বাংলা ফন্ট

এনিম্যাল ফার্ম স্পিন-অফ

04-05-2017
মাসকাওয়াথ আহসান

 এনিম্যাল ফার্ম স্পিন-অফ


পেঙ্গুইন মহোদয় লক্ষ্য করেন, তার জনসভায় পেঙ্গুইনের সংখ্যা ক্রমেই কমে আসছে; বাড়ছে কাক ও ফার্মের মুরগির সংখ্যা। কাজের বিনিময়ে খাদ্য কিংবা হাওরের দুর্গতদের ত্রাণ হাপিস করে দিচ্ছে হতচ্ছাড়া কাকগুলো। আর বড় বড় প্রকল্পের কমিশন খাচ্ছে ফার্মের মুরগিগুলো।

উনি গভীর দুঃখের সঙ্গে বলেন, আমি চাই যা খাওয়ার দেশি মুরগিরাই খাক।

আরেক পেঙ্গুইন বলে, আসলে দেশী মুরগিরাই খেয়েছিলো কাবিখা থেকে বড় প্রকল্পের কমিশনের দানাগুলো। দেশী মুরগির সন্তানদের ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ানোর পর তারা ফাস্ট ফুড খেয়ে ফার্মের মুরগি হয়ে যায়। দেশী মুরগিরা এনালগ যুগের মুরগি বলে ডিজিটাল পদ্ধতিতে টাকা বিদেশে পাচার করায় ধরা পড়ে গিয়েছিলো। সেইখানে তাদের সন্তান ফার্মের মুরগিরা অনেক ডিজিটাল; তারা জানে বিদেশে টাকা পাচারের ক্ষেত্রে এনালগ পদ্ধতিই শ্রেয়।

পেঙ্গুইন মহোদয় দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে বলেন, কাউয়া আর ফার্মের মুরগিগুলো কেন বোঝেনা; এইভাবে চুরিদারি করলে বিপদে পড়বে; ক্ষমতায় না থাকলে টাকা-পয়সা নিয়ে পালিয়ে বেড়াতে হবে।

আরেক পেঙ্গুইন উত্তর দেয়, টাকা-পাচার তো হয়েই গেছে; ক্যানাডা-এমেরিকা-বৃটেন-মালয়েশিয়া-অস্ট্রেলিয়ায় এদের সেকেন্ড হোম তৈরি হয়ে আছে। এরা এখন সপরিবারে ‘ফেয়ার এন্ড লাভলি’ মাখছে যাতে সেকেন্ড হোমে গিয়ে বর্ণবাদের শিকার না হতে হয়। আর ক্ষমতায় না থাকলে সমস্যা হবে আপনার স্যার। আপনাকে আবার চায়ে ভিজিয়ে বিসকিট খেতে খেতে এইসব চুরিদারির জবাব দিতে হবে।

সেইসব চা-বিস্কিট খাওয়ার দিনগুলোর কথা মনে হলেই পেঙ্গুইন মহোদয়ের মনে আতংক তৈরি হয়। উনি বিরক্তি প্রকাশ করেন, এইসব বাজে কথা মনে করাও কেন! তুমি কী মনে করো এইসব কাউয়া আর ফার্মের মুরগির কোনো বিচার হবে না!

–কিছু কিছু বোকা কাউয়া ধরা পড়বে। তবে কষ্ট পাবে পেঙ্গুইনগুলো। বেশির ভাগ কাউয়াই গিয়ে ক্ষমতার ডালে বসবে। সিল মাছ কিংবা সজারু যেই ক্ষমতায় আসুক; তাদের জন্য ফুল-উপহার নিয়ে হাজির হয়ে যাবে। ঝাঁকের কাউয়া ঝাঁকে মিশে যাবে। আর ফার্মের মুরগিগুলো সেকেন্ড হোমে পালিয়ে গিয়ে ইংলিশ-ভিংলিশ বলবে। এরা বুদ্ধি করে ‘বেয়াই প্রকল্পের অধীনে’ পুনর্বাসনের সব ব্যবস্থাদি করে রেখেছে। ঠিকই ফিরে এসে আবার ঝাঁপির ফার্মের মুরগি ঝাঁপিতে ঢুকে যাবে।

পেঙ্গুইন মহোদয় জিজ্ঞেস করেন, দলে যে কিছু ইন্দুর ছিলো; যাদের দিয়ে অনেক জরুরি কাজ করানো যেতো; তারা আজ কোথায়!

–তারা গিয়ে সিল মাছেদের দলে ঢুকেছে। সুযোগের অপেক্ষায় আছে; আমাদের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করবে আমাদেরই শেখানো কৌশল।

–লোকজনরে দেশপ্রেম শেখানোর জন্য যে কিছু শিয়াল পোষা হয়েছিলো; তারা আজ কোথায়!

–শিয়ালগুলি অতিরিক্ত গালাগালি কইরা দেশপ্রেম শিখাইতে গিয়া জনপ্রিয়তা হারাইছে; কেউ তাগো দুই চক্ষে দেখতে পারেনা। সেই সুযোগে জোনাকি পোকাগুলি ঢুইকা পড়ছে লোকজনরে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ শেখাইতে। অনেক ছাগলের সমর্থন পাইছে এই জোনাকি পোকাগুলো।

–ছাগল তো সব আমাদের পক্ষে শুনলাম। তাদের জন্য তো আর আমরা কম করলাম না!

–ছাগল কখন কার ক্ষেতে মুখ দিবে এইটার তো কোনো গ্যারান্টি নাই।

পেঙ্গুইন মহোদয় দেখেন কয়েকটা বানর মুখ শুকনো করে বসে আছে। জিজ্ঞেস করে, তোমরা হাসিখুশি মানুষ; এমন হতাশ কেন!

একজন বানর অত্যন্ত পরিশীলিত ভাষায় বলে, আমরা মাটি সঞ্জাত সংস্কৃতির বিশুদ্ধ চর্চা করেছি; অথচ আজ আমাদের ভাগে কোনো পিঠাই পড়ে না; পিঠা খাচ্ছে ছাগলেরা। ছাগলদের জন্য আইডি কার্ড, এম্বুলেন্স সবই হচ্ছে; অথচ বানরদের জন্য সামান্য কটা পদ-পদবী-পুরস্কার। আমরা দুর্দিনের সৈনিক; কিন্তু দল ক্ষমতায় থাকলে আমাদের কোনো মূল্যায়নই হয়না।

–আসলে বানরের প্রজনন ক্ষমতা কম; ছাগলের প্রজনন ক্ষমতা অসীম। তাই ভোটের জন্য ছাগল-তোষণ করতে হয়। আপনারা অধৈর্য্য হবেন না; নিশ্চয়ই সুদিন আসবে আপনাদের।

এমন সময় একটি কাকের দল ঠোঁটে করে টাকা নিয়ে উড়ে যেতে থাকে।

পেঙ্গুইন মহোদয় হাঁক দেন, এই তোমরা দল বেঁধে কোথায় যাচ্ছো হতভাগার দল!

কয়েকটা কাক সমস্বরে বলে, বাহুবলি ফিল্ম রিলিজ পেয়েছে; ওটা দেখতে যাচ্ছি।

পেঙ্গুইন মহোদয় রাগে দাঁতে দাঁত চেপে বলেন, কাউয়াগুলির রস বাড়ছে; এদের কোনো দেশপ্রেম নাইরে।

এক কাক একটু নীচে উড়ে এসে বলে, নির্বাচনে অসংখ্য ব্যালটপেপার ঠোঁটে করে নিয়ে গিয়ে ব্যালটবক্সে ঢুকিয়ে দেবো; আমাদের দেশপ্রেম করা শেখাবেন না স্যার। মনে রাখবেন, দেশের কাজে অনেক শক্তিক্ষয় হয়। তাই দেশপ্রেমিকদের দারিদ্র্যে থাকতে নেই। বিলাসিতাই দেশপ্রেমিকদের সৌভাগ্যের প্রসূতি।

লেখক: ব্লগার ও প্রবাসী সাংবাদিক

সর্বশেষ সংবাদ