বাংলা ফন্ট

‘যুদ্ধ শিশুদের বিজয় শিশু বলা উচিৎ’

25-03-2017

‘যুদ্ধ শিশুদের বিজয় শিশু বলা উচিৎ’



একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বে নতুন আরেক স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। এক অনভিজ্ঞ বিচার ব্যবস্থায় যুক্ত হয়ে প্রসিকিউশন টিম (রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা) প্রশিক্ষণ নিয়ে বিচার পরিচালনাতে তাদের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন। তাদের দৃঢ়তা আর বিচক্ষণতায় বাঙালি জাতি তার কলঙ্কময় অধ্যায় ঘোচাতে আরো একধাপ এগিয়েছে। ট্রাইব্যুনালের মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে ঘটনাবহুল নির্মম কিছু অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটশন টিম। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সপ্তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এমই এক অভিজ্ঞতার বর্ণনা করেছেন প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার ড. তুরিন আফরোজ।
ঘটনার বর্ণনায় ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যতীত পৃথিবীর যত দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে, তার অধিকাংশ বিচার হয়েছে অপরাধ সংঘটনের কাছাকাছি সময়ে। তাই কোথাও কোনো মামলায় যুদ্ধ শিশুকে সাক্ষী হতে দেখা যায়নি। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ইতিহাস রচনা করেছে। প্রায় চল্লিশ বছর পর বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হয়েছে। সেক্ষেত্রে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বর্বরতার শিকারে সৃষ্ট কোনো পূর্ণ বয়স্ক যুদ্ধ শিশুকে খুঁজে পাওয়া আমার জন্য ছিলো অসাধ্য। তবুও আমি হাল না ছেড়ে শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন মামলার নথি থেকে থেকে সৈয়দ কায়সারের মামলায় বীরাঙ্গনা মাজেদা এবং তার যুদ্ধশিশু সামছুন নাহারের খোঁজ পেয়ে যাই। এরপর প্রায় বছর খানেক সময় মাজেদা ও তার যুদ্ধশিশুর সঙ্গে যোগাযোগ চালিয়ে যাই। কেননা, এই মামলা করার মাধ্যমে যুদ্ধ শিশুদের ইতিহাসকে সামনে তুলে আনাই ছিলো আমার প্রধান উদ্দেশ্য।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সমাজে এখনো ধর্ষিতাকে বারবার মৃত্যুর (তিক্ত সমালোচনা) মুখোমুখি হতে হয়। মূলত ধর্ষণের যে কষ্ট, তা মৃত ব্যক্তির কষ্টের চেয়েও ভয়াবহ। প্রতিটি মুহূর্তেই যেন তার মৃত্যু ঘটে। সমাজ বা পরিবার তাকে কাছে টেনে নেয় না। সে তখন সম্মান না পেয়ে বেঁচে থাকার শেষ আগ্রহটুকুও হারিয়ে ফেলে।’
ব্যfরিস্টার তুরিন আফরোজ বলেন, ‘একাত্তরের পর অনেক যুদ্ধ শিশুকেই বিদেশে দত্তক হিসেবে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তবু হতাশ না হয়ে যুদ্ধশিশু খুঁজতে গিয়ে সামছুন নাহারের দেখা পেয়ে যাই। আমি তখন সামছুন নাহারের কণ্ঠকে পৃথিবীর বুকে হাজারো যুদ্ধ শিশুর কণ্ঠ হিসেবে উপস্থাপন করতে সচেষ্ট হই। যে শিশু কিনা তার মায়ের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অপরাধের জন্য আর নিজের জন্যে বিচার চাইবে। তাই কায়সারের মামলা পরিচালনার পাশাপাশি সামছুন নাহারের জীবনের বেড়ে ওঠার কষ্ট, প্রতিবন্ধকতা ও নির্মমতা সম্পর্কে জানতে থাকি।’
তুরিন আফরোজ বলেন, ‘আমাদের সমাজে একজন যুদ্ধশিশুকে জন্মের পরই শুনতে হয় সে ‘জারজ’ সন্তান। যা অত্যন্ত দুঃখের বিষয়। তবে আমি এ মামলায় আইনি যুক্তি উপস্থাপনের সময় ট্রাইব্যুনালকে বলি, ধর্ষণের ফলে একজন যুদ্ধ শিশুর জন্মই যেন আজন্ম পাপ। এই পাপ মোচন যেন কখনোই হয়না। সারা জীবন এই পাপ বহন করতে হয়, লাঞ্ছিত হতে হয়। তার পরিবারসহ সে সমাজের কাছে হয়ে পড়ে অপাংক্তেয়। রাষ্ট্রও যেন তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।’
যুদ্ধশিশু সামছুন নাহারের সঙ্গে নিজের তুলনা করে প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজ বলেন, ‘একাত্তরের পর ১৯৭২ সালের বৈশাখ মাসে সামছুন নাহার যুদ্ধশিশু হিসেবে জন্ম নেয়। আমিও একই সময়ে জন্ম নিয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরে বেরাই, আনন্দ করি, গর্ব করে ঘুরে বেরাই। অথচ সামছুন নাহার তা পারেনা। কিন্তু সামছুন নাহারেরও অধিকার আছে এই স্বাধীন দেশে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার আর তার মায়ের আত্মত্যাগ নিয়ে গর্ব করার। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সেটি সম্ভব হয়নি। সুতরাং সবকিছু মিলিয়ে এ মামলায় আমরা যুদ্ধ শিশুকে হাজির করে তার সাক্ষ্যের মাধ্যমে সারাবিশ্বের মাঝে নজির তৈরি করেছি। এর মাধ্যমে আমরা যুদ্ধ শিশুদের নিয়ে আমাদের সামাজিক নীরবতা ভাঙতে চেষ্টা করেছি।’
মামলা পরিচালনাকালীন অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ শিশুদের নিয়ে আমাদের সমাজে নীরবতা কেন, তা জানতে চেয়ে প্রশ্ন করেন ট্রাইব্যুনালের বিচারকগণ। উত্তরে আমি বলি, এই নীরবতার ব্যাখ্যা শুধু রাষ্ট্রই নয়, সমাজকেও দিতে হবে। আমরা কি তাদের আপন করে নিয়েছি? আমাদের মধ্যে কয়জন গর্ববোধ করি বলতে, আমার মা অথবা আমার বোন অথবা আমার সন্তান একজন বীরাঙ্গনা? স্বাধীনতার এত বছর পরও এ কথা আমরা বলতে পারিনা! এটা আমাদের দুঃখ।’
সামছুন নাহারের দুঃখ গাঁথা দিনের বর্ণনা দিয়ে তুরিন আফরোজ বলেন, ‘একাত্তরের যুদ্ধের পর বীরাঙ্গনা মাজেদা তার নিজ বাবার বাড়িতে যুদ্ধশিশু সামছুন নাহারের জন্ম দেন। সেখান থেকে মাজেদাকে তার স্বামী আতাই মিয়া নিজ বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে তাদের আরো সন্তানের জন্ম হয়। এর মাঝে প্রায় ৫ বছর যুদ্ধশিশু সামছুন নাহারের সঙ্গে তার মা মাজেদার কোনো যোগাযোগ ছিল না। সে নানা বাড়িতে বড় হতে থাকে। আতাই মিয়া তার অন্য সন্তানদের মত যুদ্ধশিশু সামছুন নাহারের সঙ্গে বৈষম্যমূলক ব্যবহার করতেন।’
তিনি বলেন, ‘নানা বাড়িতে বড় হবার পর সামছুন নাহারের বিয়ে দেওয়া হয়। সামছুন নাহার বীরাঙ্গনার সন্তান জানতে পেরে তার শ্বশুর বাড়ির লোকজন তাকে মারধর করে বের করে দেয়। পরে তার স্বামী আরেকটি বিয়ে করে। এরপর থেকে যুদ্ধশিশু সামছুন নাহার একাই বসবাস করছেন।’
তুরিন বলেন, ‘আমাদের দুঃখ, আমরা এখনো যুদ্ধ শিশুদেরকে আপন করে নিতে পারিনি। কায়সারের মামলায় সাক্ষ্য দেবার পর থেকে সামছুন নাহার তার এলাকায় এক রকম ভয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তার ওপর ভীষণ হুমকি আসছে। তাই বাধ্য হয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে অন্য এক শহরে তিনি এখন বসবাস করছে। এসব ঘটনার স্বীকার সামছুন নাহার বলেন, দরকার হলে সে এ দেশ ছেড়ে চলেই যাবে। আসলে তারতো কোনো ঘর নেই বা কোনো দেশ নেই।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের আরো দুঃখ হলো, আমাদের সমাজে বীরঙ্গনা এবং যুদ্ধশিশু সম্পর্কে যে ব্যাখ্যা রয়েছে তা অত্যন্ত জঘন্য। সেই ব্যাখ্যায় যুদ্ধশিশু ও বীরাঙ্গনা বলতে জারজ সন্তান এবং ধর্ষিতা নারীকেই বোঝায়। কিন্তু এর পরিবর্তনের সময় এসেছে। এসব যুদ্ধ শিশুদেরকে ‘বিজয় শিশু’ বলা উচিৎ বলে মনে করি। তারা সারাজীবন নিজেদের সাথে যুদ্ধ করে গিয়েছে। তাই এ বিষয়ে আমাদের সমাজের নীরবতা ভাঙা খুব জরুরি।’

সর্বশেষ সংবাদ