বাংলা ফন্ট

মে দিবস, শ্রেণিচেতনার হাতিয়ারে সুসজ্জিত হবার দিন

30-04-2017
অভিনু কিবরিয়া ইসলাম

মে দিবস, শ্রেণিচেতনার হাতিয়ারে সুসজ্জিত হবার দিন

‘কমরেড শ্রমিকেরা! মে দিবস আসছে, যে দিবসে সকল দেশের শ্রমিকেরা তাদের শ্রেণি-সচেতন জীবনের জাগরণকে, মানুষ কর্তৃক মানুষের উপর সকল নিপীড়ণ-নির্যাতনের বিরুদ্ধে শ্রমিক সংহতিকে, কোটি কোটি মেহনতি মানুষকে ক্ষুধা, দারিদ্র্য এবং অপমান থেকে মুক্ত করার নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামকে উদযাপন করে। এই মহান সংগ্রামে দুইটি দুনিয়া পরস্পরের মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ায়; একটি হলো পুঁজির দুনিয়া এবং অপরটি শ্রমের দুনিয়া, একটি শোষণ ও দাসত্বের দুনিয়া এবং অপরটি ভ্রাতৃত্ব ও স্বাধীনতার দুনিয়া।...একপক্ষে আছে মুষ্টিমেয় ধনী রক্তখেকোর দল। তারা সব কলকারখানা, যন্ত্রপাতি দখল করে রেখেছে, আর লক্ষ লক্ষ একর জমি ও টাকার পাহাড়কে নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত করেছে। তারা সরকার ও সেনাবাহিনীকে নিজেদের চাকর ও সম্পত্তির বিশ্বস্ত পাহারাদারে পরিণত করেছে। ...অপরপক্ষে আছে কোটি কোটি উত্তরাধিকারবঞ্চিতদের দল। তারা ধনীদের হয়ে কাজ করার জন্য অনুমতি ভিক্ষা করতে বাধ্য হয়। তাদের শ্রমে তারা সকল সম্পদ তৈরি করে; অথচ তাদের সারাটা জীবন একটুখানি খাবারের জন্য সংগ্রাম করতে হয়, পিঠভাঙা মেহনতে তাদের স্বাস্থ্য ও শক্তিকে নিঃশেষিত করতে হয় এবং গ্রামের জীর্ণ কুটিরে অথবা শহরের অন্ধকার কুঠুরিতে উপবাসে থাকতে হয়।’
১৯০৪ সালের মে দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত একটি লিফলেটের খসড়ায় কমরেড লেনিন উপরোক্ত কথাগুলো লিখেছিলেন। শতবছর পরেও সেই কথাগুলোর তাৎপর্য ফুরিয়ে যায় নি। বরং এই পুঁজিবাদ নানা রকম মুখোশে আমাদের সামনে এসে হাজির হলেও শোষণ বৈষম্য নিপীড়ণের মাত্রা না কমে বরং আনুপাতিক হারে বেড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, মে দিবসের আবেদন ফুরোয় নি, বরং বহুলাংশে বেড়েছে মে দিবসের গুরুত্ব। মে দিবস উদযাপনে বিশ্বব্যাপী শ্রমিকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণকে থামাতে না পেরে শাসকশ্রেণি মে দিবসকে অনুষ্ঠানসর্বস্ব করে তোলার চেষ্টা করছে। পুঁজিপতিরাও এইদিন মেকি শ্রেণি-সম্প্রীতির স্লোগান তুলে মে দিবসের রক্তাক্ত ইতিহাস ও শোষণের ধারাবাহিকতাকে আড়াল করতে চায়। রাষ্ট্রীয়ভাবে আমাদের দেশে মে দিবস পালিত হয়, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী বাণী দেন, মালিকদের তরফ থেকেও কর্মসূচি পালিত হয়, আর এই ডামাডোলে শ্রমিকের ন্যায্য দাবিগুলো ক্ষীণস্বরে উচ্চারিত হলেও হারিয়ে যেতে থাকে।
১৮৮৬ সালের শিকাগোর হে শহরে মে মাসে শ্রমিকদের স্বতঃস্ফূর্ত ধর্মঘটে গুলি চালিয়ে হত্যা ও পরবর্তীকালে শ্রমিক নেতাদের ফাঁসিতে ঝোলানোর ইতিহাস আমরা জানি। শিকাগোর সেই আন্দোলনকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। পুঁজিবাদের নির্মম শোষণ এবং তার অর্থনৈতিক কাঠামোর অবশ্যম্ভাবী ফল হিসেবে চক্রাকারে ফিরে ফিরে আসা অর্থনৈতিক মন্দার বিরুদ্ধে শ্রমিকেরা সেসময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংগঠিত প্রতিবাদ করছিলো। ইউরোপসহ পাশ্চাত্য তখন সত্যি সত্যি ‘কমিউনিজমের ভুত’ দেখছিলো। মার্কস সেসময়ই শ্রমিকদের এই সংগঠিত শক্তিকে নতুন সমাজ গড়ার মূল শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। শুধু তাই নয়, তিনি পুঁজিবাদী মজুরি ব্যবস্থার অন্তঃসারশূণ্যতাকে অর্থশাস্ত্রীয় ও দার্শনিক দিক থেকে উন্মোচিত করেছেন, শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে ন্যায়ভিত্তিক ও শোষণহীন সমাজব্যবস্থা সৃষ্টির সম্ভাবনাকে বাস্তবে মূর্ত করে তোলার রসদ জুগিয়েছেন। শ্রেণিচেতনার হাতিয়ারে সুসজ্জিত শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের ঐক্যের মাধ্যমে ‘আত্মাহীন সমাজ’ ও ‘হৃদয়হীন দুনিয়া’র বাস্তবতাকে বদলে ফেলার সংগ্রামকে প্রাণ দিয়েছেন। মার্কসের সৃষ্ট সে ঢেউ লেগেছিলো পাশ্চাত্যের শ্রমিকশ্রেণির গায়ে। মার্কসের মৃত্যুর তিন বছর পর শিকাগোর হে মার্কেটের ঘটনাটি ঘটে, আর ছয় বছর পর ১৮৮৯ সালে মার্কসের বন্ধু এঙ্গেলস সমাজতন্ত্রের সংগ্রামকে বেগবান করতে ডাক দেন দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের। সেই দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকেই জার্মান কমিউনিস্ট নেত্রী ক্লারা জেটকিনের মে দিবস সংক্রান্ত প্রস্তাব গৃহীত হয়, সিদ্ধান্ত হয় এই তাৎপর্যপূর্ণ দিবসটি ১৮৯০ সাল থেকে ১লা মে প্রতিবছর একযোগে সারাবিশ্বে পালিত হবে।

‘মে দিবস’-এর তাৎপর্য শুধুমাত্র ‘আটঘন্টা কর্মদিবস’ বা ‘ন্যায্য মজুরি’র দাবি আদায়ের মধ্যে সীমিত নয়, বরং ‘মে দিবস’ লেনিনের ভাষায় ‘মেহনতি মানুষকে ক্ষুধা, দারিদ্র এবং অপমান থেকে মুক্ত করার নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম’কে সংগঠিত করতে আমাদের অনুপ্রেরণা যোগায়। সেই নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম প্রকৃতপক্ষে শ্রেণিচেতনায় শাণিত হয়ে মানবিক সমাজ নির্মাণের জন্য সংগ্রাম। সেই সংগ্রাম লেনিনের ভাষায় ‘দুই দুনিয়া’র মুখোমুখি সংগ্রাম।
বর্তমানে অসংখ্য জায়গায় ‘দুই দুনিয়ার সংগ্রাম’-এর ফ্রন্ট বিস্তৃত হয়েছে। উন্নত পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে সৃষ্ট ফিনান্স ক্যাপিটাল আজ তার জাতীয় চরিত্র হারিয়ে ফেলেছে। বহুজাতিক ব্যাংক ও কর্পোরেশনগুলো এখন বিশ্বব্যাপী তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। লগ্নিপুঁজি এখন দুনিয়াব্যাপী সঞ্চারণশীল। বহুজাতিক এই একচেটিয়া কারবারের চাওয়া হলো বিশ্বজুড়ে এক অখণ্ড বাজার প্রতিষ্ঠা, যাতে লগ্নিপুঁজির চলাচল বিন্দুমাত্র ব্যহত না হয়। এই অর্থনৈতিক বাস্তবতাই মূলত বর্তমান বিশ্বে নয়া উদারনীতিবাদী বিশ্বায়নের প্রক্রিয়াকে অগ্রসর করে নিয়ে যাচ্ছে। সেই দর্শনের ‘হেজিমনি’ বা আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় তারা ব্যবহার করছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মিডিয়াকে। এমনকী ধর্মযুদ্ধের ধোঁয়া তুলতেও তারা পিছপা হচ্ছে না। এর পাশাপাশি, নিরংকুশ শোষণের পথ পরিষ্কার করতে গোটাবিশ্বে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ও সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহকে বেসরকারিকরণের প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা হচ্ছে। এর ফলে সমাজের মুষ্টিমেয় অংশের হাতে প্রচুর পরিমাণ সম্পদ জমা হচ্ছে এবং অসহনীয় হারে বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়ে চলছে।  
পুঁজিবাদের এই লাগামহীন দৌরাত্মে ২০০৭-০৮ সালের দিকে আমরা বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা লক্ষ্য করলাম। অথচ বড় বড় ব্যাংক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান, যারা এই মন্দার জন্য দায়ী, তাদেরকেই জনগণের ট্যাক্সের টাকায় ‘বেইল আউট’ দেওয়া হলো। তার সাথে সাথে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থা সংকট থেকে উত্তরণের জন্য এখন তথাকথিত ‘তৃতীয় বিশ্বের’ দেশগুলোর উপর নানা উপায়ে অর্থনৈতিক বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে। এই সংকটের আগে ও পরে, আন্তর্জাতিক একচেটিয়া কারবার এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার অর্থনীতিতে অনুপ্রবেশ করেছে। তারা শ্রমশক্তি, কাঁচামাল, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, কলকারখানার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে ও বাজারের দখল নিয়ে অবাধে লুটপাট ও শ্রমিক শোষণ চালিয়ে যাচ্ছে। এই ক্রমবর্ধমান শোষণের ফলাফল হিসেবে আমরা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে দেখছি বর্বর আইএমএফ কর্মসূচি, ঋণের কঠিন শর্ত, জমির দখল এবং দারিদ্র্য ও বৈষম্যের বৃদ্ধি। বাংলাদেশের গার্মেন্টস শ্রমিকেরা এই আন্তর্জাতিক লগ্নি পুঁজির শোষণের চরমতম ভুক্তভোগী। তাদের মজুরি বিশ্বে সর্বনিম্ন তো বটেই, এছাড়াও তারা এমন কর্মপরিবেশে কাজ করে যেখানে মৃত্যু প্রতিনিয়ত তাদের তাড়া করে ফেরে। গত দশ বছরে আড়াই হাজারেরও বেশি শ্রমিক বাংলাদেশে তাদের কর্মস্থলে মৃত্যুবরণ করেছে, শুধুমাত্র রানা প্লাজাতেই মারা গেছে দেড় হাজার শ্রমিক। শুধু গার্মেন্টস শ্রমিকেরা নয়, এদেশের কৃষি, সেবাখাত, পরিবহন, গৃহস্থালী ইত্যাদি ক্ষেত্রে নিয়োজিত শ্রমিকেরা শোষিত হচ্ছে, পুঁজিপতিদের মুনাফার জন্য খাটছে দৈনিক আট ঘন্টার অনেক বেশি সময়।

আমরা লক্ষ্য করছি বাংলাদেশের মত ‘তৃতীয় বিশ্বে’র দেশগুলোর সীমিত সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় পুঁজিবাদী ‘গ্যাংস্টার’ রাষ্ট্রগুলো তাদের বহুজাতিক কোম্পানিকে পাঠাচ্ছে, এবং ভয়ভীতি অথবা লোভ দেখিয়ে সেসকল দেশের সরকারকে হাত করে জাতীয় স্বার্থের বিপরীতে চুক্তি করছে। শুধুমাত্র অপ্রকাশ্য হুমকি বা কূটকৌশলের মাধ্যমেই নয়, তারা সামরিক জোট ন্যাটোর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে ‘ওয়ার অন টেরর’-এর নামে সরাসরি দখলদারিত্ব কায়েম করছে। আফগানিস্তান, ইরাকের যুদ্ধ, লিবিয়া, সিরিয়া ও ইয়েমেনে সামরিক হস্তক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য হলো সেখানকার প্রাকৃতিক সম্পদের দখল নেওয়া ও আজ্ঞাবহ সরকারকে ক্ষমতায় বসানো। মিশর ও উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আফগানিস্তান ও ইরাক পর্যন্ত, সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ দুর্নীতিবাজ ও আজ্ঞাবহ নেতৃত্বের মাধ্যমে তেলসম্পদ ও তার তেল পরিবহনের পাইপলাইনের উপর নিরংকুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।  
এই ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায়, আমরা দেখছি বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ধরনের মৌলবাদী, উগ্র জাতীয়তাবাদী, ফ্যাসিবাদী প্রবণতা বিকাশ লাভ করছে। বর্তমান সময়ে আমরা প্রত্যক্ষ করছি পশ্চিম এশিয়ায় আইসিসসহ অন্যান্য ইসলাম ধর্মীয় উগ্রবাদী শক্তি, নাইজেরিয়ায় বোকো হারাম, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, সোমালিয়া ও উত্তর আফ্রিকায় বিভিন্ন মৌলবাদী চরমপন্থি দল, ভারতে হিন্দুত্ববাদী মৌলবাদী গোষ্ঠী, শ্রীলংকা ও মায়ানমারে বৌদ্ধ উগ্র জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী, ইউরোপে নব্য নাৎসি দক্ষিণপন্থী দলগুলো, আমেরিকায় ট্রাম্পের মত ডানপন্থিদের উত্থান।
বর্তমানে ‘ইসলাম’-এর নামে ফ্যাসিস্ট জঙ্গি তৎপরতার প্রভাব গোটা বিশ্বের মত বাংলাদেশেও এসে পড়ছে। দুনিয়াব্যাপী সমাজতন্ত্রের উত্থান রোধ করার জন্য একসময় সাম্রাজ্যবাদই উসকে দিয়েছিলো এই অন্ধকারের শক্তিকে। বর্তমানেও পুঁজিবাদসৃষ্ট অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট পলিটিক্যাল ইসলাম ও ধর্মীয় পুনর্জাগরণবাদের উত্থানের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে। আমরা দেখছি, চাপানো যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ ভয়ংকর সামাজিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে। সেই দেশগুলোতে বাড়ছে সামাজিক বৈষম্য, নয়া উদারনীতিবাদী অর্থনীতির শিকার হচ্ছে তারা। এর ধারাবাহিকতায় মৌলবাদী জঙ্গিগোষ্ঠীরা সুকৌশলে পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদী শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সৃষ্ট ক্ষোভকে সাম্প্রদায়িক ঘৃণায় পরিণত করছে।
আবার বাংলাদেশের মত দেশগুলোতে উগ্র মৌলবাদীরা উদারনৈতিক লোকজ ইসলামকে কট্টর ‘রাজনৈতিক ইসলাম’-এ রূপান্তরিত করার চেষ্টা করছে। মার্কিন মিত্র সৌদি পেট্রোডলারে স্থাপিত মসজিদ, মাদ্রাসা ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ কাজে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করে আসছে তারা। পুঁজিপতিদের নির্বাচিত-অনির্বাচিত সরকারগুলো ক্ষমতায় টিকে থাকতে ও শ্রমিকশ্রেণির ঐক্যকে বিনষ্ট করে সমাজতন্ত্রীদের আন্দোলন দুর্বল করার স্বার্থে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছে। এর পাশাপাশি মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা, দুর্বৃত্তায়িত অর্থনীতি ও রাজনীতি, সামাজিক বৈষম্যের বৃদ্ধি, যুবকদের বেকারত্ব বৃদ্ধি, সংস্কৃতি ও শিক্ষার সাম্প্রদায়িকীকরণ ইত্যাদি ধর্মীয় মৌলবাদের বিকাশের সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করছে। বর্তমানে, বাংলাদেশ সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপরীতে গিয়ে সাম্প্রদায়িক শক্তির সাথে আপোস করে পাঠ্যপুস্তক সাম্প্রদায়িকীকরণ, ভাস্কর্য অপসারণের মত পদক্ষেপ নিচ্ছে যা উৎসাহিত করছে সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলোকে। সাম্প্রদায়িক শক্তির এই উত্থান শ্রমিকশ্রেণির সংগ্রামকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে ভীষণভাবে।
একথাও সত্যি, যখন শ্রমিকশ্রেণি শোষণ, দারিদ্র্য, একনায়কতন্ত্র ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে জনগণের সংগ্রামে নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হয়, তখন সাম্প্রদায়িক শক্তিসমূহ কিছুটা জনপ্রিয়তাও অর্জন করে। সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীগুলো তখন জনগণের রুটি রুজির মতো ইহজাগতিক সংগ্রামকে ভাবজগতের ফ্রন্টে ঠেলে দেয়। যে ধর্মকে মার্কস বলেছিলেন, ‘নিপীড়িতের দীর্ঘশ্বাস’, ‘আত্মাহীন সমাজের আত্মা’, ‘হৃদয়হীন দুনিয়ার হৃদয়’; সেই ধর্মকে ব্যবহার করে নিপীড়িত জনগণকে প্রকৃত সংগ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে সাম্প্রদায়িক শক্তি। এই কারণে লুটপাটকারী শাসকশ্রেণিও নিজস্বার্থে সাম্প্রদায়িক চেতনাকে উৎসাহিত করে শ্রেণিচেতনার বিপরীতে। ‘সেক্যুলার’ দাবিদার হয়েও সাম্প্রদায়িক আক্রমণ শানায় বামপন্থিদের বিরুদ্ধে। শ্রমিকশ্রেণিকে তাই শ্রেণিচেতনায় শাণিত হয়ে সাম্রাজ্যবাদ, দেশীয় লুটেরা শাসকশ্রেণি ও সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে একযোগে সংগ্রাম চালাতে হয়।
শ্রেণিচেতনা গড়তে চায় প্রকৃত গণতান্ত্রিক সমাজ, আর পুঁজিবাদী ভোগবাদী চেতনা টিকিয়ে রাখতে চায় অগণতান্ত্রিক ও বৈষম্যমূলক সমাজব্যবস্থা। শ্রেণিচেতনা ঐক্য গড়ে গোটা দুনিয়ার নিপীড়িত মানুষের ভেতর, আর সাম্প্রদায়িক চেতনা নিপীড়িত মানুষকে বিভক্ত করে। শ্রেণিচেতনা জাতীয়তাবাদের সংকীর্ণ গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়, তা লিঙ্গ-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-জাতিভেদ করে না। এই শ্রেণিচেতনাই প্রকৃত অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও প্রকৃত গণতান্ত্রিক চেতনা, কেননা এই শ্রেণিচেতনা মানুষে মানুষের অর্থনৈতিক বৈষম্যকে চিরতরে কবর দেওয়ার কথা বলে, শ্রেণিভেদ উচ্ছেদ করে সকল মানুষের জন্য মানবিক সমাজ নির্মাণের কথা বলে। ‘মে দিবস’ সেই শ্রেণিচেতনার হাতিয়ারে শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের সুসজ্জিত হবার দিন।


সর্বশেষ সংবাদ