বাংলা ফন্ট

নওরোজ ও মঙ্গল শোভাযাত্রা: ইউনেস্কোর দুই অমূল্য ঐতিহ্য

13-04-2017
অদিতি ফাল্গুনী গায়েন

 নওরোজ ও মঙ্গল শোভাযাত্রা: ইউনেস্কোর দুই অমূল্য ঐতিহ্য
ধাবমান এর সৌজন্যে: নওরোজ পার্সী বা ইরাণী বর্ষপঞ্জী অনুযায়ী ‘নওরোজ’ হলো ইরাণী নববর্ষের প্রথম দিন। ইরাণ, তুরষ্ক, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান বা আফগানিস্থান সহ পৃথিবীর নানা জায়গায় আরো কিছু নৃ-তাত্ত্বিক-ভাষাভাষী জনগোষ্ঠি নওরোজ পালন করে। গত ৩,০০০ বছর ধরে পশ্চিম এশিয়া, মধ্য এশিয়া, ককেশাস, ব্ল্যাক সি উপত্যকা এবং বলকানে নওরোজ পালিত হয়ে আসছে। পার্সী ক্যালেন্ডারের প্রথম মাস ফারভারদিনের প্রথম দিন হলো নওরোজ। সাধারণত: প্রতিবছর ২১ মার্চ অথবা তার এক দিন আগে বা পরে নওরোজ পালিত হয়ে থাকে।
নওরোজ একটি পার্সী, যৌগিক শব্দ যার ভেতর আছে দু’টো শব্দ: নও এবং রোজ। নও অর্থ নব (প্রাচীণ পার্সী ভাষায় শব্দটিকে নবই উচ্চারণ করা হতো) শব্দটি প্রাচীন ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠির ‘নিউয়োস’ শব্দ থেকে উদ্ভুত। ইংরেজিতে এর সতীর্থ শব্দ হলো নিউ, জার্মানে নিউ (বানান ভিন্ন), ল্যাটিনে নভুস, রুশে নভি এবং সংস্কৃতে নব। রুজ শব্দটি মধ্য পার্সী ভাষায় (মধ্য পার্সী হলো বাংলায় যেমন নদীয়া-শান্তিপুরের ভাষাই প্রমিত ভাষার মান্যতা পেয়েছে বা ইতালীয়তে ফ্লোরেন্সের তুষ্কানী ভাষা- যে ভাষায় দান্তে লিখেছিলেন তাঁর অমর কাব্য, পারস্যেও মধ্য পার্সী ডায়ালেক্ট কালক্রমে প্রমিত ভাষার মান্যতা পায়) দিন বোঝানো হয়ে থাকে। প্রাচীন ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার লিউক এবং প্রাচীন ইরানীয় ভাষার রৌচাহ শব্দদ্বয় থেকে রোজ শব্দটির উদ্ভব। শব্দটির মূল অর্থ ছিল আলো যা আর্মেনীয় ভাষায় লইস, ইংরেজি লাইট, ল্যাটিন লুক্স, প্রাচীন সংস্কৃত রুচি এবং স্লোভেনীয় লুক শব্দে একই অর্থ বহন করে।
যদিও আজ এটা নিশ্চিত করে বলা যায় না যে প্রাচীন ইন্দো-ইউরোপীয়ানরা তাদের ক্যালেন্ডারের প্রথম দিনটি ভোজ অনুষ্ঠানে উদযাপন করতেন কিনা, তবে শরতকাল এবয় বসন্ত দু’টোই প্রাচীন ইরাণীরা শস্য কাটা এবং বীজ বপনের সূত্রে পালন করতেন বলে খোঁজ মেলে ইতিহাসের পাতায়। এভাবেই গড়ে উঠেছিল নববর্ষ পালনের রীতি। মেরি বয়েস এবং ফ্রাঞ্জ গ্রেনেট মনে করেন যে ব্যাবিলনীয় সভ্যতার নানা হৈ চৈ ও আড়ম্বর উদযাপন হয়তো ইরাণীদেরকেও অনুপ্রাণিত করে থাকবে - তাদের নিজেদের বসন্ত অনুষ্ঠানকে নতুন বছরের অনুষ্ঠান হিসেবে পালন করার রেওয়াজ গড়ে তুলতে। আকামেনীয় কালপর্বে নওরোজকে বলা হতো নবসারদা (নতুন বছর- সেসময় মধ্য পার্সী ভাষায় নতুন বছরের নাম ছিল এটিই)।
ইসলাম আগমনের পূর্বে ইরাণে প্রচলিত প্রধান দুই ধর্ম মিত্র ধর্ম এবং জরস্ত্রুসীয় মতবাদেও নওরোজ অনুষ্ঠানের শেকড় লুকিয়ে রয়েছে। মিত্র ধর্মে সব অনুষ্ঠানেরই গভীর সংযোগ ছিল সূর্যের আলোর সাথে। অতীতে কিম্বা বলা চলে মিত্র এবং অগ্নি উপাসকদের ধর্মই যখন প্রবল বা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল, তখন মেহরগান (শারদানুষ্ঠান), তিরগান এবং শীতের শুরুতে উদযাপিত শেল ই জেমেস্তান- এই প্রতিটি পার্বণেরই শেকড় ছিল সূর্য দেবতার প্রতি অর্ঘ্য নিবেদনের সূত্রে। পারসিক ধর্মে সাতটি প্রধান অনুষ্ঠানের ভেতর ছিল ছয়টি গাহামবর এবং সবচেয়ে বড় ও পবিত্র অনুষ্ঠান নওরোজ। ষষ্ঠ গাহামবার বা দিনের শেষে মানে কিনা ইরানী ক্যালেন্ডারে শীতের শেষ ছয় দিনের অন্তিমে বসন্তের প্রথম দিনই নওরোজ হিসেবে পালিত হত। নওরোজ দিয়ে যে মাসের শুরু তাকে অতীতে হামাসপথমেদায়া এবং পরে ফ্রাওয়ার্দিনেগান এবং বর্তমানে ফারভারদিগান বা ইরাণী ক্যালেন্ডারের প্রথম মাস বলা হয়। আবেস্তায় এই অনুষ্ঠান বা পার্বণগুলোর বিবরণ রয়েছে। দশম শতকের পন্ডিত বিরুনী তাঁর কিতাব-আল-তাহফিম লি আওয়াইল সিনাত আল-তানজিম গ্রন্থে পৃথিবীর নানা জাতির ক্যালেন্ডারের বিবরণ দিয়েছেন। সেখানে ইরাণী ক্যালেন্ডারের পাশাপাশি গ্রিক, ইহুদি, আরব, স্যাবিয়ান সহ আরো নানা জাতির ক্যালেন্ডারের কথাই তাঁর সে গ্রন্থে বলা হয়েছে। নওরোজ, সাদেহ, তিরগান, মেহগান এবং শীতের শেষ ছয় দিন বা ছয় গাহামবার, ফারভারদিগান বা ইরাণী বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস, বাহমানজা এবং এসফান্দ আরমাজ সহ আরো বেশ কিছু পার্বণের কথা বলা হয়। প্রাচীন যুগের পার্সীরা বিশ্বাস করতো যে নওরোজের দিন গোটা মহাবিশ্ব ঘোরা মুরু করে। নওরোজ এবং মেহরগানকে বিশেষত: পার্সী ধর্মে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হতো।
ইরাণের সুবিখ্যাত পার্সেপোলিস প্রতœতাত্ত্বিক নগরে এবং আপাদনা প্রাসাদের পাশে একশো স্তম্ভ বিশিষ্ট যে হল ঘর পাওয়া যায়, তা’ নওরোজের ভোজ উদযাপনের জন্যই নির্মিত হয়েছিল। প্রাচীণ আকামেনিদ শিলালিপিগুলোয় নওরোজের কথা হুবহু খোদিত না থাকলেও পার্সেপোলিস শহরে নওরোজ উদযাপনের কথা উল্লেখ করেছেন ঐতিহাসিক শেনোফোন। আকামেনিদ সা¤্রাজ্যের এই কালপর্বে (৫৫০-৩৩০ অব্দ) এই পার্বণের ধারাবাহিকতার জানা যায় যখন সা¤্রাজ্যের অধীনস্থ বিভিন্ন রাজ্যের নৃপতিগণ ইরাণের শাহেনশাহ বা রাজাধিরাজের জন্য নিয়ে আসত নানা উপহার। নওরোজের গুরুত্ব তখন এতটাই ছিল যে ব্যাবিলনের রাজা ক্যাম্বিস দ্বিতীয়ের নিয়োগ কেবলমাত্র নওরোজ উদযাপনে অংশগ্রহণের পরই পোক্ত হয়। ৫৩৯ অব্দে ইহুদিরা ইরাণী শাসনের আওতায় এলে উভয় জাতি পরষ্পরের রীতি-নীতির সাথে পরিচিত হয়। তবে ইহুদিদের ছিল চান্দ্রেয় বর্ষপঞ্জি আর পার্সীদের ছিল সৌর বর্ষপঞ্জি। নওরোজ এবং আর্সাসিদ রাজবংশদ্বয় ইরাণকে শাসন করেছে ২৪৮-২২৪ খ্রিষ্টাব্দ অবধি- আর্মেনিয়া এবং ইবেরিয়াতেও তারা শাসন করেছে এবং সেসব স্থাণেও নওরোজের প্রচলন ছিল।
৬৫০ খ্রিষ্টাব্দে ইরাণে মুসলিম বিজয়ের পরও নওরোজ উদযাপন কিন্ত বন্ধ হয় নি। মধ্য শীতে সাদেহ পার্বণ উদযাপনের পরই নওরোজের ঢ়ৎবঢ়ধৎধঃরড়হং শুরু হতো। তবে কালক্রমে গাহামবের বা মেহরগানের মত নানা পার্বণের উদযাপন কালক্রমে ক্ষীণ হয়ে আসে। আজ শুধু অগ্নি উপাসকরাই সেই সব পার্বণ পালণ করে। আব্বাসীয় যুগেও নওরোজকে প্রধান রাজকীয় পার্বণ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়- মানে পারস্যভূমিতে। বিখ্যাত কবি ওমর খৈয়ামকে উতসর্গ করা নওরোজনামা বা ‘নববর্ষের গ্রন্থ’ বইটিতে নওরোজ পালনের জ্বলজ্বলে ছবি এভাবে আঁকা হয়: কায় খসরুর সময় থেকে ইয়াজদিগার্দের সময় অবধি ইরাণের প্রাক-ইসলামী যুগের শেষ রাজার কাল পর্যন্ত, নওরোজের দিন রাজাকে প্রথম দেখতে আসতেন পার্সী ধর্মে এক উচ্চপর্যায়ের মোবাদ বা পুরোহিত। তিনি রাজার জন্য এক পানপাত্র পূর্ণ মদ, একটি আংটি, কিছু স্বর্ণমুদ্রা, বসন্তে ফলা একমুঠো গম, একটি তরবারী এবং একটি ধনুক নিয়ে আসতেন। অত:পর রাজার জন্য শ্রায়োসা বা বার্তাবাহক দেবদূতের কাছে প্রার্থনা করতেন যেন রাজা ধনে-মানে-যশে অপ্রতিদ্বন্দী হয়ে ওঠেন। রাজাকে জামশেদ বা পানপাত্র থেকে অমরত্ব পান করার আহ্বান জানাতেন।

খিলাফতের অবসানের পর পুনরায় সামানিদ বা ব্যুয়িদের মত ইরাণী রাজবংশের পুনরভ্যুদয়ের পর নওরোজ পালন আরো গুরুত্ব পায়। ব্যুয়িদরা খিলাফত যুগে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা প্রাচীন পার্সী আরো কিছু অনুষ্ঠানের উদযাপন ফিরিয়ে আনে। ব্যুয়িদ স¤্রাট আজোদ-উদ-দৌলার সময়ে (৯৪৯-৮৩ খ্রিষ্টাব্দ) রাজা প্রাসাদের বড় হল ঘরে নওরোজ পালন করতেন। সোনা ও রূপার থালায় ভৃত্যরা রেখে যেত নানারকম ফল এবং নানা রঙের ফুল। রাজা মসনদে বসার পর রাজজ্যোতিষী এসে ভূমিতে চুম্বন করে রাজাকে দিতেন নতুন বছরের বার্তা। পরবর্তী সময়ে তুর্কি বা মঙ্গোলরা এসেও নওরোজ পালনে কোন বাধা দেবার সাহস করেনি। নওরোজ আজো ইরাণের বৃহত্তম অনুষ্ঠান। ঈদ-উল-ফিতর বা ঈদ-উল-আজহা নয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের আগ অবধি শুধু ইরাণেই নওরোজ পালিত হতো। বর্তমানে ককেশাস এবং মধ্য এশীয় দেশগুলোতেও নওরোজ জাতীয় ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়। ২০১০ সালে ইউনেস্কো নওরোজকে ‘মানব সভ্যতার অমূল্য ভাবসম্পদ ও ঐতিহ্য’ হিসেবে ঘোষণা করে।
আজকের ইরাণেও নওরোজ আসার কয়েকদিন আগে থেকেই খানে তেকানি বা ঘর পরিষ্কার করার কাজ শুরু হয়। সবাই নতুন জামা-কাপড় কেনে। তবে নববর্ষের উদযাপনের মূল আয়োজন হলো ন্যূণতম সামর্থ্য সম্পন্ন প্রতিটি ইরাণী পরিবারে ‘হপ্ত সীন’ বা ‘সপ্ত বস্ত’ সাজানোর একটি প্রথা। অতীত যুগে মহাবিশ্বের সাতটি সৃষ্টি এবং সেই সাত সৃষ্টিকে নিরাপত্তা দানরত সাত অমর সত্ত্বার প্রতীক হিসেবে এই ‘হপ্ত সীনে’র আয়োজন থাকত। এখন অবশ্য সেই সাতটি উপাদান ক্ষেত্রবিশেষে পরিবর্তিত হয়েছে। তবু, বর্তমান যুগেও টেবিল সাজানোর এই সাত উপাদানের প্রতিটি উপাদানের আদ্যাক্ষরকে হতে হবে ‘স।’ এই সাত উপাদান হলো: সীব (আপেল), সবজে (সবুজ ঘাস), সেরকে (ভিনেগার), সামানু (গমের তৈরি এক ধরণের খাবার), সেঞ্জেদ (একটি বিশেষ জাতের বেরি ফল), সেক্কে (মুদ্রা) এবং সির (রসুন) বা সোমাঘ (এক ধরণের ইরাণীয় মশলা)। গম বা ডালের দানা একটি পাত্রে জলে ভিজিয়ে রাখা হয়। নতুন অঙ্কুর যখন তেরো দিনে পদার্পণ করে, তখন এই সব্জে (সবুজ, নতুন অঙ্কুর) জানালা দিয়ে বাইরে ফেলে দেয়া হয়। তার আগে নানা রঙীন ফিতায় তাকে বেঁধে রাখা হয়। এই তেরোতম দিনকে বলা হয় সিজদাহ বেহ দার। কিছু গোল্ড ফিশ সাজিয়ে রাখা হয় একটি এক্যুরিয়ামে। অতীতে এই সোনালী মাছ পরে আবার নদীতে ছেড়ে দেয়া হতো। কিন্ত আজকাল মানুষ বাসায় রেখে দেয়। জাফর পানাহির ‘দ্য হোয়াইট বেলুন’ সিনেমাটি নিশ্চিত মনে আছে? ঐ যে সিনেমাটি শুরুই হয় দুই ছোটো ভাই-বোণের নওরোজ পালনের প্রস্তÍতি দিয়ে? ঘর সাজানো, গোল্ড ফিশ কিনলেও রাস্তায় পড়ে যাওয়া আর খুঁজতে গিয়ে প্রাণান্ত হওয়া? অনেকে ঘরের ভেতর কোরাণ আবার কেউ কেউ দিওয়ান-ই-হাফিজ বা শাহনামা সাজিয়ে রাখেন। সাল তাহভিল বা নওরোজ শুরু হবার মূহুর্তটিতে অনেকেই কবিতা পড়েন। অগ্নি উপাসকদের তো নিজস্ব প্রার্থনা আছেই। তাঁরা এদিন অগ্নি উপাসনার মন্দিরে যান। সাল তাহভিল বা নওরোজ শুরু হবার মূহুর্ত পার হবার পর ইরাণীরা পরষ্পরকে জড়িয়ে ধরেন এবং চুম্বন করেন, একে অপরকে নানা উপহার দেন (সাধারণত: টাকা, মুদ্রা বা সোনার মুদ্রা)। বড়রাই সাধারণত: ছোটদের উপহার দিয়ে থাকেন। তেরোদিন ব্যপী অনুষ্ঠানের প্রথম কয়দিন আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের বাসায় ঘোরা হয়। বাচ্চারা নানারকম মিষ্টি এবং ‘আজিল’ (বিভিন্ন ধরণের বাদাম ও মিষ্টি দিয়ে বাননো) এবং ফল উপহার পায়। নওরোজের আগের রাতে ‘সব্জি পোলাও মাহি (মাছ ও সব্জি মেশানো পোলাও)’ রান্না করা হয়।

পহেলা বৈশাখ ও মঙ্গল শোভাযাত্রা
“আমরা মুসলমানের আড়ং দেখিতে নাই! (??)”
পহেলা বৈশাখ পালন ‘বাঙালিয়ানা’ না ‘হিন্দুয়ানী’ এ নিয়ে বিতর্ক চলছে সেই পাকিস্থান আমল থেকেই। এ বিষয়ে রেফারেন্স পয়েন্ট হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে কবি জসিমউদ্দীনের একটি কবিতা ‘পল্লীজননী’কে। কবিতাটি পাঠ্যপুস্তকেই পড়া। স্কুলজীবনে। এক দরিদ্র, বিধবা গ্রাম্য মা মৃত্যুপথযাত্রী কিশোর ছেলের পাশে বসে। মা’র সাধ্য নেই ছেলের চিকিৎসা করার। ছেলে অচেতন। মা’র মনে পড়ছে দারিদ্র্যের কারণে ছেলের ছোট ছোট কত শখ-আব্দার পূরণ করতে পারেন নি! ছেলে যখন আড়ং বা গ্রামীণ মেলায় যেতে চেয়েছে (গ্রামজীবনের সবচেয়ে বড় মেলা হয়তো চৈত্র সংক্রান্তি বা নতুন বছরের শুরুর মেলাই যদি ধরে নিই), মা’র ছেলেকে হাতখরচ দেবার ক্ষমতা ছিল না বলে মিথ্যে করে মোল্লাদের বয়ানকে সে ছেলের জন্য উল্লেখ করেছে: ‘আমরা মুসলমানের আড়ং দেখিতে নাই!’ ‘আড়ং’ নামে ঢাকায় অবশ্য এখন বাংলাদেশের বলতে গেলে বৃহত্তম ফ্যাশন হাউস রয়েছে এবং নববর্ষেও তারা মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত নর-নারীর জন্য কোটি টাকা কেনা-বেচার পসরা নিয়ে আসবে নিশ্চিত!
জসিমউদ্দিন- যাঁকে আমরা ‘পল্লীকবি’ই বলি- বাংলা কবিতার আধুনিক কাব্যভাষা আয়ত্ত্ব করা হয় নি তাঁর। তবু ‘নক্সীকাঁথার মাঠ’ বা ‘সোজনবাদিয়ার ঘাটে’র মত অনেক কাব্যগ্রন্থেই এমন এক লোকায়ত বাংলাকে তার দারিদ্র্য, অসূয়া, পাশবিকতা এবং সেই সাথে অপার মমতা ও সৌন্দর্যের সাথে তিনি এঁকেছেন যার নৃ-তাত্ত্বিক মূল্য অনেক ‘আধুনিক’ কবির কবিতার চেয়ে কম নয়। এই যে কিশোর ছেলেটিকে তাঁর বিধবা মা বুঝ দিয়েছিল ‘মুসলমানের আড়ং দেখিতে নাই’ বলে, মা কি মোল্লাদের ফতোয়ায় কনভিন্সড ছিল? না বোধ করি। হয়তো হাতে টাকা থাকলে ছেলেকে সে পাঠাতো। কিন্ত দারিদ্র্যকে ঠেকা দিতে ধর্মের নিষেধাজ্ঞার কথা তাকে বলতে হয়েছে। এই একটি পংক্তি থেকে বোঝা যাচ্ছে যে যারা বলেন যে বাংলাদেশে আজকের নববর্ষ পালনটি মধ্যবিত্ত সেক্যুলারদের চাপিয়ে দেয়া প্রকল্প, তা’ সর্বাংশে সত্য নয়।

এবার পহেলা বৈশাখের খুঁটিনাটি আলাপে আসি। প্রতি বছর ১৪ এপ্রিল বাংলাদেশে এবং ১৪/১৫ই এপ্রিল ভারতের পশ্চিম বাংলায় পহেলা বৈশাখ পালিত হয়ে থাকে। চান্দ্র-সৌর বৈদিক বর্ষপঞ্জিতে নির্দেশিত সূর্যের আবর্তনকালের সাথে এই উৎসবের তারিখ এমনভাবে নির্দ্ধারিত করা হয়েছে যে প্রায় প্রতিবছরই গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জির ১৪ তারিখ এই উৎসবটি উদযাপিত হয়ে থাকে। ইতিহাসের একটি মত বলছে ৫৯৪ খ্রিষ্টাব্দের ১২ বা ১৪ এপ্রিল গৌড়ের নৃপতি শশাঙ্ক প্রথম ‘বঙ্গাব্দ’ শুরু করেন। এই সাল গণনা একটি সংস্কৃত জ্যোতির্বিজ্ঞান গ্রন্থ ‘সূর্য সিদ্ধান্তে’র উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়। আর একটি মত বলছে আলাউদ্দিন হুসেইন শাহ (১৪৯৪-১৫১৯) সালে বাংলা ও আসাম অঞ্চলে প্রচলিত সৌর ক্যালেণ্ডারের সাথে ইসলামী চান্দ্রেয় ক্যালেণ্ডার যুক্ত করে নতুন বাংলা ক্যালেণ্ডার প্রবর্তন করেন। এই দুই মত নিয়ে মতদ্বৈধতা থাকলেও সবাই মোটামুটি একমত যে মুঘল সমাট আকবর (১৫৫৬-১৬০৫) খাজনা আদায় সহজতর করার জন্য বর্তমান বাংলা ক্যালেণ্ডার প্রবর্তন করেন। আকবর প্রবর্তিত এই ক্যালেণ্ডারকে সেসময় বলা হতো ‘তারিখ-ই-ইলাহি।’ এদেশে মুসলিম শাসকদের সাথে আসা ইসলামী চান্দ্রেয় ক্যালেন্ডারের সাথে স্থানীয় কৃষকদের অনুসরণ করা সৌর ক্যালেন্ডারের প্রায়ই সঙ্ঘর্ষ হতো। সঙ্ঘর্ষ হতো মাস ও দিনের হিসাবে। ফলে ফসল কাটার সময় ও খাজনার হিসাব নিয়েও বেশ মুস্কিল হতো। কাজেই ইহজাগতিক ও বাস্তববাদী সম্রাট আকবরের নির্দেশে তাঁর অর্থমন্ত্রী টোডর মল ক্যালেণ্ডার সংস্কারের উদ্যোগ নেন। আকবরের রাজসভার জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতুল্লা সিরাজি পুনরায় ইসলামী চান্দ্রেয় ক্যালেণ্ডার ও হিন্দু সৌর ক্যালেণ্ডারের একটি সংশ্লেষন করেন যার বলে চান্দ্রেয় মাসের বদলে সৌর ও চান্দ্র বর্ষের মিলন মূহুর্তে নতুন ক্যালেণ্ডারে বর্ষ গণনা শুরু হয়। এই ক্যালেণ্ডারেরই নাম দেওয়া হলো ‘ফসলী সন’ বা ‘বঙ্গাব্দ।’ ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দ অথবা ৯৯২ হিজরি থেকে প্রকৃতপক্ষে এই পঞ্জিকা শুরু হলেও নয়া পঞ্জিকায় রেট্রোস্পেক্টিভ ইফেক্টে ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দ বা ৯৬৩ হিজরি থেকেই বর্ষগণনা শুরু হয়। ৯৬৩ হিজরি সালের মোহররম বাংলা ক্যালেণ্ডারের বৈশাখের সাথে এক হয়ে গেছিল এবং এভাবেই বৈশাখ বাংলা ক্যালেণ্ডারের প্রথম মাস হিসেবে বিবেচিত হতে শুরু করে। আকবর প্রবর্তিত ‘তারিখ-ই-ইলাহি’ পঞ্চিকায় প্রতিটি মাসের আলাদা আলাদা নাম ছিল যা আজকের প্রচলিত নামগুলো থেকে ভিন্ন। আকবরের পৌত্র শাজাহান সাত দিনে এক সপ্তাহ প্রচলন করতে পঞ্জিকার আরো কিছু সংস্কার করেন এবং প্রতি রবিবার থেকে সপ্তাহ গণনা শুরু হতো। পরে ‘তারিখ-ই-ইলাহি’ ক্যালেণ্ডারে প্রচলিত মাসের নামগুলো এই অঞ্চলে প্রচলিত শক পঞ্জিকার সাথে মেলাতে মাসগুলোর নাম বদলে দেওয়া হয়। নাম বদলানোর এই সময়টির সঠিক দিন-ক্ষণ জানা যায় না। যাহোক, চৈত্রের শেষ দিন নাগাদ সব জমি বা ব্যবসার মালিককে বছরের সব হিসাব-নিকাশ মেটানোর নির্দেশ দিয়ে আকবরই যে ‘চৈত্র সংক্রান্তি’ এবং তার পরের দিন থেকে পহেলা বৈশাখ চালু করেন সেবিষয়ে আজ কোন দ্বিমত নেই। বাংলা পঞ্জিকা/ক্যালেণ্ডারের বারোটি মাসের নাম ‘সূর্য সিদ্ধান্ত’ পঞ্জিকা থেকে নক্ষত্রগুলোর নামে নেওয়া। তবে এই নক্ষত্রগুলোর সাথে চাঁদের অবস্থানগত গণনার ভিত্তিতে এই বারো মাসের নামকরণ। বিশাখা নক্ষত্রের নামে বৈশাখ, জ্যেষ্ঠা নক্ষত্রের নামে জ্যৈষ্ঠ, উত্তরাষাঢ়ার নামে আষাঢ়, শ্রবণার নামে শ্রাবণ, পূর্বভাদ্রপদের নামে ভাদ্র, অশ্বিনীর নামে আশ্বিন, কৃত্তিকার নামে কার্তিক, মৃগশিরা নক্ষত্রের সাথে চাঁদের অবস্থানের প্রেক্ষিতে অগ্রহায়ণ, পুষ্যার নামে পৌষ, মঘার নামে মাঘ, উত্তরফাল্গুনীর নামে ফাল্গুন এবং চিত্রা তারার নামে চৈত্র। ১৫৮৪ সালে আকবর প্রবর্তিত ‘তারিখ-ই-ইলাহি’ পঞ্জিকায় মাসগুলোর নাম ছিল কারওয়ারদিন, আর্দি, খোরদাদ, তীর, আমারদাদ, শাহারিয়ার, ভিহিসু, আবান, আজার, দে, বাহমান এবং ইসফান্দা মিজ। বাংলা পঞ্জিকায় সাত দিনে এক সপ্তাহ এবং প্রতিদিনের নামই একটি না একটি গ্রহ বা ‘নবগ্রহে’র নামে হয়ে থাকে। গ্রেগরিয়ান ক্যালেণ্ডারের মত মাঝরাতের বদলে আমাদের পঞ্জিকায় সূর্যোদয়ের সাথেই নতুন দিনের সূচনা। এই একই উৎসব কেরালায় বিশু, তামিলনাড়–তে পুথান্ডু আর মধ্য ও উত্তর ভারতে বৈশাখী নামে পরিচিত। আসামে এই উৎসবকেই রঙ্গালী বিহু, নেপালে বিক্রম সম্বৎ, উড়িষ্যায় বিষুব সংক্রান্তি, থাইল্যান্ডে সংক্রান, কাম্পুচিয়ায় চোল চনম থিমে, লাওসে সংকান ও বার্মায় থিংগ্যান নামে পরিচিত। পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমা-মারমা-ত্রিপুরারা ‘বৈসাবী’ উৎসব হিসেবে পালন করে। গোটা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৌদ্ধ দেশগুলোতেও একই সময়ে নববর্ষ উদযাপিত হয়।
যদিও বাংলা পহেলা বৈশাখ মূলত: বাঙালী হিন্দু (ব্যবসায়ী ও কৃষিজীবী সম্প্রদায়ের)-র উৎসব ছিল, আজ কিন্ত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে এটি পশ্চিম বাংলার চেয়েও বড় করে পালিত হয়। ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে পাকিস্থানী শাসকগোষ্ঠির বাংলা বর্ণমালা বা বাংলার জনপ্রিয়তম কবি রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে নানা নিষেধাজ্ঞা ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলায় প্রথম ঢাকার রমনার বটমূলে পহেলা বৈশাখ পালনের আয়োজন সূচনা করে সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ছায়ানট।’ ভিলহেলম ভ্যান সেন্ডেলও তাঁর ‘আ হিস্ট্রি অফ বাংলাদেশ’-এ এই মত মান্য করেছেন।
ষাট ও সত্তরের দশকে ঢাকার বর্ষবরণ উদযাপনে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র অংশগ্রহণ না থাকলেও যশোরে ১৯৮৫ সালে ‘চারুপীঠ’ নামে একটি সংস্থা প্রথম এই উদ্যোগ নেয়। ১৯৮৯ সালে স্বৈরশাসক এরশাদ বিরোধী আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন ঢাকায় চারুকলার ছাত্ররা এই আয়োজন বিপুলভাবে শুরু যে করেছিল সেটা আমরা কম-বেশি সবাই জানি। ঢাকার বাইরে পহেলা বৈশাখের যে গ্রামীণ উদযাপনগুলো রয়েছে, তার ভেতর মুন্সীগঞ্জের ষাঁঢ়ের লড়াই, চট্টগ্রামের জব্বারের বলী খেলা (কুস্তি), দেশের নানা জায়গায় নৌকা বাইচ, মোরগ লড়াই বা কবুতরের লড়াই ত’ রয়েছেই। আছে হালখাতার উদযাপন। ২০১৬ সালে ইউনেস্কো আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রাকে ‘অমূল্য ভাব সম্পদ ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের উত্তরাধিকার’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ইউনেস্কোর এই তালিকায় বাংলাদেশের অপর যে দুই সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার স্বীকৃতি পেয়েছে, তা’ হলো বাউল গান ও জামদানি শাড়ি।
এখন মঙ্গল শোভাযাত্রাকে নিয়ে অধুনা যে বিতর্ক হচ্ছে যে এটা কি মৃত্তিকা উদ্ভুত বা মধ্যবিত্তের চাপিয়ে দেয়া? কেন মুখোশ মিছিল? মুখোশের কথা বললে বলতেই হয় যে সেই প্রাচীন গ্রিসে ‘পার্সোনা’ বা ‘মুখোশ’ থেকেই ত’ মুখোশের শুরু। পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্রে বা জাতিসত্ত্বার ভেতরেই মুখোশ মিছিল একটি আনন্দময় কার্ণিভাল। ভারত উপমহাদেশে পশ্চিম বাংলার পুরুলিয়া সহ নানা অঞ্চলে ছৌ নৃত্যে বা দক্ষিণ ভারতের কথাকলি নাচে মুখোশের বিস্তৃত ব্যবহার আমরা দেখতে পাই। বাংলায় গ্রামাঞ্চলে চৈত্রের গাজন বা সং যাত্রায় এই মুখোশ মিছিলের শেকড় ত’ অবশ্যই আছে। চারুকলার যে বুদ্ধিদীপ্ত, প্রতিবাদী ছাত্ররা এই আয়োজন শুরু করেছিলেন, তারা সং যাত্রা থেকেই হয়তো উদ্দীপিত হয়েছিলেন। ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’য় ব্যবহৃত পেঁচা বা ময়ূর নিয়ে যে প্রশ্ন উঠছে যে এগুলো ‘হিন্দুয়ানী প্রতীক’- এটা নিয়ে আর কি বিতর্ক করব? এদেশের অধিকাংশ ধর্মান্তরিত মানুষের পূূর্ব পুরুষ বা পূর্ব নারীরা ত’ ‘হিন্দু’ই ছিলেন। ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রীয় বিমানের নাম আজো কেন ‘গড়–র’ বা ইরাণে কেন আজো অগ্নি উপাসকদের রীতি মান্য করে নওরোজের শুরুতে প্রতিটি ইরাণী পরিবারের টেবিলে ‘হপ্ত সীন’ বা ‘সাত বস্ত’ সাজানো হয়- সেসব প্রশ্নেরও ত’ তবে উত্তর হয় না! যেমন আপনি চাইলেই আপনার গাত্রবর্ণ আসলে আরবদের মত করতে পারবেন না, খাদ্যাভ্যাস বা পোশাক অনেকটা বদলালেও পুরোটা বদলাতে পারবেন না- সেসব কারণেই মঙ্গল শোভাযাত্রায় না চাইতেও পেঁচা বা কুলার প্রতীক এসে যায়। গ্রামের বউ-ঝিরা আজো কি কুলায় চাল ঝাড়ে না? আজো সুদর্শন লক্ষী পেঁচারা বাংলায় সন্ধ্যার বাতাসে উড়ে বেড়ায়! লক্ষী ছেলে বা লক্ষী মেয়ে কি পুত্রবধূর কামনা আজো রয়েছে। আসলে এত নিচে নেমে ডিবেট করা সম্ভব নয়।

ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম/এইচএমএল


সর্বশেষ সংবাদ