বাংলা ফন্ট

বৈশাখ, বাঙালী ও রবীন্দ্রনাথ

13-04-2017
উত্তম কুমার রায়

 বৈশাখ, বাঙালী ও রবীন্দ্রনাথ

ধাবমান এর সৌজন্যে: জীবনস্মৃতি’তে রবীন্দ্রনাথ ছেলেবেলার কথায় লিখেছেন, “তখন শিক্ষিত লোকে দেশের ভাষা এবং ভাব উভয়কেই দূরে ঠেকাইয়া রাখিয়াছিলেন। আমাদের বাড়িতে দাদারা চিরকাল মাতৃভাষার চর্চা করিয়া আসিয়াছেন। আমার পিতাকে তাঁহার কোনও আত্মীয় ইংরাজীতে পত্র লিখিয়াছিলেন। সেই পত্র লেখকের নিকট তখনই ফিরিয়া আসিয়াছিল।”
অকারণে ইংরেজিতে পত্র লেখার রীতি বাঙালী অনেক কাল বর্জন করেছে এবং খামাকা ইংরেজি বকুনী ঝাড়ার অভ্যাস- কোন আনন্দে কে জানে বাঙালীদের ভেতর দিন দিন বেড়েই চলেছে। ‘বাঙলা গদ্য জিজ্ঞাসা’ নামক গ্রন্থের সংকলনে ‘হরফ-বদল’ শীর্ষক প্রবন্ধে শিবপ্রসাদ সমাদ্দার বলেছেন- “রিসেন্টলি যে ফ্লাড হয়ে গেল তাতে ড্যামেজ হয়েছে প্রচুর। রিপেয়ার ও মেইন্টেনেন্স এর ব্যাপারে সবচেয়ে বড় সমস্যা এই যে ডুয়াল শাসন চলছে...” ইত্যাদি, ইত্যাদি!
এ ছিল সরকারি কাজ সংক্রান্ত কথা-বার্তা, যেখানে মনে হয় ইংরেজিকে সরিয়ে আনা প্রায় অসাধ্য। অভ্যাস যাবে কোথায়, সে অভ্যাসের পেছনে রয়েছে শিক্ষা-দীক্ষা, মানসিক পরিম-ল, চিন্তা-ভাবনা ও কাজকর্মেরও একট বিশেষধারা। কিন্তু আমরা সবাই তো শিক্ষায়-দীক্ষায়, সামাজিক ও পারিবারিক পরিম-লে, মানসিক অভ্যাসে সে রকমভাবে গড়ে উঠিনি, তাহলে আমাদের মুখের বাংলা, আমাদের নিত্য ব্যবহারের বাংলা এমনভাবে ইংরেজির আক্রমণের সামনে পিছু হঠে যাচ্ছে কেন? পিছু যে হঠছে, আমাদের চারদিকে তাকালে, চারপাশের কথা-বার্তা একটু কান পেতে শুনলেই বোঝা যায়।
আমি বিশেষ করে আমাদের প্রজন্মের কথা বলছি। বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ, বাঙালী জাতির ভবিষ্যতের মতোই আমাদেরই হাতে। যে দিকেই তাকাই, দেখবেন গলায় টাই বেঁধে ছেলেরা স্কুলে যাচ্ছে, আমাদের বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠের দূরন্ত গরমেও রেহাই নেই। স্কুলের নিয়ম। তাঁর ব্যাগ খুলে দেখুন বই-খাতা সব ইংরেজিতে লেখা। তারই মধ্যে একখানি-দুখানি বাংলা গদ্য-পদ্য ও ব্যাকরণের বই হয়ত সভয়ে আত্মগোপন করে আছে। যে সব স্কুলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য মুখ লুকিয়ে থাকে না, গলায় টাই বাঁধবার দরকার পড়ে না, সেখানে ছেলে-মেয়েকে পাঠানো মানে জীবনযুদ্ধে বাবা-মাদের পরাজয় স্বীকার করা।
বৈশাখ মাস আসলে আমরা অনেকেই নাম নিই রবীন্দ্রনাথের। নীরোধ সি. চৌধুরী বাঙালীকে ভর্ৎসনা করেছিলেন আত্মবিস্মৃত জাতি বলে। আমরা আত্মবিস্মৃত হতে পারি কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে বিস্মৃত হওয়া বাঙালীর পক্ষে অত্যন্ত কঠিন। আর কিছু না হোক যে গান রবীন্দ্রনাথ রেখে গেছেন, বাংলার আকাশে-বাতাসে আজও তা পরিবাপ্ত তার এমন ব্যাপ্তি কবি তাঁর জীবনকালেও দেখে যেতে পেরেছেন কিনা সন্দেহ। বৈশাখ মাসে তিনি অনবরত গীত, ব্যক্ত, অনুরণিত হতে থাকেন পাড়ায়-মহল্লায়। কিন্তু তারপরে? আর কতদিন?
বললাম বটে রবীন্দ্রনাথকে ভুলে যাওয়া কঠিন, যখন বাঙালী সত্যি সত্যিই আত্মবিস্মৃত হবে, তখন? এ রকম এক-আধটি, কিংবা বেশ কয়েকটি পরিবার আমাদের অনেকেরই হয়ত জানা আছে। যাদের সন্তানটি গান বলতে বোঝে তথাকথিত ‘অত্যাধুনিক’ পাশ্চাত্য পপসংগীত, রবীন্দ্রনাথ যাদের কেউ নন, রবীন্দ্রনাথের গান তাদের কণ্ঠে কোনোদিন স্থান পাবে না, তার প্রাণে, কিংবা কানে কোনোদিন সারা জাগাতে পারবে না সাহিত্য বলতে সে বাল্যকালে জানে হ্যারি পটার। কেউ তাকে চিমটি কাটলে সে উঃ বলে না, আউচ বলে, অবাক হলে তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে ওয়াউ।
আসলে সমাজে এই একটি অতিদ্রুত বর্ধমান শ্রেণী প্রাণপণ নিজেদের ও অন্যদের কাছে সাব্যস্ত করবার চেষ্টা করছে যে, তাদের গায়ের রং তত ফর্সা না হলেও দুর্ভাগ্যক্রমে বঙ্গদেশে তাদের জন্ম হলেও, তারা মনে-প্রাণে, শিক্ষায়, সংস্কৃতিতে আমেরিকান, কিংবা ইংরেজি, কিংবা ইঙ্গ-মার্কিন। আমেরিকায় কৌতুক করে অনেকে বলেন, পুণ্যবান আমেরিকান মৃত্যুর পরে প্যারিসে যায়। আমাদের অনেকে মনে করেন তারা আগামী জন্মে হয়ত আমেরিকান হবেন!!
অর্থাৎ সমাজের অন্যান্য স্তর থেকে অধিকাংশ মানুষ চান, আজ না হোক কাল আমাদের ছেলে-মেয়েরা না হোক আমাদের নাতি-নাতনীরা জীবনে এমনভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করুক, যাতে তাদের ছেলে-মেয়েদের মুখে রবীন্দ্র-নজরুল সংগীতের বদলে ঊসরহবস কিংবা ঝঃবভভধহর, অথবা সেই সময়ে যাঁরা উক্ত দুই প্রতিভার স্থান পূর্ণ করবেন তাদের গান শুনা যায়।
এ কথা কেউ বলবেন না যে অনন্তকাল ধরে বাঙালীকে, ‘প্রখর তপন তাপে, আকাশ তৃষায় কাঁপে,’ কিংবা ‘হে ভৈরব, হে রুদ্র বৈশাখ,’ শুনেই শিহরিত হতে হবে। কালের অমোঘ নিয়মে যে নতুন তাকে জায়গা দিয়ে যা পুরোনো তাকে একটু পাশে দাঁড়াতেই হবে কিন্তু আজ এই বৈশাখের দিনে, আসন্ন রবীন্দ্র পক্ষে মন কিছুতেই মানতে চায় না যে কালের নিয়মে বাঙালীকে ঢ়ড়ড়ৎ-সধহ'ং অসবৎরপধহ আখ্যা অর্জন করে চরিতার্থ হতে হবে।
২০০৬ সালে ব্রাসেলসে ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের শিকড় সম্মেলন থেকে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ঔধপয়ঁবং ঈযরৎধপ কিছুক্ষণের জন্য ‘ওয়াক আউট’ করেছিলেন, কারণ ই. ইউ-এর বাণিজ্য সংক্রান্ত ‘লবি’-প্রধান ইংরেজি ভাষায় বক্তৃতা আরম্ভ করেন। তিনি বলেন, ৩৩টি দেশের ৩৯টি সংগঠনের ২ কোটি কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে ইংরেজি ভাষণ দেন, কেননা ইংরেজি আজ ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ভাষা। কিন্তু সে যুক্তিতে ফরাসী রাষ্ট্রপ্রধানকে টলানো যায়নি। তিনি বলেন, ‘আমাকে বলতেই হবে, একজন ফরাসী ই.ইউ-এর কাউন্সিলে নিজের বক্তব্য ইংরেজিতে পেশ করেছেন কেন? আমি গভীরভাবে আহত হয়েছি। নিজের কানে তা শুনার বদলে আমরা সেই কারণেই সভা ত্যাগ করি।
তিনি আরও বলেছেন, ‘এ শুধু জাতীয় স্বার্থের কথা নয়। সংস্কৃতির স্বার্থে বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে কথোপকথনের স্বার্থে তার প্রয়োজন ছিল। ভবিষ্যতে পৃথিবী শুধুমাত্র একটি ভাষার ও সেই করণেই একটি মাত্র সংস্কৃতির ওপর গড়ে উঠতে পারে না।’ এ বৈশাখ মাসে জিজ্ঞাসা করবার সময় এসেছে আমরা কি সেই দিকেই এগিয়ে যেতে চাই?

ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম/এইচএমএল


সর্বশেষ সংবাদ