বাংলা ফন্ট

বাংলাদেশের শরিয়াকরণ

08-05-2017
হাসান মাহমুদ

  বাংলাদেশের শরিয়াকরণ


‘এক যাত্রায় পৃথক ফল হয় না’– প্রজ্ঞায় ভরপুর একটি প্রবাদ। আজ আমরা ইসলাম নিয়ে যে পথে পা দিয়েছি, ৪০-৫০ বছর আগে আরেকটা ধর্মনিরপেক্ষ মুসলিমপ্রধান দেশ সে পথে পা দিয়েছিল। আজ সে দেশ কেমন আছে? কেমন আছে সংখ্যালঘুরা? ভিন্নমতের মুসলিমরা, বিশেষ করে নারীরা? ইতিহাসের বুকে প্রস্তরস্বাক্ষরে অঙ্কিত সেই পদচিহ্নগুলো ধরে ধরে একটু ঘুরে আসা যাক, কারণ এর ওপর আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।

রাজনীতি, ভাস্কর্য, কওমি সনদের স্বীকৃতি, স্কুলের সিলেবাস, সৌদি অর্থায়নে ৫৬০টি মডেল মসজিদ, পুলিশ লাইনে সরকারি খরচে ইসলামি অনুষ্ঠান, সরকারি খরচে ‘আরবি এফিলিয়েটিং বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত ইত্যাদি নিয়ে দেশে মতামতের প্রবল মেরুকরণ ও চিন্তার সংঘাত হচ্ছে। সেই সঙ্গে গত কয়েক দশক ধরে অত্যন্ত সন্তর্পণে জাতির অলক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্রোত বয়ে চলেছে। সেই দেশটাতেও এই একই স্রোত শুরু হয়েছিল। সেটা হল সাধারণ জনগণের শরিয়াকরণ।

একাডেমিক জরিপকারী সংগঠন হিসেবে ‘PEW’-এর খ্যাতি আছে। ২০১৩ সালের এপ্রিলে কিছু দেশের মুসলিমদের মধ্যে শরিয়ার প্রতি সমর্থন জরিপ করে PEW যে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে তাতে বাংলাদেশও আছে। জরিপের নাম ‘The World’s Muslims: Religion, Politics and Society’ (বিশ্বমুসলিম: ধর্ম, রাজনীতি ও সমাজ)। সেই জরিপ থেকে প্রধান পাঁচটি প্রশ্নোত্তর দেখাচ্ছি–

• প্রথম তিনটি জরিপ সাধারণ মুসলিমের মধ্যে:

১। শরিয়া আইনকে আল্লাহর নাজিলকৃত আইন বলে মনে করে – সর্বোচ্চ জর্দান ৮১%, সর্বনিম্ন আলবেনিয়া ২৪%। বাংলাদেশ ৬৫% ও পাকিস্তান ৮১%।
২। শরিয়া আইন একটাই, বিভিন্ন নয় বলে মনে করে – সর্বোচ্চ তাজিকিস্তান ৭০%, সর্বনিম্ন তিউনিশিয়া ২০%। বাংলাদেশ ৫৭% ও পাকিস্তান ৬১%।
৩। নিজের দেশে শরিয়া আইন চায় – সর্বোচ্চ আফগানিস্তান ৯৯%, সর্বনিম্ন আজারবাইজান ০৮%। বাংলাদেশ ৮২% ও পাকিস্তান ৮৪%।

• পরের জরিপগুলো শুধু শরিয়া সমর্থক মুসলিমদের মধ্যে:

৪। ব্যাভিচারীকে প্রস্তরাঘাতে মৃত্যুদণ্ড সমর্থন করে – সর্বোচ্চ পাকিস্তান ৮৯%, সর্বনিম্ন বসনিয়া ২১%। বাংলাদেশ ৫৫%।
৫। মুরতাদ অর্থাৎ ইসলামত্যাগীদের মৃত্যুদণ্ড সমর্থন করে – সর্বোচ্চ আফগানিস্তান ৭৯%, সর্বনিম্ন কাজাখস্তান ০৪%। বাংলাদেশ ৪৪% ও পাকিস্তান ৭৬%।

সেই ধর্মনিরপেক্ষ দেশটায় কোনো শরিয়া সমর্থক দল তখন ক্ষমতায় ছিল না, কিন্তু জাতির শরিয়াকরণ ঠেকানো যায়নি। আমাদের শরিয়াকরণও হচ্ছে ওই একই রাজনীতিনিরপেক্ষ পদ্ধতিতে। অর্থাৎ শরিয়াপন্থীরা ক্ষমতায় থাকুক বা না থাকুক বহু বছর ধরে দেশ শরিয়ার দিকে এগিয়ে গেছে। ADD POLITICAL ELEMENT IN CONSTITUTION. সেই এগিয়ে যাওয়ার পদ্ধতিটা কী? কারণটা কী? শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা, দ্রব্যমূল্য সর্বত্র নৈরাজ্য, রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন ও দুর্নীতিবাজদের দাপটসহ সমাজের সর্বক্ষেত্রে অসহ্য অরাজকতা বিরাজ করছে।

এমতাবস্থায় শরিয়াপন্থীদের প্রস্তাবিত ‘ইসলামি’ সমাধান ধীরে ধীরে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে এটাই স্বাভাবিক। ‘আল্লাহর আইন সবকিছু ঠিক করে দেবে’– এই বিশ্বাসে বিশ্বাসী হয়ে উঠছে জনগণ। বহু সাধারণ মানুষ কোনো মওলানা-মুফতির হুকুম বা ফতোয়া ছাড়াই নিজে থেকে শরিয়া প্রয়োগকারী হয়ে গেছে। লক্ষ্যণীয়, এই সাধারণ মানুষের অনেকেই কিন্তু কোনো ইসলামি দল করে না। কিছু উদাহরণ দিচ্ছি:

• আগে রোজার মধ্যে হোটেলগুলো চাদর দিয়ে ঢাকা থাকত। অমুসলিমরা তো বটেই কোনো কোনো মুসলিমও বাইরে খেত। এখন রোজার মধ্যে বাইরে কাউকে খেতে দেখলে সাধারণ মানুষের একাংশ হিংস্র হয়ে ওঠে। গাড়িতে ভ্যাপসা গরমের দুপুরে এক যাত্রী পানি খেয়েছে বলে ড্রাইভার বাস থামিয়ে তাকে অপমান করে নামিয়ে দিয়ে চলে গেছে।

• গ্রামে নানা-নানীর কোলে মানুষ, এখন ঢাকায় থাকে এমন একজনের কন্যার আকিকা। তিনি তার প্রিয় নানা-নানীকে গ্রাম থেকে আনার আয়োজন করেছেন। এদিকে উৎসবের সাত দিন আগে নানা মারা গেলেন। তখন গ্রামের সাধারণ মানুষ এসে দাবি করল শরিয়া মোতাবেক নানী চার মাস ঘরে থাকবে, নিজের নাতির বাসা হলেও ঢাকায় যেতে পারবে না।

• এক গ্রামে নববর্ষের উৎসবে এক কিশোর এক কিশোরীর সঙ্গে ‘হ্যান্ডশেক’ করেছে বলে গ্রামবাসী তাকে বেধড়ক পিটিয়েছে কোনো মওলানার ফতোয়া ছাড়াই।

• পঙ্গু হয়ে কয়েক বছর শয্যাগত থাকার পর একজনের মৃত্যু হলে সাধারণ মানুষ দাবি করেছে কাফফারা না দিলে তাঁর জানাজা হবে না। কারণ তিনি এত বছর নামাজ পড়েননি।

• কোনো এক কলেজের শিক্ষক ছাত্রীদের বোরখা পড়তে বাধ্য করলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও হাইকোর্টকে এগিয়ে আসতে হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় কঠোর নির্দেশ দিয়েছে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাউকে বোরকা পরতে বাধ্য করা যাবে না। (‘জনকণ্ঠ’, ২৬ আগস্ট ২০১২)

• রংপুরে এক এসআই ১৯ জন মেয়েকে থানায় ধরে নিয়ে আসে বোরকা না পরে পার্কে গিয়েছিল বলে। সেখানেও কোর্টকে এগিয়ে এসে সেই পুলিশকে তলব করে এবং এ ধরনের অপকর্ম নিষিদ্ধ করে। (‘জনকণ্ঠ’, ৩ মার্চ ২০১০)

এরকম অজস্র উদাহরণ প্রমাণ করে সাধারণ মানুষের মধ্যে শরিয়া আইন প্রয়োগ করার উগ্র প্রবণতা ধীরে ধীরে বেড়ে যাচ্ছে। এই একই ধরনের ঘটনা ৪০-৫০ বছর আগে সেই দেশেও ঘটেছিল। এবারে কী পদ্ধতিতে শরিয়াকরণটা হচ্ছে তা দেখা যাক।

• দেশে মাদ্রাসার সংখ্যা কমপক্ষে তিন লাখ। (‘জনকণ্ঠ’, ১৫ মে ২০১৩)।

এগুলোর প্রায় সবাই শরিয়া আইনে বিশ্বাস করে ও ছাত্রদের সেই শিক্ষা দেয়। এগুলো থেকে প্রতি বছর সমাজে আসছে লক্ষ লক্ষ শরিয়া সমর্থক যারা সমাজের প্রতি স্তরে তাদের প্রভাব খাটাতে থাকে। শরিয়াপন্থী মওলানা-মুফতিরা এখন এক নিমেষে বহু হাজার যুদ্ধংদেহী তরুণকে রাস্তায় নামানোর প্রচণ্ড ‘স্ট্রিট পাওয়ারে’র অধিকারী। ৫ এপ্রিল ২০১৩ শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের লক্ষ লোকের সমাবেশ তার প্রমাণ। এ বাহিনী আগামীতে অনেক বাড়বে এবং সর্বত্র এর চাপ অনুভূত হবে। এ চাপ ঠেকানোর পদ্ধতি এখনও বাংলাদেশে অনুপস্থিত। এটা সে দেশেও ঘটেছিল, সেখানেও এ চাপ ঠেকানোর পদ্ধতি অনুপস্থিত ছিল।

• অসংখ্য মওলানা-মুফতি নিয়ে দেশজুড়ে শরিয়া সমর্থক আলেম সমাজ গড়ে উঠেছে। জনগণের ওপর এদের প্রভাব প্রচণ্ড। এদের অনেকেই অত্যন্ত উগ্র ও আপত্তিকর ভাষায় হুংকার দিয়ে বক্তৃতা করেন, কারো কাছে এদের জবাবদিহিতা নেই।

• তাদের অসংখ্য কর্মতৎপর ও ধনী সংগঠন জাতির চোখের সামনে শুধুমাত্র তাদেরই ইসলামি ব্যাখ্যা ধরে রেখেছে। তার বিপক্ষে সুফি ইসলামি বা ইসলামের অরাজনৈতিক ধর্মতত্ত্বের বইগুলো লেখা ও প্রচারের সংগঠন নেই বললেই চলে।

• তাদের আছে দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান মসজিদ, জনতাকে প্রভাবিত করার সুযোগ যা তারা পুরোটাই নিয়েছেন এবং ভবিষ্যতেও নেবেন।

• তাদের আছে দলীয় পত্রিকা এবং সেগুলোতে ক্রমাগত হচ্ছে শরিয়া প্রচার। পক্ষান্তরে তাদের ইসলামি ব্যাখ্যার ভিত্তিহীনতা, কোরান বিরোধীতা, ইসলাম বিরোধীতা ও নারী বিরোধীতা তুলে ধরার তেমন কোনো পত্রিকা নেই। তাদের বিরুদ্ধে কোনো ইসলামি দলিল ছাপতে বেশিরভাগ সেক্যুলার পত্রিকা ভয় পায়।

• এটাও শরিয়াপন্থীদের আরেকটা বিরাট সাফল্য। তারা জনগণ, সরকার, মিডিয়া, টিভি-রেডিও-সংবাদপত্র প্রকাশনাসহ সারা জাতিকে ভয় পাওয়াতে সক্ষম হয়েছেন। এটা আরও বাড়বে বৈ কমবে না।

• তাদের আছে দুনিয়াজুড়ে ‘ফেইথ-কাজিন’ সংগঠগুলোর সঙ্গে শক্তিশালী আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক। পক্ষান্তরে আমাদের বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজ ভোগে অহংরোগ, গর্ব, একগুঁয়েমি ও সাংগঠনিক ব্যর্থতায়। টাকার জোর বা আন্তর্জাতিক সমন্বয়ও তাদের নেই।

• ২০০৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে জামায়াত ঘোষণা দিয়েছে: দেশজুড়ে মহাশরিয়া কোর্টের জটাজাল বানানো হবে। গ্রাম থাকবে উপজেলার নিয়ন্ত্রণে, উপজেলা থাকবে জেলার নিয়ন্ত্রণে, এভাবে হাজার হাজার শরিয়া কোর্টের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ থাকবে বায়তুল মোকাররমের খতিবের হাতে। জামায়াত যদি সত্যিই তা করতে পারে তবে জাতি শরিয়া কোর্টের জটাজালে মাছের মতো আটকে যাবে। তারা ‘আইন’, ‘কোর্ট’ এসব শব্দ এড়িয়ে এমন নাম দেবে যে এটাকে আইন দিয়ে ধরা যাবে না।

• ইসলামি টিভি চ্যানেলগুলো তো আছেই, অন্যান্য প্রায় প্রতিটি টিভি চ্যানেলে ইসলামি প্রোগ্রাম চলে। প্রায় প্রতিটি সংবাদপত্রে ইসলামি অংশ থাকে যার প্রত্যেকটিই শরিয়াপন্থী। জনগণের ওপর এসবের প্রভাব সুস্পষ্ট।

• আওয়ামী লীগ সরকারি ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করবে। (‘ইনকিলাব’, ২০ আগস্ট ২০১১) প্রস্তাবটা সম্ভবত সংসদে পাসও হয়ে গেছে। বাংলাদেশে কয়েকটা বেসরকারি ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় আছে, সেগুলোতে নির্ভেজাল মওদুদিবাদ পড়ানো হয়। সরকারি ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ও তাদের হাতেই যাবে।

• দাবি এসেছে ন্যাশনাল ফতোয়া বোর্ড গঠনের।

• বায়তুল মোকাররমের খতিবকে প্রধান বিচারপতির মর্যাদা দিতে হবে– এ দাবি বহু আগে থেকেই ছিল।

এরকম আরও ঘটনা ঘটছে। সমস্যা হল সে দেশের মতো এখানেও আমাদের শরিয়াপন্থী মওলানারা সাংঘাতিক নারীবিরোধী। তাদের ওয়াজ, বক্তৃতা ও নিবন্ধে তার যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। তাদের নারীবিরোধী অবস্থান এতই স্পষ্ট যে, প্রগতিশীল শক্তি বিশেষ করে নারীশক্তির সঙ্গে তার সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠেছে। এটা জাতির জন্য অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ও বিপজ্জনক। উদ্ধৃতি দিচ্ছি শরিয়াপন্থী মওলানা ও তাদের দৈনিক থেকে (দৈনিকটির নাম উহ্য রাখা হল):

• ইসলামে নারীদের পুরুষের অধীন করা হয়েছে – ১২ নভেম্বর ২০০৫।
• রাজনীতিতে নারীর ৩৩% আসন শরিয়তবিরোধী – ২৬ মে ২০০৭।
• গায়িকা ও নারী-আবৃত্তিকার নিষিদ্ধ – ০৫ জুলাই ২০০৮।
• নারীদের নোংরা ভাষায় গালাগালি – ২৩ জুলাই ২০০৮, ৩ ডিসেম্বর ২০০৫, ১১ ও ২২ জুলাই ২০০৫, ২৮ আগস্ট ২০০৫, ১৬ ডিসেম্বর ২০০৫, ২৬ ডিসেম্বর ২০০৫, ৩ সেপ্টেম্বর ২০০৫, ৩০ ডিসেম্বর ২০০৫, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০০৭।
• নারী নীতিমালার বিপক্ষে খোলাখুলি অবস্থান – ১৯ মে ২০০৬, ১৪ মার্চ ২০০৮।
• নারীরা শুধুমাত্র নারী-সংক্রান্ত বিষয়ে আইনবিদ হতে পারবেন, তাও অভিভাবকের সম্মতিক্রমে – ৮ মার্চ ২০১০।
• নারীকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ করা হোক, গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে খেলাফত আন্দোলন দলের প্রস্তাব – ১৩ জুলাই ২০০৮।
• নারীরা তেঁতুলের মতো, দেখলে পুরুষের জিহ্বায় পানি আসে -(ওয়াজ)।
• নারীদের পঞ্চম শ্রেণির বেশি পড়ানো উচিত নয় (ওয়াজ)।
• কর্মজীবী নারীরা বেশ্যা (ওয়াজ)।
• “আমাদের বড়জনও নারী, মেজোজনও নারী, সেজোজনও নারী, তাই আমরা একটা ‘মাথা খারাপ’ জাতি” (ওয়াজ)।

সেদেশের নাম পাকিস্তান, দুনিয়ার অন্যতম ব্যর্থ রাষ্ট্র। সেখানে অমুসলিমের সংখ্যা কমতে কমতে প্রায় শূন্যে এসে ঠেকেছে, সেখানে অহরহ শিয়া-সুন্নি-আহমদির হানাহানি রক্তপাত, সেখানে ক্রমাগত আত্মঘাতী হামলায় বাস-ট্রেন-বাজারে শত শত সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে মসজিদের নামাজীরা পর্যন্ত মরে পড়ে থাকে, সেখানে হত্যাকারীর নামে রাস্তা ও পার্ক বানানো হয়, ধর্ষণের চারজন মুসলিম সাক্ষী না হলে ধর্ষকের শাস্তি হয়নি বহু বছর।

এটা ওদের হুদুদ আইন নং ৭, ১৯৭৯, আইন ৮ এর খ, ১৯৮০ দ্বারা সংশোধিত। শরিয়া সমর্থকদের প্রচণ্ড বিরোধীতার জন্য এ আইন বহু বছর বাতিল করা যায়নি, সম্প্রতি বাতিল হয়েছে। সেখানে তিন হাজারের বেশি ধর্ষিতা ১০-১২ বছর জেল খেটেছেন, কারণ তাঁরা ধর্ষণের চারজন সাক্ষী আনতে পারেননি। এটা ওদেশে হয়েছে, হতে পারে এখানেও। ইসলামি নেতৃত্বকে রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী করে ও তার সঙ্গে আপস করার কী মারাত্মক ফল হয়েছে, তা থেকে আমাদের রাজনীতিবিদদের শিক্ষা নেওয়া উচিত।

ঘটনা যেভাবে ঘটছে তাতে একদিন গণতান্ত্রিক ভোটেই বাংলাদেশ ‘শরিয়া রাষ্ট্র’ হয়ে যেতে পারে যেমন মিসরে ঘটেছে। আমাদের কিছুটা দেরি হয়েছে, কিন্তু পথ এখনও আছে, উপায় এখনও আছে। তা হল, জাতিকে শরিয়া সম্পর্কে শিক্ষিত করে তোলা। জাতিকে জানানো যে হানাফি ও শাফি আইনের কিতাবে প্রত্যেকটিতে যে ছয় হাজারের বেশি আইন আছে তার বেশিরভাগই ভালো, কিন্তু কিছু আইন লঙ্ঘন করে কোরান, রাসুল (সা.) ও মানবাধিকার। সেগুলো যুগোপযোগী করতেই হবে। সব মিলিয়ে শরিয়া আইনের সিংহভাগ মানুষের তৈরি।

• আরও উচিত দুনিয়ার অন্যতম বৃহৎ ইসলামি সংগঠন নাহদলাতুল উলামার ‘ইসলামি রাষ্ট্রের বিভ্রম’ (‘The Illusion of An Islamic State’) বইটার বাংলা অনুবাদ করে জাতির কাছে পৌঁছে দেওয়া। ২০০৩ সালে এ সংগঠনের সদস্য ছিল মোটামুটি চার কোটি। এর প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট হাজি আবদুর রহমান ওয়াহিদ ছিলেন পৃথিবীর বৃহত্তম মুসলিমপ্রধান দেশ ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট।

• আরও দরকার ড. বাসাম তিবি, ড. আবদুল্লাহ আন নাঈমের মতো শরিয়াবিরোধী ইসলামি বিশেষজ্ঞদের বইগুলো অনুবাদ করে জাতির কাছে পৌঁছে দেওয়া।

• আরও উচিত জাতিকে জানানো কেন ড. হাশিম কামালির মতো শরিয়া বিশেষজ্ঞেরা (তাঁর অসাধারণ গবেষণার বই ‘প্রিন্সিপলস অব ইসলামিক জুরিসপ্রুডেন্স’) ব্যাকুল হয়ে মুসলিম বিশ্বকে শরিয়া আইনের প্রয়োগ সম্পর্কে হুঁশিয়ার করেছেন।

• দেশেও কিছু কাজ হয়েছে। বই আছে ‘শারিয়া কী বলে, আমরা কী করি’, ডকুমুভি বানানো হয়েছে ‘নারী’, ‘শরিয়া প্রহেলিকা’ ও ‘হিল্লা’; এখন আমাদের দায়িত্ব এগুলো ছড়িয়ে দেওয়া।

এসবের ভিত্তিতেই বেশকিছু মুসলিমপ্রধান দেশের ইমামরা শরিয়াভিত্তিক ইসলামি ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেছেন। ইতিহাস ব্যাকুল হয়ে বারবার হুঁশিয়ারি দিচ্ছে আমাদের, কিন্তু আমরা বিপুল অহংকারে সে হুঁশিয়ারি উপেক্ষা করে যাচ্ছি, করেই যাচ্ছি। আমরা বালুর মধ্যে মাথা গুঁজে নিজেদের সান্ত্বনা দিচ্ছি এই বলে যে ঝড়টা আসছে না। কিন্তু–

প্রকৃতির কিছু বিধান রয়েছে বাকি,
অন্ধ সে বিধি কাউকে ছাড় দেবে না,
কেউই পারেনি সেইখানে দিতে ফাঁকি,
সুদে ও আসলে গুনতে হয়েছে দেনা!

সর্বশেষ সংবাদ