বাংলা ফন্ট

‘কর’ নিয়ে ‘কড়মড়’

03-06-2017
কাকন রেজা

‘কর’ নিয়ে ‘কড়মড়’




শুক্রবার রাতে সেহরির সময়। সবাই খাবে, টিভিটাও ছাড়া। টিভিতে চলছিল গোপাল ভাঁড়। এই সিরিয়ালটি আমার পুরো পরিবারই পছন্দ করে। কাকতালীয়ভাবে সেই এপিসোডটিতে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের বাড়তি টাকার প্রয়োজন, পূজোর উৎসব আয়োজনে। কিন্তু রাজকোষ খালি, মন্ত্রী হিসাবও দিচ্ছে না। কিন্তু টাকা তো প্রয়োজন। মন্ত্রী দায়িত্ব নিল বাড়তি টাকা আদায়ের। প্রজারা জোরে হেঁটে গেলে কর দিতে হয়, ছুটে গেলে কর দিতে হয়। আরও কত কী বাহানায় কর আদায়। প্রজাদের হাঁসফাঁস অবস্থা বাড়তি টাকা যোগানে।

কাকতালীয় বললাম এজন্যে যে, বৃহস্পতিবার আমাদেরও বাজেট বক্তৃতা ছিল। অর্থমন্ত্রী বাজেট ঘোষণা করলেন। আবগারী শুল্কসহ নানা কিসিমের করের কথা শুনছি। ব্যাংকের টাকা রাখলে নাকি টাকা কেটে নেওয়া হবে। গ্যাসের দাম নাকি দুই চুলায় সাড়ে নয়শ’ এক চুলায় নয়শ’। এইসব ‘নয়ছয়’ আমিও ঠিক মতো বুঝি না। গণমাধ্যমে দেখলাম একনজরে বাজেট। দেখলাম কিন্তু মাথায় ঢুকল না। মাথায় ঢোকাতে ঢুঁ মারলাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, দেখি কে কী বলেন।

খ্যাত সাহিত্যজন মঈনুল আহসান সাবের লিখলেন, ‘মনে হচ্ছে একটা খাত বাদ পড়ে গেছে। ব্যাংকে যাদের হিসাব নেই, তাদের কেন হিসাব নেই, এই অপরাধে টাকা কাটার ব্যবস্থা থাকতে পারত।’ লিখেও অবশ্য বেচারা বিপদে পড়ে গেলেন, কমেন্টের ওপর কমেন্ট। যোগ দিলাম আমিও, সাবের ভাইয়ের সঙ্গে জানামতে আমার কোনো শত্রুতা নাই, তাও কেন যে ভাই এমনটা লিখলেন। একজন রীতিমতো প্রতিবাদ জানিয়ে বললেন, ‘আমার তো ব্যাংক হিসাব নাই, বিকাশ নাই, কিচ্ছু নাই। আমি এই লেখার তীব্র প্রতিবাদ করছি। ইহা একটি উস্কানিমূলক পোস্ট।’ বোঝেন অবস্থা, ‘পাগলারে নাও ডোবানোর কথা’ সাবের ভাই কেন যে মনে করালেন। আরেকজন হয়তো তা ভেবেই লিখলেন, ‘বাজেট চূড়ান্ত নয়, এবার এটাও ঢুকিয়ে দেবে।’ একটু পরেই সাবের ভাইয়ের আবার লিখা, ‘অর্থমন্ত্রীর নাম ভুলে গেছি। কেউ একটু মনে করিয়ে দেবেন?’ মরজ্বালা!

‘সাপ্তাহিক’ সম্পাদক, খ্যাত সাংবাদিক গোলাম মোর্তোজা লিখলেন, ‘জনগণের থেকে কর নিয়ে, এ পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকগুলোকে ১৪ হাজার কোটিরও বেশি টাকা দেওয়া হয়েছে এবং সবাই মিলে ------ করে তা নিয়ে গেছে। এবার ------ অব্যাহত রাখার জন্য ২ হাজার কোটি রাখা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আবার বাজেট বক্তৃতায় বিষয়টি কৌশলে গোপন করে গেছেন। আপনার ব্যাংক হিসাব থেকে টাকা কেটে নিয়ে, সেই টাকা ------ জন্যে দেওয়া হবে।’ (শূন্যস্থানে কী লিখা আছে তা জানার জন্য ওনার টাইমলাইন ভিজিট করতে হবে।) আগেই বলেছি অর্থনীতিতে আমি কাঁচা, একেবারেই কচিকাঁচা। তাই গোলাম মোর্তোজার লেখার ব্যাপারে আমার কিছু বলার নেই। অন্যদিকে ওনার কমেন্টের ঘরটি বন্ধ থাকাতেও বাঁচোয়া, ইচ্ছা থাকলেও উপায় নেই।

এরমধ্যে আবার ভয় ধরিয়ে দিলেন প্রবাসী সাংবাদিক, লেখক মাসকাওয়াথ আহসান। তিনি লিখলেন, ‘বাজেট নিয়ে পর্যালোচনা করতে ‘ফেসবুক লীগে’র অনুমতি নিন।’ তার লেখার নিচে কমেন্টের ঘরের দিকে তাই ভুলেও যাইনি। মনে মনে বলেছি, তো ভাই অনুমতি নিতেও কী কোনো কর লাগে?

তবে এসব কথার বিপরীতে একজন সংসদ সদস্যের বক্তব্যও ফেলে দেওয়ার নয়। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম লিখলেন, ‘এর আগে সবধরনের আমানতেই (এমনকি ১০০,০০০ টাকার নীচে আপনার ২০,০০০ হলেও) ৫০০ টাকা শুল্ক ছিল। নতুন প্রস্তাবে ১০০,০০০ টাকার নীচের আমানতে এটা সম্পূর্ন প্রত্যাহার করা হয়েছে। বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোতে মোট আমানতকারীর শতকরা ৮০% ভাগের আমানত ১০০,০০০ টাকার নীচে। এটা করাই হয়েছে নিম্নআয়ের এবং মধ্যবিত্তের কথা চিন্তা করে। আর যাদের লক্ষাধিক টাকা সঞ্চয় আছে তাদের ৫০০ টাকার জায়গায় ১০০ টাকা না দিতে চাওয়ার মানসিকতা পরিহার করা উচিত।’ আগেই অজ্ঞতা প্রকাশ করেছি, অর্থনীতি কম বুঝি বলে। তবে যারা ব্যাংকের টাকা কেটে নেওয়া নিয়ে ‘ক্যাটক্যাটে’ কথা বলেন ‘উড বি’ মধ্যম আয়ের নাগরিক হিসেবে তারা যুক্তিটা ভেবে দেখতে পারেন। একজন নীতিনির্ধারকের কথা তো ফেলে দেওয়ার নয়।

ওদিকে একটি বেসরকারি টেলিভিশনে কর্মরত একজন লিখলেন, ‘সংসদে আমার কথা বলার একটা মানুষ নাই? না থাক। আজ থেকে যেখানে পারব ট্যাক্স ফাঁকি দেবো। --- নিজের টাকা নিজেই খাব।’ আরে ভাই, ‘বাকী রাখা খাজনা, মোটে ভাল কাজ না। ভরপেট নাও খাই, রাজকর দেওয়া চাই’ বোঝেন না কেন! আপনি উল্টো ট্যাক্স ফাঁকি দিতে চান।

এতসব দেখেই বোধহয় ছোটভাই সাংবাদিক তানজিল রিমন লিখলেন, ‘সুতরাং ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ার ওপর কর আরোপ করা হোক’। কথা মন্দ না। আকামে বেশি কথা কয় বাঙাল। কথার ওপর ‘ট্যাক্সো’ বসাইলে, কথা কম কইব, আর কথা কম কইলে ঝামেলাও হইব কম। আর বেশি কইলেই খাজনা, গুনতে হইব টেকা, ত্যারাব্যাকা বনধ।

পুনশ্চ: আরেকজনকে দেখলাম তেলের দাম না কমিয়ে গ্যাসের দাম কেন বাড়ানো হলো তাই নিয়ে আক্ষেপ করছেন। আরে ভাই যেভাবে ‘তৈলবাজি’ চলছে তাতে তো আয়নাবাজিও ফেল। সবকিছু ধারণের ক্ষমতাও তো থাকতে হবে। তাই হয়তো ‘তৈলবাজি’ কমাতেই তেলের দাম কমানো হয়নি। যেভাবে ‘গ্যাস’ দিয়ে ফোলানো হচ্ছে তাই ভেবে গ্যাসের দামও বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তাতে আপনার অসুবিধা কী?

খালি খারাপ কইবেন, আরে ভাই ‘বি পজিটিভ’। ভাইরে ‘পজিটিভি’ গ্রুপের রক্ত না কী দেশে বেশি, হক্কলে ‘পজিটিভ’ ভাইবা লন। কথায় কথায় ‘বি নেগেটিভ’ ভাব দেহান ক্যান!

ফুটনোট: গোপাল ভাঁড়ের গল্প দিয়ে শুরু করেছিলাম, গল্পের শেষটুক বলিনি। গল্পের শেষে বাড়তি করের অত্যাচারে প্রজারা সব গোপালের কাছে গেল বিহিতের কারণে। প্রজাদের অবস্থা দেখে গোপাল মহারাণীর স্মরণাপন্ন হলো। ‘লম্বা গোঁফ রাখলে পঞ্চাশ হাজার টাকা কর দিতে হবে, দামি জামাকাপড় পড়লে একলাখ টাকা কর দিতে হবে’, গোপালের বুদ্ধিতে মহারাণী এমন ফরমানে মহারাজার সীলমোহর করিয়ে নিলেন। পর দিন রাজসভায় করের কথা বলতেই গোপাল বলল, ‘তাহলে তো মন্ত্রী আর রাজাকেও কর দিতে হবে যেহেতু মন্ত্রীর লম্বা গোঁফ রয়েছে এবং রাজা দামি জামাকাপড় পরিধান করেন।’ বুদ্ধিতে কাজ হলো, নিজে কর দেওয়ার ভয়ে মন্ত্রী অজ্ঞান, রাজাও ইতস্তত। গোপাল, কইরে ভাই।


সর্বশেষ সংবাদ