বাংলা ফন্ট

আধুনিক পুঁজিবাদ ও মালিকানা সমস্যা

25-04-2017
জিএম ফাহিম

আধুনিক পুঁজিবাদ ও মালিকানা সমস্যা


পুঁজিবাদ আর সাম্যবাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্যগুলোর একটা হচ্ছে মালিকানা। যেখানে সাম্যবাদে ব্যাক্তি মালিকানা বলতে কিছু নেই, সেখানে পুঁজিবাদ  দাঁড়িয়েই আছে ব্যাক্তি মালিকানার উপর। কিন্তু আদৌ কত ভাগ মালিকানা আছে আপনার নিজের ব্যবহার্য পণ্যের উপর? সময়ের সাথে সাথে পুঁজিবাদই কি আরও মন্দের দিকে যাচ্ছে? ব্যাক্তিজীবনে সেটার সাথে আমাদের সম্পর্কটাই বা কি?

একটা সময় পুঁজিবাদ  ছিল আদর্শভাবে যেভাবে এটাকে সংজ্ঞায়িত করা হয় ঠিক তেমন। সুবিধার ব্যাক্তি মালিকানার পরিবর্তনে মুনাফা ও আয়ের মাধ্যমে সম্পদ বৃদ্ধি করার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। টাকার বিনিয়মে স্থানীয় বাজার থেকে চাল কেনা, কাঠমিস্ত্রি দিয়ে ফার্নিচার বানাতে দেয়া ইত্যাদি আদর্শগতভাবে সেই পুঁজিবাদি ব্যবস্থার রুট-লেভেল উদাহরন হতে পারে। এখানে মালিকানার সম্পূর্ণভাবে আপনার হয়ে যায়। আপনি সেই ফার্নিচার ব্যবহার করবেন নাকি নদীতে ভাসায় দিবেন সেটা একান্তই আপনার ইচ্ছা। আর এটা এক হিসেবে ভাল। যখন কোন পরিবর্তন প্রয়োজন হয় তখন চাইলেই নিজের মত করে পরিবর্তন করা যায়। কোন কাঠমিস্ত্রির এখানে কোন আপত্তি থাকবে না কেনার পর আপনি সেটা কি করবেন। কিন্তু এখন মালিকানার গঠন একেবারেই বদলে গিয়েছে। আর সেটা নিয়েই যত সমস্যা।

বর্তমান সময়ে আমাদের অধিকাংশ জিনিসেরই ইলেক্ট্রনিক বিকল্প এসেছে। আগে মানুষ ঘড়ি কিনে অ্যালার্ম সেট করে ঘুমাতো। এখন মোবাইলেই সেই কাজ করা যায় একাধিকবার করা যায়। এভাবে সংবাদপত্র, ক্যাসেট প্লেয়ার, বইপত্র, নোটখাতা-ডায়েরি, চিঠিপত্র এমনকি মুদ্রা পর্যন্ত রূপান্তরক হিসেবে ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমকে খুজে পেয়েছে; নির্ভরযোগ্য, স্বাচ্ছন্দ্যময় ও সহজে পরিচালনা করার পন্থা হিসেবে। কিন্তু মালিকানা আর আপনার হাতে নেই। যে অডিও প্লেয়ার অ্যাপ আছে, কিন্তু সেটার প্রিমিয়াম সেবা ক্রয় করার পরও আপনি সেটাকে পরিবর্তন করতে অক্ষম। আপনি যখনই অ্যাপটা কিনেন তখন টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশনের মাধ্যমে আপনি অ্যাপ ডেভেলপারের সাথে একমত হন যে আপনি শুধু তাদের সেবাই ব্যবহার করবেন, কোন পরিবর্তন করা চুক্তি ভঙ্গ করার সামিল ও শাস্তিযোগ্য অপরাধও বটে। শুধু অ্যাপ না, আপনার কেনা মোবাইল, এমনকি আধুনিক সময়ের রিয়েলস্টেট কোম্পানিগুলোও পুজিবাদের মালিকানার কনসেপ্টটাই বদলে ফেলেছে।

প্রাথমিকভাবে চিন্তা করলে এটাকে বড় সমস্যা মনে হবে না। "মালিকানা নাই তো কি হয়েছে? আমি স্বাচ্ছন্দ্যের সাথেই আগের থেকে বেশি সুবিধা পাচ্ছি"। প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সাথে সুবিধার উন্নতি হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আদৌ কি মালিকানার অভাবে আমাদের সুবিধা বেশি হচ্ছে? চিন্তা করে দেখুন, প্রতিটা মানুষ এক একটা ভিন্ন কেস। একই সেবাতে যে ভিন্নতা আপনি আশা করছেন আপনার বন্ধুর হয়তো সেটা লাগবে না। কিন্তু কোম্পানি দিচ্ছে হাতেগুনা কিছু অপশন। যদি নিজেদের কাস্টমাইজ করার প্রথা চালু থাকতো তাহলে আরেক প্রকারের সংস্কৃতির উদয় হত। সামগ্রিক উদ্ভাবন। সবাই তখন উদ্ভাবনের নেশায় মগ্ন থাকতো, যে সেবা আমরা এখন পাচ্ছি তার থেকে শতাব্দী এগিয়ে যেতাম আমরা, সকল ক্ষেত্রেই। তখন কোম্পানিগুলোর থেকে উদ্ভাবকরাই বেশি সংবাদে জায়গা করে নিত । এমন সংস্কৃতিই হতো বুদ্ধিমান মানবসমাজের আদর্শরূপ। কিন্তু হচ্ছে ঠিক বিপরীত।

একটা সামান্য উদাহরন দেই, জন ডেরে; একটা যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিজ যন্ত্রপাতি তৈরিকারন ব্র্যান্ড। তারা কৃষকদের কাছে ট্র্যাক্টর বিক্রি করে। এখন সমস্যা হচ্ছে সেটার কোড হচ্ছে প্রপাইটরি, মানে কোম্পানিই শুধুমাত্র সেটার উন্নতিকরন ও পরিবর্তন করতে পারবে। কৃষক নিজে পরিবর্তন করলে সেটা অবৈধ ও দণ্ডনীয় অপরাধ হবে। এখন স্বল্প আয়ের কৃষক উন্নততর ও সাশ্রয়ী অন্য ব্র্যান্ড-এর ট্রান্সপ্লেন্টার লাগাতে পারছে না। কারন ট্র্যাক্টরের কোড পরিবর্তন করা যায় না। ফলে অন্য কোম্পানির ট্রান্সপ্লেন্টার এই ট্র্যাক্টরের Diagnosis Software এর কারণে একেবারেই অকেজো। তাই কৃষকরা বাধ্য হয়ে পুরাতন পদ্ধতির ব্যবহার করছে। যেখানে চায়নার একই সমস্যা সমাধান হচ্ছে কোডকে ওপেনসোর্স করায়। ঝামেলাহীন উন্নততর পদ্ধতির ব্যবহারের মাধ্যমে যে উৎপাদনশীলতা বাড়ছে সেটা দিনশেষে পণ্যের দামেও একটা প্রভাব ফেলছে। ফলে সবাই স্থিতিশীল ও ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেই কিনতে পারছে। এটা থেকে খুবই সহজেই বুঝা যাচ্ছে কোম্পানিগুলো উগ্র প্রতিযোগিতার অজুহাতে পুজিবাদের মালিকানার কনসেপ্টকে পরিবর্তন করে শুধুই যে উদ্ভাবনের স্বাভাবিক গতিকে রুদ্ধ করছেনা; সাথে সাথে আমাদের অন্যায্যতা ও শোষণেরও কারন হচ্ছে; যা ক্রমশ আরও বিস্তৃতি লাভ করেছে।

পৃথিবীর ১% ধনীরা এখন পৃথিবীর ৯৯% সম্পদের মালিক, লাল বিপ্লবের যুগেরও এত খারাপ অবস্থা ছিল না। আমি এমন ৫টা কোম্পানির নাম বলতে পারবো যেগুলো বন্ধ হয়ে গেলে অধিকাংশ মানুষই বিশাল ব্যাক্তিগত জিনিস হারিয়ে ফেলবে। সহজেই বোঝা যায় এইসব বড় কোম্পানি যাদের উচিতই না আমাদের ব্যাক্তিগত জিনিসের মালিকানা রাখার, তারা আমাদের স্বাচ্ছন্দ্যের সুযোগ নিয়ে কতটা গভীরভাবে আমাদের সবকিছুতে জায়গা করে নিচ্ছে। আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যাচ্ছে আর উল্টো আমরা তাদের উপর চরমভাবে নির্ভরশীলও হচ্ছি। এখন অধিকাংশ দেশগুলোই সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদের ভাল দিকগুলো গ্রহণ করে রাষ্ট্রগঠন করার চেষ্টা করছে ঠিকই, কিন্তু পুঁজিবাদী শোষণশক্তির বিষ কোন অংশে কমছে না, বরং বাড়ছে।


সর্বশেষ সংবাদ