বাংলা ফন্ট

আমরা মেনে নিই বলেই ভাষার এই হাল হয়েছে

02-08-2017
সুকান্ত চৌধুরী

 আমরা মেনে নিই বলেই ভাষার এই হাল হয়েছে
ভা ষা-সাহিত্যের ছাত্র হিসাবে ইদানীং একটা নতুন প্রাপ্তি লাভ করছি, তা হল আক্ষরিক অর্থে খাঁটি ননসেন্সের আস্বাদ। ননসেন্স মানে অর্থহীন উক্তি। সম্পূর্ণ অর্থহীন উক্তি কিন্তু প্রায় অসম্ভব। প্রত্যেক শব্দের একটা মানে আছে, বাক্যে সাজালে সেগুলির তাৎপর্য আরও বাড়ে। এডওয়ার্ড লিয়র বা লুইস ক্যারল, সুকুমার রায় বা ‘খাপছাড়া’র রবীন্দ্রনাথের রচনা বিষয়বস্তুতে যত উদ্ভট, ভাষায় ততটা নয়। তাঁদের সৃষ্ট কৃত্রিম শব্দগুলিও আসল শব্দের ছায়ামূর্তি।

কবিদের ক্ষমতা আর কত দূর? বলশালী শক্তি এক দিকে সরকার বাহাদুর, অন্য দিকে কর্পোরেট দৈত্যকুল। তাঁদের আনুকূল্যে বাংলার ছদ্মবেশে কিছু অর্থহীন নয়-পাঠ সৃষ্টি হয়ে চলেছে। সম্প্রতি তার দুটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেখা গেল। এক বৃহৎ টেলিকম সংস্থা সংবাদপত্রের প্রথম পাতা জুড়ে এমন বিজ্ঞাপন ছাপাল যাতে পরমসহিষ্ণু বাঙালি পাঠকও দলে-দলে প্রতিবাদ জানালেন। সেই বিজ্ঞাপনে তবু অর্থের একটা আভাস ছিল। সম্প্রতি (২৮ জুলাই) আনন্দবাজারে পেলাম কেন্দ্রীয় সরকারের স্বাস্থ্য-পত্রিকার বাংলা সংস্করণে নিখাদ ননসেন্সের নিদর্শন: ‘সিঁড়ি হাত পাগল মত হোমস বয়স্ক বন্ধুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ ব্যবহার।’ জানলাম টুথব্রাশ প্রতিস্থাপন, ‘শিম আকৃতির প্রত্যঙ্গ’ আর ক্রোধোন্মাদ তেলাপোকার কথা। সুকুমার রায়ের অকালপ্রয়াণের দুঃখ ঘুচল। বেরসিক সরকার অবশ্য পত্রিকাটির প্রচার বন্ধ করেছে।

ধরে নেওয়া যায়, বিভ্রাটের মূলে কম্পিউটার-কৃত ‘যান্ত্রিক অনুবাদ’। কম্পিউটার কিন্তু বানায় মানুষ, চালায় মানুষ। অন্য কোনও ক্ষেত্রে এমন অনর্থ ঘটলে প্রযুক্তিবিদরা দেখেই বুঝতেন এটা বৈদ্যুতিন আবর্জনা, ‘গার্বেজ’। ভাষার ক্ষেত্রে যে টনক নড়েনি, সেটা তাঁদের পেশাগত ত্রুটি।

ত্রুটি দুই স্তরে। যত দূর জানি, ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদের জন্য এর চেয়ে ভদ্রস্থ কম্পিউটার-প্রণালী তৈরি হয়েছে। আরও বড় কথা, ভাষা সংক্রান্ত কোনও কম্পিউটার-প্রণালী একশো ভাগ নির্ভুল নয়, ফলটা বিচার খাটিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে হয়। এ ক্ষেত্রে স্পষ্টত সেটা হয়নি। কম্পিউটারকে গাল না পেড়ে তাই আত্মসমীক্ষার দরকার— শুধু কিছু কম্পিউটারবিদের নয়, আমাদের সকলের। আমরা এমনটা চাই বা নিদেনপক্ষে মেনে নিই বলেই তাঁদের গাফিলতি পার পেয়ে যায়।

দৈন্যের মূলে মেট্রোপলিটান পেশাদার সমাজে বাংলা সম্বন্ধে একটা ঔদাসীন্য, কখনও যেন বাংলা না-জানায় এক ধরনের গর্ববোধ। ধরে নেওয়া হয়, আসল কাজের ভাষা ইংরেজি বা হিন্দি, পাশাপাশি বাংলার উপস্থিতি একটা ক্লান্তিকর নিয়মরক্ষা।

অন্য কিছু রাজ্যে স্থানীয় ভাষার সমর্থনে জঙ্গি আন্দোলন চলে, তাই সেটাকে একটু-আধটু খাতির করতে হয়। বাংলা নিয়ে জঙ্গি আন্দোলনে কাজ নেই, নানা জঙ্গিপনা সামলাতে সমাজ-সরকার এমনিতেই জেরবার। কিন্তু ভাষার উপর এই জঙ্গি অত্যাচারও কাম্য নয়, তার শান্তিপূর্ণ অবসানের উপায় খোঁজা দরকার।

এক কালে ভারতে ‘শিক্ষিত’ লোক মাত্রে মোটামুটি ইংরেজি জানত। আজ এক ব্যাপক শিক্ষিত শ্রেণি ও আরও ব্যাপক সাক্ষর শ্রেণি গড়ে উঠেছে যারা ইংরেজিতে অস্বচ্ছন্দ। এ দিকে সরকারি-সামাজিক-আর্থিক এমনকী সাংসারিক সব ক্ষেত্রে ভাষার আনুষ্ঠানিক ব্যবহার বেড়ে চলেছে; এ রাজ্যে সেই ভাষা হতে পারে একমাত্র বাংলা। (পাহাড়ের মতো কিছু অঞ্চলের কথা নিশ্চয় আলাদা।) এটা প্রত্যাশিত, স্বাভাবিক ও কাম্য পরিস্থিতি। এর ফলে পরিস্রুত জলের মতো পরিস্রুত ভাষা সুনিশ্চিত করার একটা দায় বর্তায়। এটা অবশ্যই ভাষাগত শুচিবাইয়ের পক্ষে সওয়াল নয়: পরিস্রুত জল বলতে ডিসটিল্ড ওয়াটার বোঝায় না।

বাংলার উপর দুটি বলশালী ভাষার প্রভাব খেলে, ইংরেজি আর হিন্দি। সত্যি বলতে কী, এই দুটিরও সংগম ঘটতে শুরু করেছে। ‘হিংলিশ’ আজ একটা কৌতুকপ্রদ জগাখিচুড়ি, কিন্তু বহুপ্রচলিত ও বর্ধিষ্ণু। হতেও পারে, এক-দু’শো বছরে তা হয়ে উঠবে উর্দুর মতো সংমিশ্রণলব্ধ, একান্ত ভারতীয় একটা স্বতন্ত্র সমৃদ্ধ ভাষা। এই মিশ্র প্রভাব পড়ছে বাংলার উপর— শুধু ভাষাগত নয়, গভীর সামাজিক প্রভাব।

একটা সজীব ভাষা সামাজিক-রাজনৈতিকভাবে আরও প্রভাবশালী কোনও ভাষার সংস্পর্শে এলে তলিয়ে যায় না, বরং কিছু-কিছু আত্মসাৎ করে শক্তি ও সমৃদ্ধির তাগিদে: কেবল শব্দভাণ্ডার নয়, হয়তো ব্যাকরণ বা প্রয়োগের উপকরণ। আরবি-ফার্সি থেকে তো বটেই, বাংলা এ ভাবে প্রচুর গ্রহণ করেছে পর্তুগিজ থেকে, করেছে ও করছে ইংরেজি ও ইদানীংকালে হিন্দি থেকে। এ ভাবেই আমাদের জীবৎকালে ‘সঙ্গে’র জায়গায় এসেছে ‘সাথে’, ‘তরকারি’র জায়গায় ‘সবজি’; খবর ‘শেয়ার’ করা হচ্ছে; ‘পেশ’ হচ্ছে কোনও পণ্য; পথে-ঘাটে বচসা বাধছে ‘আগে’-র প্রচলিত আর অধুনা হিন্দিলব্ধ অর্থ নিয়ে। (শিয়ালদহ থেকে শ্যামবাজার যেতে মানিকতলার ‘আগে’ রাজাবাজার, না রাজাবাজারের ‘আগে’ মানিকতলা?) এমন পরিবর্তন অবধারিত, এবং প্রাণবন্ত ভাষার লক্ষণ। ‘সঙ্গে’ একদিন এসেছিল ‘সহিত’কে হটিয়ে, ‘তরকারি’ ‘ব্যঞ্জন’কে।

গোল বাধায়, এমন স্বাভাবিক সর্বগ্রাহ্য উদ্ভাবন নয়, উটকো দুর্বোধ্য অপ-তরজমা আর পাঁচমিশেলি কিচিরমিচির: সাধারণ বাঙালি যার মানে বুঝতে নাজেহাল, যার দাপটে তার অভ্যস্ত ভাষা ভুলিয়ে-গুলিয়ে ফিকে আর কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। টিভিতে কোনও সর্বভারতীয় পণ্যের বাংলায় ডাব-করা বিজ্ঞাপন চোখ বুজে শুনুন। উচ্চারণ ও বাচনভঙ্গি কি আপনার পারিপার্শ্বিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলছে? সেখানে কি ওই অর্থ বোঝাতে ওই শব্দগুলি ওই বাক্যবিন্যাসে ব্যবহার হত? মনে হচ্ছে কি, বাংলা শব্দগুলো কোনও হিন্দিভাষী ইংরেজি হরফে
লিখে পড়ছে? শিক্ষিত এমনকী অল্পশিক্ষিত বাঙালির বয়ানে ঢের ইংরেজির মিশেল থাকে, কিন্তু সবসময় এতটা কি, বিশেষত যেখানে একটা প্রচলিত বাংলা শব্দ হয়তো যথেষ্ট চালু? এটা শুধু ভাষার ব্যাপার নয়, সামাজিক চিহ্নিতকরণ: বাংলাকে এই ভিন্‌দেশি ভাষার মতো ব্যবহার যেন ভোগবাদী কসমোপলিটান জীবনযাত্রার উপযুক্ত বাক্‌রীতি, বিজ্ঞাপনের মহার্ঘ লোভনীয় সামগ্রীটির আমেজে ভরপুর।

চরিত্রে যতই ভিন্ন হোক, সরকারি পরিভাষার পিছনে একই মানসিকতা: ওটাও এক শক্তিশালী উচ্চবর্গের ভাষা, প্রজাদের সঙ্গে আদানপ্রদানে প্রভুদের অভ্যস্ত ভাষা। তার অর্থ লুকিয়ে আছে ইংরেজি বা হিন্দির গহ্বরে, নিয়মরক্ষার জন্য একটা বাংলা-বাংলা ঠাট বজায় রাখলেই হল। ‘উচ্চ সড়ক ভুক্তি’ কাকে বলে জানেন? ওটা পূর্ত বিভাগের ‘হাইরোড ডিভিশন’-এর বাংলা নাম। নতুন রেশন কার্ড সম্বন্ধে যে জরুরি বিজ্ঞপ্তি ক’মাস আগে প্রচারিত হল (অধিকাংশ ভুক্তভোগী নাগরিক যা বাংলায় পড়বেন), মূল ইংরেজির সহায় ছাড়া (হয়তো বা সহায় নিলেও) তার অর্থোদ্ধার অসম্ভব। জনসাধারণের ব্যবহার্য বেশির ভাগ ফর্ম সম্বন্ধে একই কথা খাটে। ধরা হয়, লোকে কাউকে ধরে-বলে বুঝে নেবে, ভুল বুঝলে পস্তাবে। এক কালে নিরক্ষর মানুষগুলোকে এ ভাবে বাগে রাখা যেত, আজ লেখাপড়া শিখে তাদের লাই বেড়েছে। বেশ তো, দিলাম লিখে, দেখি কেমন বোঝে!

বাংলা ভাষার উপর যে সাঁড়াশি আক্রমণ চলছে, এটা তার এক দিক; অন্যটা সাধারণ বাঙালি ও তাদের জনমুখী নেতৃবৃন্দের অজ্ঞতা ও অবহেলা। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিজ্ঞপ্তিতে বানান-ব্যাকরণের ভুল মাঝেসাঝে চোখে পড়ে; ক্রমাগত পড়ে ব্যক্তি-নেতা বা পার্টি-শাখার স্লোগান-বিজ্ঞপ্তি-ইস্তাহারে। খুঁত ধরতে বাধে, কারণ বানানের ব্যাপারে বঙ্গবাসী মাত্রে নীলকণ্ঠ। নিজের বা আপনজনের নাম ঠিকভাবে লিখতে আমরা অক্ষম, অগুনতি বাস-অটো-ট্যাক্সির গাত্রলিপি সাক্ষ্য। উচ্চশিক্ষিত মহলেও ‘আশীষ’ আর ‘অনুসূয়া’ নিপাতনে সিদ্ধ হয়ে গেছে। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়াললিখন একটু কম দৃষ্টিকটু লাগত যদি ইংরেজি দূরস্থান, বাংলাটা অন্তত সর্বদা প্রমাদমুক্ত হত। লজ্জার সঙ্গে বলছি, নানা শিক্ষক-সংগঠন থেকে নিত্য যে কাগজপত্র পাই, সেগুলিকেও সবসময় আজকের ভাষায় ‘গ্রিনচিট’ দেওয়া যায় না।

যে শিশুরা ঘরে-বাইরে অশুদ্ধ উদ্ভট বাংলা দিবারাত্র দেখছে-শুনছে, স্কুলে কয়েক ঘণ্টা পাঠ্যপুস্তকের সংস্পর্শে তাদের বোধ কতটা শোধরাবে? ‘বোধ’ শব্দটা ইচ্ছা করে ব্যবহার করলাম: কেবল বানান-ব্যাকরণের প্রশ্ন হলে এত কচকচির দরকার পড়ত না। বানান ধ্রুব নয়, কিন্তু শুদ্ধ বানান সজাগ চেতনার একটা লক্ষণ। ব্যাকরণের, বিশেষত বাক্যগঠনের সঙ্গে চিন্তা করার, চিন্তার উপকরণ সাজাবার ক্ষমতা ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। ভাষার যে দৈন্যদশা তুলে ধরলাম, সেটা আদতে চিন্তার দৈন্য। সরকারি আচারবিধি, বিপণনের বাণী, রাজনীতির নির্ঘোষ, শিক্ষাসত্রের তোতাকাহিনি— কোনওটাই চিন্তার অভিব্যক্তি নয়, আমাদেরও চিন্তা থেকে নিরস্ত করতে চায়। ভাষার বিকার তার বাহ্য উপসর্গ মাত্র।

প্রতিকারের রাস্তা কী? হাজার নালিশ সত্ত্বেও আইনশৃঙ্খলা সামলাতে যেমন পুলিশ ছাড়া গতি নেই, তেমনি মনন-কথন-বিশ্লেষণ শেখাতে অগতির গতি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা। কথাটা এত স্পষ্ট, আর তার অনুষঙ্গ এত দীর্ঘ, যে এই প্রবন্ধে আলোচনার অবকাশ নেই। বরং দুটো কেজো প্রস্তাব দিয়ে শেষ করি।

আগেই বলেছি সেই বিশাল নব্যসাক্ষর শ্রেণির কথা, এতদিনে যাঁরা দ্বিতীয় প্রজন্মে পা দিচ্ছেন। তাঁদের মনের খোরাক জোগাবার পাঠ্যবস্তুর একান্ত অভাব। ফলে একটা অংশ আবার নিরক্ষরতায় ঢলে পড়েন। বাকিরা মানসিক শূন্যতায় ভোগেন, তাঁদের সাক্ষরতা কোনও কাজে লাগে না— না নিজেদের, না সমাজের, না ভাষার।

বহু বিলম্বে রাজ্যের গ্রন্থাগার ব্যবস্থার কিছু সংস্কারের কথা হচ্ছে, যদিও প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। জনে-জনে বই পড়াবার আরও কার্যকর উপায় কিন্তু আজ আক্ষরিক অর্থে হাতের মুঠোয়: সে ব্যবস্থা বৈদ্যুতিন। গ্রামে-গঞ্জে-মফস্‌সলে স্মার্টফোনের ব্যবহার বিপুলভাবে বাড়ছে। গণতন্ত্রের হাতিয়ার এই যন্ত্রটির সাহায্যে, অনেক কম খরচে ও সহস্রগুণ কম প্রশাসনিক উদ্যোগে ঘরে-ঘরে সৎসাহিত্য তথা বাংলা ভাষায় সব রকম পাঠ্য ও জ্ঞাতব্য বস্তু পাঠানো যায়। এক ধাপ এগিয়ে, মামুলি কম্পিউটার ও ব্রডব্যান্ড সংযোগের ব্যবস্থা করলে স্কুলে-স্কুলে পড়ানো যায় ইন্টারনেটে নিখরচায় প্রাপ্তব্য আকর্ষণীয় শিশুপাঠ্য বইয়ের সম্ভার। সরকারের অত্যন্ত সক্রিয় প্রচারমাধ্যমের সাহায্যে এমন ব্যবস্থা অচিরে জনপ্রিয় করে তোলা যায়। যদি স্থূল প্রচারের কিছু মিশেল থাকে, থাকলই বা। পড়তে-পড়তে তা যাচাই করার ক্ষমতা পাঠক আপনিই অর্জন করবে।

আমার দ্বিতীয় প্রস্তাবটি একই ক্ষেত্রে কিন্তু অন্য উদ্দেশ্যে। কিছুদিন যাবৎ বাংলা ভাষার বৈদ্যুতিন প্রক্রিয়াকরণ সম্বন্ধে কিছু জানার সুযোগ হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের পক্ষে পরিতাপের বিষয়, এ ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য কাজকর্ম বেশির ভাগ হয়েছে বাংলাদেশে। এপার বাংলায় দু-চারটি প্রতিষ্ঠানে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু মূল্যবান কাজ হচ্ছে, কিন্তু সাধারণভাবে কোনও উদ্যোগ এমনকী সচেতনতা জেগে ওঠেনি। আমাদের সাংস্কৃতিক মূলধন বই-পুঁথি-পাণ্ডুলিপির সংগ্রহশালাগুলি প্রায়ই অচলায়তন, বৈদ্যুতিন সংরক্ষণে কেবল নিরুৎসাহ নয়, সন্দিহান ও বাধাসৃষ্টিকারী। (কয়েকটি সম্মাননীয় ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে।) সরকারের তথ্যপ্রযুক্তি বা সংস্কৃতি বিভাগের পক্ষে এমন কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি (কর্পোরেট দুনিয়া সম্বন্ধে আশা করাই ভুল); না হয়েছে শিক্ষা-সংস্কৃতি-গবেষণা, প্রশাসন-সমীক্ষা-নথিকরণের জন্য বাংলা ভাষার বৈদ্যুতিন প্রয়োগ ও বাংলায় আধারিত তথ্য প্রক্রিয়াকরণের তেমন কোনও পদক্ষেপ। বঙ্গীয় কৃষ্টি নিয়ে আমাদের মাতামাতি কি রাস্তার মোড়ে রবীন্দ্রসংগীত বাজিয়ে ফুরিয়ে যাবে? সহজলভ্য আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে, সারা দুনিয়ার চোখে সত্যিই ‘বিশ্ববঙ্গ’কে তুলে ধরার কোনও চেষ্টা হবে না?

এক দিকে বানান-ব্যাকরণ, আর এক দিকে এমন বৃহৎ কর্মকাণ্ডের স্বপ্নবিলাস— আশমান-জমিন জোরেজারে মেলানো হচ্ছে কি? কিন্তু এ ছাড়া বোধ হয় উপায় নেই। আর সব কিছুর মতো, ভাষার এই জরুরি ক্ষেত্রেও স্থবিরত্ব ঘোচানোর একমাত্র উপায় অভ্যস্ত চিন্তায় একটা বড় রকম নাড়া দেওয়া। নইলে দিনগত পাপক্ষয়ের আড়ালে পাপের বোঝা দিন-দিন বেড়েই চলবে।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে এমেরিটাস অধ্যাপক

ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম/এইচএমএল





সর্বশেষ সংবাদ