বাংলা ফন্ট

সিটিং চিটিং ফিটিং খেলা নিত্য ভোগান্তির নতুন মাত্রা

27-04-2017
রনি রেজা

সিটিং চিটিং ফিটিং খেলা নিত্য ভোগান্তির নতুন মাত্রা

ভোগান্তি যেন নগরবাসীর কপালের লেখা। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে এমনটি জেনে ও মেনেই চলছে অধিকাংশ মানুষের  নগর বাস। মাঝে মধ্যে এমপি, মন্ত্রী বা ক্ষমতাসীনদের দু একটা বাণী আশার প্রদীপে তেলের সঞ্চার ঘটালেও তা মিলিয়ে যেতে সময় লাগে না। বরং তাদের অনেক সিদ্ধান্তের কারণে ভোগান্তির মাত্রা হয় উর্ধ্বগামি। সম্প্রতি এমনই এক সিদ্ধান্তে নাকাল হচ্ছে রাজধানীর সাধারণ যাত্রীরা। নিত্য ভোগান্তিতে যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা। বলছি সিটিং সার্ভিস নিয়ে শুরু হওয়া চিটিং ও ফিটিং খেলা নিয়ে। সিটিং সার্ভিস নিয়ে গণপরিবহণ শ্রমিকদের চিটিংবাজির সাথে নগরবাসী পরিচিত হলেও ফিটিং শব্দটি এক্ষেত্রে নতুনই বলা যায়। আপোশহীন খ্যাতদের মুখ থেকে যখন ‘চাইলেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভন নয়’ বা ‘পরিবহন মালিকরা অনেক প্রভাবশালী’ শব্দগুলো বের হয়; তখন যে কারও মস্তিস্কেই কিছু প্রশ্ন ঘুরপাক খায়। জন্ম নেয়- পরিবহন মালিকরা কতটা প্রভাবশালী? সরকারের চেয়েও কি বেশি? সরকার চাইলে কেনই বা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না? আর যদি ব্যবস্থা নেওয়া না যায় তাহলে উটকো সিদ্ধান্তে কেনই বা সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তিতে ফেলেছেন?’র মতো অসংখ্য প্রশ্ন। কেউ কেউ আবার অজানেন্তই বলে ফেলেন- ‘ফিটিং হয়ে গেছে’। আমাদের দেশের ক্ষমাতসীনরা কখন সুর নরম করে সেকথা বুঝতে মহাজ্ঞানের প্রয়োজন নেই। ভেতরের রফা-দফা ঠিক থাকলেই সব ফিট।
মূল আলোচনায় ফিরে আসি। রাজধানীবাসীর অসংখ্য দুর্ভোগের মধ্যে গণপরিবহনের দুর্ভোগ উল্লেখযোগ্য। নৈরাজ্য, দুর্ভোগ, বেহাল, হ-য-ব-র-ল, - যত নেতিবাচক শব্দ আছে; সবগুলোই অনায়াসে ব্যবহার করা যায় এই সেক্টরের সাথে। প্রায় সারাবছরই আলোচনায় থাকে গণপরিবহনের দুর্ভোগ। কিন্তু সমাধানের বেলায় যা ছিল তাই।
গত ৪ এপ্রিল হঠাৎই রাজধানীতে সিটিং সার্ভিস বন্ধের ঘোষণা দেয় সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। এরপর ১৪ এপ্রিল শনিবার বিকেলে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে পরিবহন মালিক ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপরে (বিআরটিএ) মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলন করে বিআরটিএ’র চেয়ারম্যান মশিয়ার রহমান সিটিং সার্ভিস বন্ধের বিষয়টি সাংবাদিকদের জানান। যা ১৫ এপ্রিল থেকে কার্যকর করা হয়। সংবাদটি জানার সাথে সাথে স্বস্তির শ্বাস ফেলেন নগর যাত্রীরা।  প্রস্তাবটা মালিকপক্ষ থেকে আসায় খানিকটা অবাকও হন অনেকে। মালিকপক্ষ যুক্তি দেখিয়েছেন, অফিস টাইমে যখন সিটিং সার্ভিস নির্ধারিত আসনের যাত্রী নিয়ে চলে যায়, তখন আরো অনেক যাত্রী দাঁড়িয়ে থাকে। তাদের কথা ভেবেই নাকি বাস মালিকদের এমন প্রস্তাব, যাতে সায় দিয়েছে সরকারও। কী আশ্চর্য, মালিকরা হঠাৎ এমন জনদরদি হয়ে উঠলেন কবে থেকে, কেন? উত্তর পেতে খুব অপেক্ষা করতে হয়নি। সিটিং সার্ভিস বন্ধের ঘোষণা বাস্তবায়ন শুরু হওয়ামাত্রই স্পষ্ট হয়ে ওঠে বাস-কর্তৃপক্ষের কৌশলী রূপ। মালিকদের আসল চাওয়া ছিল- বিশেষ সার্ভিসের জন্য সরকারের কাছ থেকে বিশেষ ভাড়ার তালিকা আদায় করা, তখন সিটিং-স্পেশাল-গেটলক থেকে বাড়তি টাকাটা পাবে মালিকপক্ষ। মালিকপক্ষ তাদের দাবি আদায়ে কৌশলে সরকারকে সঙ্গে নিয়েছে মাত্র।

গত ১৫ রোববার এপ্রিল সিটিং সার্ভিস বাতিল কার্যকর হওয়ার পর থেকেই যাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, নারী যাত্রীদের গাড়িতে না তোলা, ধীর গতিতে গাড়ি চালানো, গাড়ি বন্ধ রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরিসহ নানাভাবে নগরবাসীকে শিক্ষা দিচ্ছেন পরিবহণ কর্তৃপক্ষ। বলা হয়েছিল সিটিং বা গেটলক সার্ভিসের নামে যাত্রীদের কাছ থেকে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি ভাড়া আর আদায় করা যাবে না। কিন্তু দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি বাসে ইচ্ছে মতো যাত্রী ভর্তি করে সিটিং সার্ভিসের ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, সিটিং সার্ভিস নামে চলাচলকারী প্রায় সব বাস-মিনিবাসই লোকাল বাসের মতো যাত্রী তুলছে যত্রতত্র। তবে ভাড়া আদায় করেছে আগের মতোই। এ নিয়ে বাসচালক, কন্ডাক্টর, হেলপারের সঙ্গে যাত্রীদের বচসা, হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে। পরিবহণ শ্রমিকদের হাতে মারধরেরও শিকার হয়েছেন কেউ কেউ। আর বাসে অতিরিক্ত যাত্রী তোলায় সৃষ্ট ভিড়ের কারণে বিড়ম্বনার শিকার হয়েছেন নারী, শিশুসহ অন্যান্য যাত্রী। এমতাবস্থায় দায়িত্বরত পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনির লোকদেরও তেমন ভূমিকা দেখা যায়নি। এমনকি ভ্রাম্যমাণ আদালতের সামনেই শ্রমিকের হাতে যাত্রী পিটুনির খবরও প্রকাশ হয়েছে।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনির নিশ্চুপ ভূমিকা জন্ম দিয়েছে নতুন প্রশ্নের। কোথায় হারালো তাদের পেটোয়া শক্তি? সুন্দরবনের কাছে রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বিরোধিতা করছেন বামদের একটি অংশ। যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রশ্নে, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের প্রশ্নে এরাও শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের পাশেই থাকে, থাকবে। কিন্তু সুন্দরবন বাঁচানোর দাবিতে তারা রাস্তায় নামলেই পুলিশ চড়াও হয়। সেই পুলিশও যাত্রী হেনস্তা দেখেও যখন নিশ্চুপ থাকে তখন অবাক না হয়ে পারি না।

সব মিলিয়ে বিষয়টি উদ্বেগের কারণ সিহেবে পরিণত হয়েছে। প্রত্যাশা রাখি যাত্রীস্বার্থ বিবেচনা করে নগরীর বাস সার্ভিস যাতে যাত্রীবান্ধব হয় সে ব্যাপারে সরকার যথাযথ উদ্যোগ নেবে। সিটিং সার্ভিসের নামে যাত্রী হয়রানি বন্ধ করতে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু সিটিং সার্ভিস বন্ধ করা নয়, ফিটনেস সনদবিহীন সব ধরনের যান চলাচলে কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপ করতে হবে।

পাশাপাশি যেমন ইচ্ছা ভাড়া আদায় বন্ধ করাই শুধু নয়, যেখানে সেখানে যাত্রী ওঠানো-নামানো বন্ধেও পদপে নিতে হবে। দেখা গেছে রাজধানীতে যানজটের জন্য অনেকাংশে দায়ী ব্যস্ত সড়কে বাস থামিয়ে যাত্রী তোলা ও নামানো। এ ব্যাপারে ট্রাফিক পুলিশকে আরো তৎপর হতে হবে।  আমরা চাই পরিবহন খাতের নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা বন্ধ এবং যাত্রীসাধারণের যাতায়াত নির্বিঘ্ন হোক। মুক্তি পাক নগর যাত্রীরা।


ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম/এইচএমএল

সর্বশেষ সংবাদ