বাংলা ফন্ট

সনাতন ধর্মে বর্ণপ্রথার যৌক্তিকতা কতটুকু?

16-04-2017
সুদেব চক্রবর্তী

সনাতন ধর্মে বর্ণপ্রথার যৌক্তিকতা কতটুকু?


সনাতন ধর্মে চারটি বর্ণ রয়েছে। এগুলো হল ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শুদ্র। বলা হয়ে থাকে ব্রাহ্মণ সর্বশ্রেষ্ঠ, তারপর ক্রমিক অনুযায়ি অন্য বর্ণের লোকেরা সমাজে স্থান পাবে। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে শুরুতেই আলোকপাত করা দরকার বর্ণপ্রথা সৃষ্টির প্রেক্ষাপট নিয়ে। প্রাচীনকালে বিশেষত আর্যদের সময়ে সমাজে শৃঙ্খলা আনয়নের উদ্দেশ্যে কর্মের ভিত্তিতে শ্রেণীবিভাগ করা হয়েছিল। যেমন- যারা ব্রহ্ম জ্ঞান অর্জন করতে পারবে, পূজায় পৌরহিত্য করবে, শিক্ষা-দীক্ষা সংশ্লিষ্ট কাজে নিয়োজিত থাকবে তারা ব্রাহ্মণ হিসেবে মর্যাদা পাবে। যারা রাজ্য পরিচালনা, দেশরক্ষা তথা সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকবে তারা ক্ষত্রিয় বলে সম্মান পাবে। যারা ব্যবসা-বাণিজ্য করে দেশের উন্নতিতে ভূমিকা রাখবে এই বণিক শ্রেণীকে বৈশ্য বলে আখ্যায়িত করা হবে। এবং যারা কৃষিকাজে নিয়োজিত থাকবে তাদের বলা হবে শুদ্র। এখানে কোন কর্মই ছোট নয়। প্রতিটি কর্মই সামাজিক প্রয়োজনে পরিচালিত। তাহলে কর্মকারী কেন বৈষম্যের শিকার?
আবার আরও একটা বিষয় স্পষ্ট, সেটা হল এই শ্রেণীবিভাগ প্রত্যেকের কর্ম অনুসারে নির্ধারিত- জন্ম অনুসারে নয়। যে কেউ তার গুণাবলী ও কর্ম দক্ষতার কারণে যেকোনো শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। কিন্তু ব্রাহ্মণের সন্তান যে ব্রাহ্মণই হবে এমনটা ভাবার অবকাশ নেই।
স্বাভাবিকভাবেই আমরা এখনও সমাজে দেখতে পাই অনেক ব্রাহ্মণের ব্রহ্ম জ্ঞান দূরে থাক মৌলিক জ্ঞানটুকুও  নেই, পক্ষান্তরে একজন বৈশ্য বা শুদ্রের পর্যাপ্ত জ্ঞান রয়েছে। যেমন- একজন ডাক্তারের সন্তানকে ডাক্তার বলা হয় না যদি সেও ডাক্তার না হয়। ডাক্তারের সন্তান যদি শিক্ষকতা করে তবে তাকে শিক্ষক বলা হয়। ব্যাপারটা ঠিক এরকম। কিন্তু সমাজ বিবর্তনের পর পরই আমরা কী দেখতে পেলাম? ব্রাহ্মণরা সমাজের উচ্চ আসনে থাকায় ঘোষণা দিলেন তারা বর্ণশ্রেষ্ঠ এবং তারা সৃষ্টিকর্তার মুখ থেকে সৃষ্ট, পক্ষান্তরে অন্যরা সৃষ্টিকর্তার পা থেকে সৃষ্টি হয়েছে। এটা তাদের শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা। কিন্তু এরকম বৈষম্যমূলক ব্যাখ্যা কতটুকু যৌক্তিক ? আসল কথা হল ব্রাহ্মণরা তৎকালীন সময়ে বৈষম্য টিকিয়ে রেখে সামাজিক স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে মনগড়া ব্যাখ্যা আরোপ করেছিলেন।
এ পরিপ্রেক্ষিতে উইলিয়াম জোনস বা ম্যাক্সমুলারদের গবেষণা থেকে পাওয়া যায়, ভারতবর্ষের ব্রাহ্মণরা বা উচ্চ বর্ণের হিন্দুরা নিজেদেরকে আর্য এবং ইউরোপীয়দের অংশ মনে করতেন। অথচ আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে আসলে যেটা তারা ছিল না। ফলে তাদের ভেতরে এক ধরনের অহংকার বিরাজ করতে থাকে। তবে ভারতের প্রথম আইনমন্ত্রী ড. বি আর আম্বেদকর প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন ভারতবর্ষ থেকে বর্ণপ্রথা বিলোপ করতে। কারণ আম্বেদকর ছিলেন মাহার বর্ণের, যাদেরকে বলা হত অস্পৃশ্য। ফলে শ্রেণিকক্ষে তিনি কখনোই উচ্চ বর্ণের ছাত্রদের পাশে বসতে পারতেন না। এমনকি তিনি ¯কুলের জলের পাত্র থেকে নিজে হাতে জল ভরেও খেতে পারতেন না। কর্মজীবনেও দেখা গেল অফিসের অধঃস্তন পর্যন্ত তার হাতে ফাইল দিতো না, দূর থেকে ছুড়ে দিতো। পরিচয় গোপন করে তিনি পার্সি হোটেলে কাজ নিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি যে অস্পৃশ্য তা জানাজানি হলে হোটেল থেকে বের করে দেয়া হয়। ফলে আম্বেদকর বর্ণপ্রথা বিলোপ করতে কলম হাতে নেন। কিন্তু মহাত্মা গান্ধীরা তা সমর্থন করেননি। কারণ গান্ধী মনে করতেন বর্ণপ্রথা হল ভারতীয় সমাজের জিনিয়াস। তাছাড়া তিনি চাননি হিন্দুরা জন্মভিত্তিক পেশা ত্যাগ করুক। কিন্তু প্রশ্ন হল- পেশাগত কারণে কেন বৈষম্য হবে এবং কেন জাতের কারণে মানুষ মেধা বা জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও উচ্চ মর্যাদা পাবে না? অবশ্য পরে আমরা দেখতে পাই গান্ধী অস্পৃশ্যতা দূর করতে উদ্যোগী হয়েছেন। তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘হরিজন সেবক সংঘ’। কিন্তু উচ্চ বর্ণের হিন্দুদের বিরোধিতায় গান্ধী দমে যান।  গান্ধী তো জাতীয়তাবাদী নেতা ছিলেন, কিন্তু তৎকালীন ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির কী ভূমিকা ছিল? প্রকৃতপক্ষে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি যেভাবে শ্রেণি বৈষম্যকে গুরুত্ব দিয়েছিল ঠিক সেভাবে বর্ণ বৈষম্যকে গুরুত্ব দেয়নি। অথচ আম্বেদকরের মতে ভারতীয় শ্রমিক শ্রেণির দুটি শত্রু হল- পুঁজিবাদ এবং ব্রাহ্মণ্যবাদ। ফলে আমরা দেখতে পাই সমাজতন্ত্রের আদলে আম্বেদকর স্বয়ং রাজনৈতিক দল গঠন করেন, নির্বাচনে জয়ীও হন। কিন্তু ব্রিটিশ-জার্মান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে প্রাদেশিক অ্যাসেম্বলি বিলুপ্ত হলে আম্বেদকরের পাটিও থমকে যায়।
এটা বোঝা উচিত যে, পৃথিবীতে কোনো ধর্মগ্রন্থই সৃষ্টিকর্তা আকাশ থেকে ধপ করে মানুষের হাতে ফেলে দেন নি। বরং সেগুলো মানুষই লিখেছে। প্রতিটি ধর্মীয় মতবাদ তৈরি হবার পরই সেই মতবাদের কতগুলো নিয়ম-বিধি তৈরি করা হয়েছে যা ঐ মতবাদের লোকেরা অনুসরণ করে থাকে। নিশ্চয়ই এই বিধি-বিধান শেষ পর্যন্ত মানুষই লিখেছে। কিন্তু এগুলো ঈশ্বর কর্তৃক লিপিবদ্ধের কথা বলে বৈষম্য চালানো হয়েছে সব ধর্মেই। যেমন- কথিত উচ্চ শ্রেণী কখনও কথিত নিম্ন শ্রেণীর হাতে জলটুকুও খাবে না, কথিত উচ্চ শ্রেণীর কেউ কথিত নিম্ন শ্রেণীতে বিবাহ করতে পারবে না। তার বিপরীত হলে নরকে যেতে হবে। অবশ্য এ দায় ব্রাহ্মণদের একার নয়। তৎকালীন সময়ে রাজ্য পরিচালনায় থাকা ক্ষত্রিয়রা ব্রাহ্মণদের মদদ দিয়েছে। কারণ শাসকরা চিরকাল চেয়েছে শোষণ করতে। আর এই শোষণ প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে আশ্রয় নিয়েছে ধর্মের। বলা চলে সামাজিক শোষণ প্রক্রিয়া সমানতালে চালিয়েছে ব্রাহ্মণ আর ক্ষত্রিয়রা যেখানে ধর্ম হয়ে উঠেছে অন্যতম হাতিয়ার। ফলে দেখা গেছে বহু হিন্দুরা ধর্মান্তরিত হয়েছে। কখনও বৌদ্ধ ধর্মে, কখনও ইসলাম কিংবা খ্রিস্টান ধর্মে। ড. আম্বেদকরও অসংখ্য দলিতদেরকে নিয়ে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন।

একসময় উপনয়ন গ্রহণের অধিকার সবারই ছিল। মানে উপনয়ন গ্রহণের মাধ্যমে সবাই বিদ্যারম্ভ  প্রক্রিয়া শুরু করত যা শেষ হত সমাবর্তনের মাধ্যমে। কর্মজীবনে প্রবেশ করার পর কর্ম অনুসারে বিবেচনা করা হত কে ব্রাহ্মন আর কে ক্ষত্রিয় বা বৈশ্য। কিন্তু এই সত্যটি একসময় হারিয়ে গেল। এখন কেবল ব্রাহ্মণ সন্তান ভিন্ন আর কেউ উপনয়ন গ্রহণ করে না। এবং উপনয়ন গ্রহণ করলেই তাকে ব্রাহ্মণ বলে আখ্যায়িত করা হয়। অথচ তার ব্রহ্ম জ্ঞান কতটুকু তা বিবেচনা করা হয় না।
আধুনিক যুগে এসেও এই বর্ণবৈষম্য কতটা লোপ পেয়েছে?  এ প্রসঙ্গে গবেষক জিম করবেটের কথা বলতে পারি। ভারতে তিনি একটা স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, কিন্তু দেখা গেল ব্রাহ্মণরা তাদের সন্তানদেরকে একই ঘরে পড়তে দিলেন না। কারণ সেখানে নিম্ন বর্ণের ছেলে-মেয়েরাও ছিল। জিম করবেট তখন বাধ্য হয়েই ঘরের চালা খুলে ফেলেন, কারণ খোলা আকাশের নিচে জাত যাবার ব্যাপার নেই! এবার এই বঙ্গের একটা ঘটনা বলি- এক বাড়িতে শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে ব্রাহ্মণরা খেতে বসেছেন। তাদের মাথার উপরে কাপড় টানিয়ে রাখা যেটাকে সামিয়ানা বলা হয়। সেই সামিয়ানার নিচ দিয়ে এক অ-ব্রাহ্মণ হেঁটে যাওয়ায় আহাররত ব্রাহ্মণরা উঠে গেলেন। ঘটনাটা খুব বেশি অতীতের নয়। আবার জটিলতা বাড়ছে বিবাহ নিয়েও। অনেক প্রেম সামাজিক  বৈষম্যের যাতাকলে পিষে মরে যেতে দেখেছি। চলমান বাস্তবতায় অনেক স্ববিরোধিতাও লক্ষণীয়। যেমন- কোনো কোনো ব্রাহ্মণ যারা অ-ব্রাহ্মণের হাতে জলটুকুও খান না অথচ তারা আবার বাইরে এসে যেকোনো ব্যক্তির রান্নাকৃত মাংস হোটেলে বসে গিলছেন। ভ-ামি যাকে বলে আর কি! প্রকৃতপক্ষে বর্ণপ্রথার আরোপিত বিধানগুলো সমাজে কেবল হিংসা ছড়িয়েছে, বৈষম্য সৃষ্টি করেছে, মানুষে মানুষে বিভেদ তৈরি করেছে। সব মানুষই সমান। সবার উপরে মানুষ সত্য। মানুষের পদমর্যাদা তার কর্ম অনুসারে বিবেচনা করা উচিত, জন্ম অনুসারে নয়। কিন্তু সনাতন ধর্মে প্রচলিত বর্ণপ্রথা এ বিষয়টি এখনও প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রধান অন্তরায়। যদিও বাংলাদেশে ‘হিন্দু ধর্ম সংস্কার সোসাইটি’ নামে একটি সংগঠন কাজ করছে এসব নিয়ে, কিন্তু তাদের কার্যক্রম এখনও সাড়া জাগাতে পারেনি।
তবে আশার কথা হল এই সিস্টেম টিকবে না। কারণ পরিবর্তনই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। যদিও ধর্মীয় কোন বিধান সংস্কারের কথা মুখে আনলে বা সমালোচনা করলে চাপাতির আশংকা থাকে তথাপি সনাতন মতবাদে এই আশংকা কম। কারণ তার ব্যাখ্যাটা স্বয়ং কবি নজরুল দিয়ে গেছেন। একারণেই অতীতে অনেক সংস্কার সম্ভবও হয়েছে। একসময় মনে করা হত সতীদাহ প্রথা না মানলে নরকে যেতে হবে। কিন্তু সতিদাহ প্রথা বিলুপ্ত করার পর আজকে সবচেয়ে গোঁড়া হিন্দুও স্বীকার করে সতিদাহ প্রথা একটা আরোপিত নির্মম প্রথা ছিল। তেমনি বর্ণবৈষম্য যে সিস্টেমটাকে আজ মনে করা হচ্ছে স্বর্গে যাবার সোপান সেটাই আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পর নির্মম সিস্টেম বলে বিবেচিত হবে। কিন্তু কথা হচ্ছে- যেটা আমরা পঞ্চাশ বছর পরে বুঝবো সেটা আজকে বুঝবো না কেন? আমরা শিক্ষিত হচ্ছি, সচেতন হচ্ছি। তাহলে কেন এটা বুঝতে চাইছি না যে সব মানুষই সমান। কর্মের ভিত্তিতে কেবল সবাই বিভিন্ন শ্রেণীর এবং তাতেও তার কোনো দোষ নেই। কারণ কৃষক, শ্রমিক, চিকিৎসক, শিক্ষক, রাজনীতিবিদ প্রত্যেকেই সমাজের কল্যাণে নিবেদিত। যতদিন এই বৈষম্য আমরা লালন করব ততদিন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি আসবে না।

সর্বশেষ সংবাদ