বাংলা ফন্ট

বৈশাখী মেলার ঐতিহ্য ও অর্থনীতি

13-04-2017
আবু তাহের খান

বৈশাখী মেলার ঐতিহ্য ও অর্থনীতি

ধাবমান এর সৌজন্যে: বৈশাখী মেলা বাঙ্গালী সংস্কৃতির একটি খুবই পুরনো অনুষঙ্গ এবং ইতিমধ্যে তা আমাদের অন্যতম লোকঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। এক সময় দেশের গ্রামাঞ্চলে ৩০ চৈত্র অর্থাৎ চৈত্রসংক্রান্তিতে যে মেলার আয়োজন করা হতো, সেটাই ক্রমান¦য়ে বৈশাখী মেলার রূপ ধারণ করে। পরে রবীন্দ্রনাথের উদ্যোগ ও স্পর্শে তা আরও মনোগ্রাহী ও দৃষ্টিনন্দন হয়ে ওঠে এবং বর্তমানে তা বাঙ্গালীর অন্যতম ও সর্বজনীন জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে।
বৈশাখী মেলার প্রচলন গ্রাম থেকে শুরু হলেও এর আয়োজন এবং এতে অংশগ্রহণের ব্যাপ্তি এখন নাগরিক সমাজের মধ্যেই অধিকতর প্রবল। তাই বলে গ্রামীণ পরিম-ল থেকে তা পুরোপুরি হারিয়ে গেছে, এমনটিও বলা যাবে না। তবে বৈশিষ্ট্যগতভাবে গ্রামীণ বৈশাখী মেলা এখন যতটা না লোকজ উৎসব, তার চেয়ে অনেক বেশি অর্থনৈতিক কর্মকা- দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ব্যবসায়িক উপলক্ষ। অবশ্য ইতিবাচকভাবে দেখলে এটাও বলা যায়, বৈশাখী মেলার সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মকা- যুক্ত হওয়ার ফলে এর জৌলুসই শুধু বাড়েনি, ক্রমশ এর ব্যাপ্তিও সম্প্রসারিত হচ্ছে। ধারণা করা চলে, তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের দৈনন্দিন গেরস্থালির সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত এসব অর্থনৈতিক অনুষঙ্গের কারণেই হয়তো বৈশাখী মেলা দিনে দিনে আরও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে এবং সর্বজননীতার আরও উচ্চতর মাত্রা অর্জনে সক্ষম হবে।
দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে তৃণমূল পর্যায়ের জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণের বিষয়টি স্বাধীনতা-পরবর্তী গত চার দশকে বিভিন্ন পর্যায়ের নানা আলোচনায় বহুবার উঠে এসেছে। কিন্তু এ অংশগ্রহণের বিষয়টিকে কখনোই অর্থপূর্ণভাবে বা ফলপ্রসূ উপায়ে নিশ্চিত করা যায়নি এবং তা না করতে পারার সম্ভবত সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে, এক্ষেত্রে কার্যকর ও ধারাবাহিক কর্মকৌশল নির্ধারণ করতে না পারা। এ ধরনের কর্মকৌশল বা উপায় অনুসন্ধান করতে গিয়ে প্রায়ই আমরা দাতাদের নানা পরামর্শের ওপর নির্ভর করেছি, কিন্তু প্রায় কখনোই নিজেদের অর্থনীতির অন্তর্গত সামর্থ্য ও সম্ভাবনাগুলো খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করিনি। ধার সে চেষ্টা না করা একটি অকর্ষিত ক্ষেত্রই হচ্ছে এ বৈশাখী মেলা, যেটিকে এ পর্যন্ত আমরা মূলত একটি সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ হিসেবেই গ্রহণ করছি, অর্থনৈতিক মানদ- বিচার করে দেশের তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের ব্যাপকভিত্তিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে এর অন্তর্গত সম্ভাবনাগুলোকে বিকশিত করার চেষ্টা করিনি।
দুই
নববর্ষ উদযাপনের অংশ হিসেবে বর্তমানে যে বৈশাখী মেলার আয়োজন হয়ে থাকে, সেখানে উৎসবের আমেজটাই মুখ্য এবং সেটা দোষেরও কিছু নয়। বরং বলা চলে, নববর্ষ উদযাপনই হচ্ছে বাঙ্গালীর সবচেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িক ও সর্বজনীন উৎসব। ফলে এ উৎসবের জৌলুস ও ঔজ্জ্বল্য বস্তুত আমাদের জাতিগত মর্যাদারই প্রতীক। কিন্তু এ উৎসবকে ঘিরে ও একে কাজে লাগিয়ে দেশের অর্থনীতিতেও যে বর্ধিত মাত্রার কার্যকর অবদান যুক্ত করা সম্ভব, রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার গত চার দশকের দলিল-দস্তাবেজে বা উদ্যোগে কোথাও তার উপযুক্ত প্রমাণ নেই।
দেওয়ালি উৎসব দেখার জন্য প্রতি বছরই ইউরোপ-আমেরিকা ও পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চল থেকে হাজার হাজার পর্যটক ভারতে ছুটে আসেন, যেটি তাদের শুধু বৈদেশিক মুদ্রাই এনে দেয় না, অর্থনীতির অন্যান্য ক্ষেত্রে পরোক্ষ উপযোগ সৃষ্টিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে থাকে। বৈশাখী মেলাকে কেন্দ্র করে আমরাও এভাবে পর্যটক আকর্ষণের চেষ্টা করতে পারি, যেটি দেশের জন্য উপার্জন ও খ্যাতি দুই-ই বয়ে আনবে। কিন্তু এক্ষেত্রে আমাদের উদ্যোগ ও দূরদর্শিতা- উভয় ক্ষেত্রেই যে প্রচুর ঘাটতি রয়েছে তার একটি ছোট্ট উদাহরণ দিই। বর্তমানে ২৫ সদস্যের একটি নেপালি প্রতিনিধি দল (যে দলে সেদেশের শ্রেষ্ঠ কারুশিল্পীরা রয়েছেন) বাংলাদেশ সফর করছে। সংশ্লিষ্ট ট্যুর অপারেটর পহেলা বৈশাখে তাদের কর্মসূচিতে রেখেছেন চট্টগ্রাম ভ্রমণ। অথচ কত সহজেই না তাদের রাজধানীর রমনাকেন্দ্রিক বৈশাখী উৎসব এবং রাজধানীর অন্যান্য মেলা ও আয়োজন দেখানো যেত। কিন্তু আমাদের ট্যুর অপারেটর বা প্রতিনিধি দলটির এদেশীয় ভ্রমণ সমন¦য়কারী প্রতিষ্ঠান- কারও চিন্তাতেই কি বিষয়টি আছে?
বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে যে লাখ লাখ হস্ত ও কারুশিল্পী রয়েছেন, যারা বস্তুত তৃণমূল পর্যায়ের মানুষ এবং কোন ধরনের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ ছাড়াই যারা উত্তরাধিকারসূত্রে এসব পেশার সঙ্গে জড়িত, বৈশাখী মেলা তাদের জন্য এক অমিত সম্ভাবনার ক্ষেত্র। বর্তমানে এই কারুশিল্পীরা নিজেদের চেষ্টা ও উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন বৈশাখী মেলায় অংশ নিলেও সেখানে তারা অনেকটাই প্রান্তিক পর্যায়ের অংশগ্রহণকারী। জানা মতে, একমাত্র ঢাকায় বিসিক আয়োজিত বৈশাখী মেলাতেই দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কারুশিল্পীদের আমন্ত্রণ জানিয়ে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেয়া হয়। কিন্তু এ সুযোগ দেশের সর্বত্র বিস্তৃত করা প্রয়োজন এবং এসব মেলায় এ কারুশিল্পীদেরই করে তোলা প্রয়োজন মূলধারার অংশগ্রহণকারী। সেক্ষেত্রে বৈশাখী উৎসবকে তারা অনুসরণ করবেন না, বরং বৈশাখী উৎসবই তাদের অনুগামী হয়ে উঠবে।
তিন
বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী হস্ত ও কারুশিল্পকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে বৈশাখী মেলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি উপযুক্ত পরিচর্যায় আন্তর্জাতিক বাজারেও এসব কারুশিল্প উল্লেখযোগ্য স্থান করে নিতে পারে। বাংলাদেশ থেকে এখন বছরে প্রায় ৮০ লাখ মার্কিন ডলার মূল্যের হস্তশিল্প সামগ্রী বিদেশে রফতানি হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে, এর চেয়ে আরও অনেক বেশি পরিমাণ হস্তশিল্প পণ্য বিদেশে রফতানির সুযোগ বাংলাদেশের রয়েছে, যা আমরা কাজে লাগাতে পারছি না। দেশের সর্বত্র আরও বেশি সংখ্যায় বৈশাখী মেলা আয়োজন সে সুযোগকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে সহায়ক হতে পারে। দেশের
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো এক্ষেত্রে
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তাদের এ ধরনের আয়োজনের মধ্য দিয়ে উৎসব ও অর্থনীতি- একই সঙ্গে দুটিই সমান পৃষ্ঠপোষকতা পেতে পারে।
বৈশাখী মেলা এক সময় মূলত গ্রামীণ সংস্কৃতির অংশ হিসেবে ঐতিহ্যবাহী লোকজ উৎসব হিসেবে যাত্রা করলেও এখন তা শহরেই অধিক জৌলুস ও ঔজ্জ্বল্য নিয়ে উদযাপিত হচ্ছে। নাগরিক চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যের কারণে শহরে বৈশাখী মেলার সে জৌলুস ও ঔজ্জ্বল্য হয়তো ক্রমশ আরও বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি এটাও খেয়াল রাখতে হবে, এটি যেন শিকড় বিচ্ছিন্ন হয়ে না পড়ে। অর্থাৎ গ্রামীণ বৈশাখী মেলাগুলো যেন আবার স্বরূপে ফিরে আসতে পারে, সে ব্যাপারে আমাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে উদ্যোগী হতে হবে। এটি সংস্কৃতির মূলধারাকে রক্ষার জন্য যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন শিকড় বা তৃণমূলের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্যও। তবে এক্ষেত্রে ক্ষমতা বলয়ের কাছাকাছি থাকা নগরকেন্দ্রিক প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের জন্য রাষ্ট্রের দেয়া নানা প্যাকেজ প্রণোদনার মতো বিশাল কিছুর প্রয়োজন নেই। মুক্ত ও নিরুপদ্রব পরিবেশে মেলা আয়োজনের সামান্য একটু সুযোগ করে দিতে পারলেই এটি হয়ে যায়। আর এক্ষেত্রে বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে, বৈশাখী মেলার সঙ্গে যুক্ত অর্থনৈতিক কর্মকা-ই একে যুগ যুগ ধরে টিকিয়ে রাখবে।


ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম/এইচএমএল


সর্বশেষ সংবাদ