বাংলা ফন্ট

সু চি যেভাবে রোহিঙ্গা নির্মূলে জড়িত

31-08-2017
ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ

  সু চি যেভাবে রোহিঙ্গা নির্মূলে জড়িত
আরাকান এখন এক ভয়াবহ অঞ্চলের নাম। মিয়ানমারের ‘রাখাইন স্টেট’ নামের রাজ্যে মুসলমানদের জীবন এখন মগ-বৌদ্ধ, সেনাবাহিনী এবং গণতন্ত্রের নতুন ফেরিওয়ালা অং সান সু চির হাতের মুঠোয়! মানুষের মাংসে বারবিকিউ বানানো কিংবা যৌনলালসা চরিতার্থ করার সব উপকরণ যেন এখন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। নারী, শিশু, বৃদ্ধসহ আরাকানি জওয়ানদের মরণস্থল। রোহিঙ্গা মুসলমানদের পিতৃভূমি এ অঞ্চলটি আজ ইতিহাসের এক জঘন্যতম মৃত্যুপুরী। নানা অজুহাত এবং পূর্বপরিকল্পিত ইস্যু সৃষ্টি করে সেখানকার রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর দমন-পীড়ন চালাচ্ছে দেশটির সেনাবাহিনীসহ স্থানীয় রাখাইন বা মগরা। তারা গ্রামের পর গ্রামে আগুন জ্বালিয়ে রোহিঙ্গাদের বসতবাড়ি পুড়িয়ে দিচ্ছে। নির্বিচারে হত্যা করছে নারী, শিশু, বৃদ্ধসহ অসংখ্য রোহিঙ্গাকে। বাড়ি থেকে রোহিঙ্গা মহিলাদেরকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ ও হত্যা করা সেখানকার নিত্যদিনের খবর।

বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করছে নিজেদের সৃষ্ট ইস্যুতেই। অনেকে জীবন বাঁচানোর জন্যে দেশের অভ্যন্তরে বনে-জঙ্গলে লুকিয়ে থাকার চেষ্টা করছে। কিন্তু তাতেও তারা নিরাপদ নয়। পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গাদের দেখামাত্রই অমানবিক নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করে দেশটির সেনাবাহিনী। কোনো ধরনের মিডিয়াকর্মীকে সেসব এলাকায় প্রবেশ করতে দেয়া হয় না। সরকার, মগ-বৌদ্ধ ও সেনাবাহিনীর বানানো খবরই প্রচারিত হয় বিশ্বমিডিয়ায়। ‘ইতিহাস’ গড়া হচ্ছে তাদেরই ইচ্ছেমতো।

জাতিসঙ্ঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান আরাকান সফরে এসে ২৪ আগস্ট ইয়াঙ্গুনে সংবাদ সম্মেলন করলেন। এটাকে যেন রোহিঙ্গা নির্যাতন অভিযানের উদ্বোধন অনুষ্ঠান হিসেবে ব্যবহার করেছে মিয়ানমার।

কফি আনানের উপদেশমূলক বক্তব্যকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ‘সার্জিক্যাল অপারেশনের’ নামে সে রাতেই বর্ডার গার্ড পুলিশ এবং সেনাবাহিনী মংডুর নাইকাদং ও কোয়াংছিদং গ্রামে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়। এটি ছিল তাদের উদ্বোধনী অভিযান। তারপর রাত-দিন সমানে চালিয়ে যাচ্ছে এ অভিযান। ইতোমধ্যে কে বা কারা কাদের মদদে এবং মিয়ানমারের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে ‘রাখাইন রাজ্যে ৩০টি পুলিশ পোস্টে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের হামলা’ নামক গল্পের সূচনা করল, বিষয়টি বোধগম্য নয়। একই ধরনের গল্প রচনা করে গত বছরের অক্টোবরে লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে ভিটেমাটি ছাড়া করেছে মিয়ানমার। এবারো সেই প্রস্তুতি চলে আসছে বেশ কিছু দিন থেকে ‘সার্জিক্যাল অপারেশনের’ নামে। আর তারই রঙ্গমঞ্চ উদ্বোধন করা হলো কফি আনানের সংবাদ সম্মেলনের পরপরই। আসলে সেখানে কী ঘটছে এবং কারাই বা এর কলকাঠি নাড়ছে? বিষয়টি যাই হোক, রাখাইন রাজ্য নামের এ আরাকান প্রদেশে রোহিঙ্গা নির্মূল করাই মূল উদ্দেশ্য।

ইসলামি সম্মেলন সংস্থা ‘ওআইসি’র মহাসচিব ড. ইউসেফ বিন আহমাদ আল ওছাইমিন বাংলাদেশ সফরে এসে গত ৪ আগস্ট রোহিঙ্গা আশ্রয়ক্যাম্প দেখতে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি সাংবাদিকদের কাছে রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকারসহ মানবাধিকার হরণের নানা বিষয়ে কথা বলেন এবং মিয়ানমার সফরে যাওয়ারও আকাক্সক্ষা ব্যক্ত করেন। কিন্তু তার সফরে যাওয়ার কোনো সুযোগ কি মিয়ানমার সরকার দেবে?

কখনোই না। কারণ কোনো মুসলিম নেতা দূরে থাক, খোদ জাতিসঙ্ঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর অমুসলিম প্রতিনিধিরাই সেখানে অবাঞ্ছিত। জাতিসঙ্ঘের স্পেশাল র্যাপোর্টিয়ার ইয়াংহি লি মিয়ানমারে নির্বিঘেœ সফর করে সরেজমিন তথ্য সংগ্রহে ব্যর্থ হয়েছেন। ১২ দিনের সফর শেষে জেনেভায় পৌঁছে গত ২৪ জুলাই তিনি এক বিবৃতি দিয়েছেন। সে বিবৃতিতে উঠে এসেছে, ইতঃপূর্বের সামরিক শাসনের যে ইতিহাস, তারই পুনরাবৃত্তি ঘটনো হচ্ছে সদ্য গণতন্ত্রে উত্তরণের এ দেশটিতে। সেখানকার হত্যা, নির্যাতন, বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ, পুলিশি হেফাজতে হত্যা, গুমসহ নানাবিধ মানবিক সঙ্কট এখন অব্যাহত। তিনি বলেন, ‘সফরকালে আমার নিজের চলাচলও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও সঙ্কটপূর্ণ এলাকাগুলোতে যেতে পারছে না। আমার সাথে দেখা করতে আসা লোকজন নানাভাবে হয়রানির শিকার হয়েছে। আমার সফরের ওপর মিয়ানমার সরকার পূর্বশর্ত আরোপ করেছে, যা নজিরবিহীন।’ তিনি আরো বলেন, ‘আগের সরকারের ব্যবহৃত কৌশল এখনো প্রয়োগ করা হচ্ছে, যা খুবই দুঃখজনক।’

গত ২০১৬ সালের অক্টোবর-নভেম্বরে ঘটে যাওয়া রোহিঙ্গা দমন-পীড়নেও কোনো তথ্য বাইরে প্রকাশ করতে দেয়া হয়নি। গত ১৯ নভেম্বর হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দেয়া তথ্যের আলোকে ওয়াশিংটন পোস্ট একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সে প্রতিবেদনে স্যাটেলাইটে তোলা ছবির মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে, সে দেশের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের গ্রামের পর গ্রাম আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ শনাক্ত করে, মাত্র তিন সপ্তাহে রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গাদের তিনটি গ্রাম সম্পূর্ণরূপে পুড়িয়ে দিয়েছে সেনাবাহিনী। এতে অসংখ্য বাড়িঘর একেবারে ভস্মীভূত হয়েছে।

রোহিঙ্গাদের বরাত দিয়ে কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে যে, গত তিন সপ্তাহে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ৬৯ জন রোহিঙ্গাকে হত্যা করেছে বলে সেনাবাহিনী দাবি করেছে। কিন্তু রোহিঙ্গা নেতা নূরুল ইসলামের বরাত দিয়ে গণমাধ্যম প্রকাশ করেছে, সেখানে চার শতাধিক রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়েছে। সেনাসদস্যরা বিভিন্ন পাড়ায় ঢুকে বাড়ি বাড়ি তল্লাশির নামে হত্যাযজ্ঞ, লুটতরাজ ও ধর্ষণের মতো জঘন্য কর্মকাণ্ড করছে। এমন নির্মমতায় প্রাণ হারাচ্ছে অসহায় নারী শিশু ও বৃদ্ধসহ সেখানকার খেটে খাওয়া রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠী।

সর্বস্ব হারিয়ে প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে তারা পাড়ি জমানোর চেষ্টা করছে পাশের বাংলাদেশে। ২০১২ সালে বৌদ্ধদের রোহিঙ্গাবিরোধী দাঙ্গায় বহু মুসলমান যেমন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে, তেমনি প্রায় এক লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা মুসলমান বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদ হয়ে অস্থায়ী উদ্বাস্তু হিসেবে ক্যাম্পে মানবেতর জীবন যাপন করছে। ইতঃপূর্বে ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে বাংলাদেশের মতো মিয়ানমারের আরাকান প্রদেশও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। কিন্তু ঘূর্ণিঝড়ের পরও রোহিঙ্গাদের জানমালের খোঁজখবর, পুনর্বাসন কিংবা ত্রাণকার্যক্রমসহ কোনো সাহায্য-সহযোগিতা করেনি বৌদ্ধ অধ্যুষিত মিয়ানমার সরকার। বরং ক্ষতিগ্রস্ত মগদের পুনর্বাসনে রোহিঙ্গাদের ওপর চাঁদা পর্যন্ত ধার্য করা হয়েছিল বলে অভিযোগ আছে।

উল্লেখ্য, আরাকানের রোহিঙ্গা মুসলমানেরা শত শত বছরের ঐতিহ্য নিয়েই সেখানে বসবাস করছে। জাতিসঙ্ঘ বারবার মিয়ানমারকে বলেছে, ‘আইনের শাসন ও নাগরিকত্ব আইন প্রয়োগ করতে হবে। যারা মিয়ানমারের বৈধ নাগরিক, তাদের পূর্ণ অধিকার পাওয়া উচিত।’ কিন্তু মিয়ানমার ১৯৮২ সালে তাদের সংবিধানে নতুন নাগরিকত্ব আইনে বিরাট পরিবর্তন ঘটিয়েছে। এ আইনে নাগরিকদের সিটিজেন, অ্যাসোসিয়েট এবং ন্যাচারালাইজড শ্রেণীতে ভাগ করে ১৮২৩ সালের পরে আগত হলে অ্যাসোসিয়েট কিংবা ১৯৮২ সালে নতুনভাবে দরখাস্ত করা হলে ন্যাচারালাইজড ঘোষণা করার ব্যবস্থা করে। এ আইনের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ভাসমান নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

যেহেতু রোহিঙ্গা সমস্যার প্রেক্ষাপটে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বাংলাদেশ, তাই এর স্থায়ী সমাধানের জন্য বাংলাদেশকেও উদ্যোগ নিতে হবে। আরাকানি মুসলমানদের সাথে বাংলাদেশের সহস্র বছরের বন্ধন ও ঘনিষ্ঠতাকে সামনে রেখে এবং ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, পারিবারিক ও ধর্মীয়সহ এবং বহুমাত্রিক বন্ধনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে দেশের স্বার্থে; মানবতার ডাকে বাংলাদেশেরই এগিয়ে আসা উচিত। রোহিঙ্গা সমস্যাকে জাতিসঙ্ঘসহ বিশ্বের কাছে গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরতে হবে; এ ক্ষেত্রে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে সমস্যা সমাধানের জন্য উৎসাহিত করা ছাড়াও ওআইসিসহ আন্তর্জাতিক মুসলিম সংস্থাগুলো মিলে জাতিসঙ্ঘের কাছে এর গুরুত্ব তুলে ধরে চাপ সৃষ্টি করতে হবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে অসহনীয় নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য জাতিসঙ্ঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে রোহিঙ্গাদের পূর্ণ নাগরিকসুবিধা দেয়ার মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান করার উদ্যোগ নেয়াই এখন সময়ের দাবি। গণতন্ত্রের লেবাসে অং সান সু চির সরকারও রোহিঙ্গানীতিতে সামরিক জান্তার পথেই হাঁটছে। আরাকানে রোহিঙ্গাদের বাঁচার আর কোনো ভরসাই থাকল না।
লেখক : রোহিঙ্গা গবেষক; প্রফেসর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
mrakhanda@gmail.com

ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম/এইচএমএল



সর্বশেষ সংবাদ