শী ও পিতা-পুত্রের ত্যাগের এক মহান দৃষ্টান্ত। এর অনুসরণে প্রতিবছর জিলহজ মাসের ১০ তারিখে সামর্থ্যবান মুসলমানেরা প্রতীকী পশু জবাই করে থাকেন।

হজরত ইবরাহিম (আ.) এর সেই আত্মত্যাগ আজ অবিস্মরণীয় ইতিহাস। ইসমাইলের বয়স মাত্র ১১ বছর তখন হজরত ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর পক্ষ থেকে স্বপ্নযোগে প্রাণাধিক পুত্র হজরত ইসমাইলকে কোরবানি করার জন্য আর্দিষ্ট হলেন।

হজরত ইবরাহিম (আ.) কিশোর ইসমাইলকে আল্লাহ পাকের আদেশ সম্পর্কে জ্ঞাত করে বললেন, ‘হে আমার পুত্র। আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে জবেহ করছি। অতঃপর এ ব্যাপারে তোমার অভিমত ব্যক্ত করো।’

দৃঢ়প্রত্যয়ী ইসমাইল অসীম সাহসিকতার সঙ্গে বললেন, ‘হে আমার পিতা। আপনার প্রতি যে আদেশ হয়েছে আপনি তা পালন করুন। ইনশা আল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্য ধারণকারীদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।’

পুত্রের সায় পেয়ে মহান আল্লাহর নির্দেশ মতে কিশোর ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানির যাবতীয় প্রস্তুতি নিয়ে মিনা প্রান্তরে শায়িত করে ধারালো ছুরি বারংবার চালানোর পরও তার কোমল চামড়া কাটা যাচ্ছিল না। পিতা ইবরাহিম অস্থির মন আর হতাশ হৃদয়ে ভেঙে পড়লেন, তখনি একপর্যায়ে অনুভব করলেন কোরবানি হয়ে গেছে। এতক্ষণ পর্যন্ত যে চক্ষুযুগল বাঁধা অবস্থায় ছুরি চালনা করছিলেন তা যখন খুললেন, দেখতে পেলেন তার সামনে আস্ত একটি দুম্বা জবেহ হয়ে গেছে।

যা দেখে তিনি আরো বেশি হতবাক হয়ে গেলেন। আর বললেন তাহলে অবশেষে আমার সব প্রচেষ্টা কি ব্যর্থ হলো? তার এ আকুতির পর আল্লাহর পক্ষ থেকে অদৃশ্য আওয়াজ এল ‘আমি আহ্বান করলাম হে ইবরাহিম। নিশ্চয়ই তুমি তোমার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেছ, এভাবেই আমি পুণ্যবানদের পুরস্কৃত করি’ (আল কুরআন)।

বস্তুত সেদিন বেহেশত থেকে দুম্বা এনে শিশু ইসমাইল (আ)-এর স্থলাভিষিক্ত করে কোরবানি কবুল হওয়ার ঐতিহাসিক ঘটনাকে অবিস্মরণীয় রাখার জন্যই আজ উম্মতে মুহাম্মদীর ওপর কুরবানি ওয়াজিব করা হয়েছে।

এ দিনের করণীয় : গোসল করা, সুগন্ধি ব্যবহার করা, সর্বোত্তম কাপড় পরা- এগুলো সুন্নত। ঈদের সালাত ওয়াজিব। তাই ঈদের জামাতে অংশগ্রহণ করা। মসজিদের বাইরে উন্মুক্ত ময়দানে ঈদের জামাত করা সুন্নত। ঈদের জামাত শেষে খুতবা শোনা ওয়াজিব। ঈদগাহে এক পথে যাওয়া, অন্য পথে ফিরে আসা,  যাওয়া ও আসার পথে তাকবির বলা সুন্নত।

ভালো আমলের প্রতি আগ্রহী হওয়া, আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করে তাদের খোঁজখবর নেওয়া ও কুশল বিনিময় করা। এ দিনের সবচেয়ে বড় আমল হলো কোরবানির পশু জবাই করা। এ জন্য বিধান হলো, কোরবানি হবে ঈদের জামাত শেষে। এর আগে কোরবানির পশু জবাই করলে তা কোরবানি হিসেবে গণ্য হবে না।

হাদিসে বর্ণিত রয়েছে, ‘এ দিনের সর্বপ্রথম যে কাজটি আমরা করব তা হলো আমরা (ঈদের) সালাত আদায় করব, এরপর আমরা ফিরে এসে পশু জবাই করব। যে এভাবে করবে সে আমাদের সুন্নতপ্রাপ্ত হলো। আর যে সালাত আদায়ের আগেই জবাই করল তাহলে তা জবাইকৃত প্রাণীর গোশতে পরিণত হলো, যা সে তার পরিবারের সদস্যদের জন্য ব্যবস্থা করল।’ (বুখারি : সহি)

পরস্পরে দেখা হলে এ বলে মুবারকবাদ দেয়া ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকা’ (আল্লাহ আমাদের ও আপনাদের (আমল) কবুল করুন)।

রাশিদ ইবনে সাদ বর্ণনা করেন যে, একবার এক ঈদের দিন ওয়াছিলা ইবনে আসকা এবং আবু উমামা বাহিলী (রা.) তার সঙ্গে দেখা করেন এবং বলেন, ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকা’ (আল্লাহ আমাদের ও আপনাদের (আমল) কবুল করুন) (তাবরানি : আদ দু’আ)।

অন্য এক বর্ণনায় খালিদ ইবনে মা’দান বর্ণনা করেন যে, একবার এক ঈদের দিন আমি ওয়াছিলা ইবনে আসকার সাথে দেখা করি এবং বলি ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকা’ (আল্লাহ আমাদের ও আপনাদের (আমল) কবুল করুন)। তখন তিনি বলেন, হ্যাঁ, ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না-ওয়া মিনকা’ (আল্লাহ আমাদের ও আপনাদের (আমল) কবুল করুন) (বায়হাকি : আস সুনানুল কুবরা)।

যাদের ওপর জাকাত ফরজ তাদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব। তা ছাড়া, ঈদের দিন সুবহ সাদিকের সময় যারা নিসাব পরিমাণ উদ্বৃত্ত সম্পদের মালিক হবেন তাদের ওপরও কোরবানি ওয়াজিব। এ জন্য বছর অতিক্রান্ত হওয়া জরুরি নয়। অন্যান্য ইমামের মতে সামর্থ্যবান সব মুসলিম নরনারীর ওপর কোরবানি সুন্নতে মুআক্কাদাহ।

হাদিসে বর্ণিত যে, ‘সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে কোরবানি করল না সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটেও না আসে’ (ইবন মাজাহ : সুনান)। ইমাম আহমাদ বলেন, সামর্থ্যবান ব্যক্তির কোরবানি না করাকে আমি অপছন্দ করি। ইমাম মালিক ও শাফেয়িও অনুরূপ মত ব্যক্ত করেন।

কোরবানির ফজিলত : হাদিসে বলা হয়েছে, ‘কোরবানির দিন আদম সন্তান যে আমল করে তার মধ্যে আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো কোরবানির পশুর রক্ত প্রবাহিত করা। কোরবানির পশু কিয়ামতের দিন তার শিং, নাড়িভুঁড়ি ও চুল-পশম নিয়ে উপস্থিত হবে। আর তার রক্ত জমিনে পতিত হওয়ার আগেই আল্লাহর নিকট কবুল হয়ে যায়। অতএব তোমরা আনন্দের সাথে তা পালন করো’ (ইবনে মাজাহ : সুনান)।

অন্য একটি হাদিসে রয়েছে যে, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে কোরবানি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে উত্তরে তিনি বলেন, এটা হলো তোমাদের পিতা ইবরাহিম (আ.)-এর সুন্নত। তারা বললেন, এর বিনিময়ে আমাদের জন্য কী রয়েছে? তিনি (সা.) বললেন, প্রতিটি চুলের জন্য রয়েছে একটি করে নেকি। তারা বলল, তাহলে পশমের কী হবে? তিনি বললেন, চুলের প্রতিটি পশমের জন্যও রয়েছে একটি করে নেকি’ (ইবনে মাজাহ : সুনান ও আহমাদ : মুসনাদ)।

গোশত বণ্টন : কোরবানির গোশত বণ্টনের ক্ষেত্রে অনেকেই মনে করেন যে, এটা তিন ভাগ করা সুন্নত, আসলে তিন ভাগে বণ্টন করাকে মুস্তাহাব বলা হয়েছে। এক ভাগ নিজের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়স্বজনের জন্য এবং এক ভাগ গরিব দুস্থদের জন্য। তবে কোনো পরিবারে যদি সদস্যসংখ্যা বেশি থাকে তাহলে কম বেশি করা যেতে পারে। এমনকি পরবর্তী সময়ের জন্য সংরক্ষণও করা যেতে পারে।

জাবির ইবনে আবদুল্লাহ বার্ণিত একটি হাদিসে দেখা যায়, নবীজি (সা.) তিন দিনের পর কোরবানির গোশত খেতে নিষেধ করেছেন। (অর্থাৎ তিন দিনের পর যেন গোশত অবশিষ্ট না থাকে।) অতঃপর তিনি বলেন, ‘তোমরা খাও, সাদাকা (বিলি) করো ও সংরক্ষণ করো’ (মালিক : মুআত্তা)।

পরের বছর সাহাবিরা বললেন, গত বছরের মতো এ বছরও কি তিন দিনের বেশি গোশত রাখা যাবে না? তিনি বললেন, হ্যাঁ, রাখা যাবে। গত বছর দুর্ভিক্ষ ছিল, তাই নিষেধ করা হয়েছে।

ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম/এইচএমএল


সর্বশেষ সংবাদ