বাংলা ফন্ট

ক্যাস্ত্রো পরবর্তী কিউবা কোন পথে

07-12-2016
আকিল উজ জামান খান

ক্যাস্ত্রো পরবর্তী কিউবা কোন পথে
ফিদেল ক্যাস্ত্রো কিউবান বিপ্লবের মহানায়ক। যিনি স্নায়ুযুদ্ধকে টেনে এনেছিলেন পাশ্চাত্য পরিমণ্ডলে সেই ১৯৫৯ এ এবং পরবর্তী অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে মোকাবেলা করেছেন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের প্রতিনিধি ১১জন মার্কিন রাষ্ট্রপতির। কেবল মোকাবেলাই করেননি, তিনি টিকেছিলেন তার মতোই মাথা উঁচু করে। হেঁটেছেন তার নিজের পথে, নিজের মতে, তার পথ পৃথিবীকে ঠেলে দিয়েছিল আণবিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে। তার মত, পথ, শাসনপদ্ধতি, অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা আর বিতর্ক ছিল, আছে, হয়তো চলবেও। কিন্তু এ কথা অস্বীকারের উপায় নেই তার নেতৃত্বে কিউবা বিশ্বমানচিত্রে আজ এক প্রতিবাদের নাম। এমন এক প্রতিবাদ যে মার্কিন ও তার সাম্রাজ্যবাদী মিত্রদের থোরাই পরোয়া করে। এমন এক প্রতিবাদ যে, সারাবিশ্বে যখন সমাজতন্ত্রের মৃত্যুঘণ্টা বাজছে তখনও মিত্রহারা কিউবা তার নেতৃত্বে উঁচু করে ধরে রেখেছে সমাজতন্ত্রের ঝাণ্ডা। আর তার জাতি তাকে অনুসরণ করেছে হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো। সময় তাকে পরিণত করেছে লাতিন আমেরিকার কণ্ঠস্বর থেকে সারাবিশ্বের স্বাধীনচেতা মুক্তিকামী মানুষের প্রতীকে। তার ব্যক্তিত্বের সামনে নতশির সারাবিশ্ব। কোনো একক ব্যক্তি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রায়শই যে ঝড় তুলেছেন তার নজির সমকালীন ইতিহাস কেবল নয় সুদূর অতীতেও খুঁজে পাওয়া ভার। নিজের পথ পরিষ্কার নির্দেশ করতে যেয়ে যে মহানায়ক দৃঢ় স্বরে উচ্চারণ করেছিলেন, ‘মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী বিরোধীতা যেমন আমাদের বিপ্লবকে ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না তেমনি ইউএসএসআর এর সহযোগিতা না পেলেও বিপ্লব টিকে থাকবে তার মতো করেই।’ ফিদেল ক্যাস্ত্রো আর নেই। ২৫ নভেম্বর রাত ১০টায় মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন এই মহাপ্রাণ।

একমাত্র রানী এলিজাবেথ ১১ ব্যতীত ফিদেল তার সময়ে নিজ জাতিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন সবচেয়ে বেশি সময় ধরে! কেবল ১১ মিলিয়ন জনসংখ্যার ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের একটি জাতির নেতার ঊর্ধ্বে ওঠে আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে প্রভাবিতকরণে তার সমান্তরাল কোনো নাম নেই। জানুয়ারি ৮, ১৯৫৯ এ যেদিন তিনি বিপ্লবের পতাকা নিয়ে হাভানায় প্রবেশ করেন, সেদিন থেকেই তিনি নিজের জাতিকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন শক্তির প্রতীক হয়ে। সারাবিশ্ব সেদিন তাকে হতবাক হয়ে দেখেছে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অনলবর্ষী বক্তৃতা দিতে। অবশেষে সাদা ঘুঘু উড়িয়ে তিনি দিলেন শান্তির বার্তা। তড়িতাহত জনতা তখন চিৎকারে ফেটে পড়ছে ফিদেল-ফিদেল।

উপস্থিত জনতার তখনও কোনো ধারণা ছিল না এই দীর্ঘদেহী তরুণ বিপ্লবীর পরিকল্পনা নিয়ে। তাদের কাছে তিনি তখনও কেবল এক কল্পনা আর প্রবাদের নাম। কিন্তু ক্যাস্ত্রো বিশ্বাস করতেন তিনি তার জাতির রক্ষাকর্তা। সেই থেকে যতদিন শারীরিক সামর্থ্য ছিল সর্বোচ্চ আসন থেকে নিজ জাতিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন সমান দৃঢ়তায়। সাম্রাজ্যবাদ তাকে বলেছে স্বৈরশাসক। আর বিশ্বজুড়ে অনুরাগীদের হৃদয়ে তার স্থান – মুক্তিকামী মানুষের কণ্ঠস্বর আর বিপ্লবের রূপকার। তবে প্রাকৃতিক নিয়মেই সময় তার সামর্থ্য কেড়ে নিচ্ছিল। তার দরাজ কণ্ঠ হয়ে আসছিল ম্রিয়মাণ। ২০০৬ এ এসে তিনি প্রথমবারের মতো ক্ষমতা হস্তান্তর করতে বাধ্য হন তার বিপ্লবী সঙ্গী রাউল ক্যাস্ত্রোর কাছে। কারণ শারীরিক অসুস্থতা। তার অন্যসব সিদ্ধান্তের মতো এটিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র সমালোচনার স্বীকার হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনার জবাব দিতে তিনিও পিছিয়ে ছিলেন না। ১৯৮৫তে প্লে-বয় ম্যাগাজিন তার কাছে জানতে চায়। রোনাল্ড রিগ্যান যে তাকে- হৃদয়হীন স্বৈরশাসক বলেছেন এ বিষয়ে তার কি অভিমত? তিনি হাস্যোচ্ছল মুখে বলেন, ‘আসুন আমরা বিষয়টি এভাবে দেখি। যদি হুকুম জারি করে রাষ্ট্রশাসনকারীকে স্বৈরশাসক বলা যায়, তাহলে পোপকেও তা বলতে পারি।’ ২০০৭ এ তিনি মৃত্যুর হুমকির মুখে জর্জ ডব্লিউ বুশকে উৎসর্গ করেছিলেন, মানকাডা ব্যরাকে তার বন্দি অবস্থায় উচ্চারণ করা সেই কালো লেফটেন্যান্টের বানী- স্বপ্নের মৃত্যু নেই। ১৯৬১ তেই তিনি কেনেডিকে জানিয়ে দিয়েছিলেন তোমার পরামর্শের কোনো প্রয়োজন আমাদের নেই।

ক্যাস্ত্রোর জীবনাবসান আজ সারাবিশ্বকে এ প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে এরপর কিউবা কোন পথ বেছে নেবে? আর সেক্ষেত্রে প্রথমেই বিবেচনায় নিতে হবে ক্যাস্ত্রো যার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছেন সেই রাউলকে। রাউল কেবল তার ভাই নন, সংগ্রামের শুরু থেকেই তার সহযোদ্ধা। বলা হয় ক্যাস্ত্রোকে সমাজতান্ত্রিক পথে সবচেয়ে বেশি যে দুজন মানুষ প্রভাবিত করেছেন তাদের একজন রাউল অপরজন চে গুয়েভারা।

সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের পতনের পর ক্যাস্ত্রোর শাসনামলেই কিছু পরিবর্তনের সূচনা হয় বা বলা যায় ক্যাস্ত্রো তাতে বাধ্য হন। সোভিয়েত পতনের পর ১৯৯৩ এ তিনি নিজ দেশের অর্থনীতির বিপর্যয়ের মুখে ডলারকে বৈধতা দেন। তার এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে কিউবা এক দ্বৈত মুদ্রা ব্যবস্থায় প্রবেশ করে। এছাড়াও ভাই রাউলের প্রভাবে তিনি নিজ দেশে ফ্রি এন্টারপ্রাইজকে সুযোগ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাধ্যবাধকতা শিথিল করে কৃষকদের অতিরিক্ত ফসল বাজার দরে বিক্রির অনুমতি দেন। এছাড়া ব্যক্তিমালিকানায় পরিচালিত ছোট ছোট রেস্টুরেন্ট যা পালাডারাস বলে পরিচিত তার অনুমোদনও দেন। আর রাউল ক্ষমতা গ্রহণের পর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ আরও শিথিল হয়। এছাড়াও ফিদেল নিজেই কিছু স্প্যানিশ, ইতালিয়ান, কানাডিয়ান কোম্পানিকে রিসোর্ট হোটেল, অবকাশকেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি দেন। বিল ক্লিনটন তার সময়ে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। কিউবার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত থাকে। তবে ক্যাস্ত্রো অন্য এক বিজয়লাভ করেন পোপ জন পল ১১-এর হাভানা সফরে। পোপ যেমন কিউবার মানবাধিকার আর মৌলিক স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলেন তেমনি মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে সরাসরি অন্যায় ও নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য বলে আখ্যায়িত করেন।

ক্যাস্ত্রো এমন এক রাষ্ট্র শাসন করেছেন যার অধিকাংশ মানুষ ২০০১-এ বক্তৃতা দেয়াকালীন তার মূর্ছিত হয়ে পড়ার আগ পর্যন্ত অন্য কোনো নেতার কথা শোনেননি। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার স্বদেশেও পরিবর্তনের দাবিটি জোরালো হতে থাকে। ওসওয়াল্ড পায়া বাক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার দাবিতে জনমত গড়ে তোলেন। যিনি ২০১২ তে এক গাড়ি দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেন। তবে নানাভাবে প্রতিবাদ অব্যাহত থাকে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক লেখালেখি হয়। তবে ইন্টারনেটের ব্যবহার নিয়ন্ত্রিত থাকায় কিউবার সাধারণ জনতা তা জানার সুযোগ খুব কমই পেয়েছে। ‘লেডিস ইন সানডে’ নামে একদল প্রতিবাদী নারী তাদের জেলে থাকা স্বজনদের ছবি গলায় ঝুলিয়ে প্রতি রবিবার প্রতিবাদ জানাচ্ছে। ভাইয়ের উত্তরাধিকারী হিসেবে বিপ্লবের মূলনীতি ধরে রেখেও রাউল পরিবর্তনকে স্বাগত জানাচ্ছেন। তার এই পরিবর্তনের সাথী ছিলেন ভেনিজুয়েলার প্রয়াত প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজ। ক্যাস্ত্রোর মতো জনপ্রিয় না হলেও তাকে বিবেচনা করা হচ্ছে ক্যাস্ত্রোর চাইতে ভালো ব্যবস্থাপক হিসেবে। ঘাতক বিপ্লবী বলে পরিচিত রাউল জনদাবির বিষয়ে অনেক সচেতন। সচেতন তাদের নিত্যদিনের চাহিদা নিয়ে। তার প্রথম বড় পদক্ষেপ ছিল ক্যামেল নামে পরিচিত বাসগুলোর বদলে চায়না থেকে আমদানিকৃত বাস চালু করা। তিনি উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবসার সুযোগ উন্মোচন করে দিয়েছেন। ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা বাতিল, সেলফোন, কম্পিউটার আর ব্যক্তিগত ব্যবহার্য সামগ্রীর অনুমোদন দেয়ার পাশাপাশি বৈধতা দিয়েছেন সম্পত্তির ক্রয় বিক্রয়ে। কিউবায় কালোবাজারের বিস্তার এখন সরকারের নিয়ন্ত্রিত বাজারের চেয়ে বড়। আর তরুণ প্রজন্ম গড়ে তুলেছে বিকল্প ইন্টারনেট যোগাযোগ ব্যবস্থা। রাউল তা দেখেও না দেখার ভান করছেন। রাজনীতি চর্চার অনুমতি দেয়ার পাশাপাশি তার ভাইয়ের নিয়ন্ত্রণে বিশ্বসমাজ থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন কিউবাকে যুক্ত করতে আগ্রহী আন্তর্জাতিক সমাজে।

রাউল ও ওবামাকে প্রায়শই টিভিতে দেখা গেছে ২০১৪ তে। যখন তারা বন্দী বিনিময়ের ঘোষণা দেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রথম ধাপ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে সেটিকে। এই ঘোষণার ছয় সপ্তাহ পর ফিদেল ক্যাস্ত্রো তার লিখিত প্রতিক্রিয়ায় জানান, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে আমার বিশ্বাস নেই। এমনকি আমি তাদের সঙ্গে কথা বলতেও আগ্রহী নই। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, বিরোধের পরিবর্তে শান্তির সম্ভাবনাকে আমি প্রত্যাখ্যান করছি।’ ফিদেলের এই বার্তা পরিবর্তনের ইঙ্গিত বলেই বিবেচনা করা যায়।

কেবল রাউল নয়, কিউবার ক্ষেত্রে বিবেচনায় নিতে হবে আমেরিকার অভিবাসী কিউবানদের প্রভাব। যাদের অধিকাংশই ক্যাস্ত্রোর নীতিবিরোধী। আর স্বদেশে স্বজনদের কাছে প্রেরিত তাদের অর্থ কিউবার অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে। তারাও কিউবার পরিবর্তনকে প্রভাবিত করবে এটাই স্বাভাবিক।

ফিদেল ক্যাস্ত্রো তার পাহাড় প্রমাণ ব্যক্তিত্বের ঢাল দিয়ে যা মোকাবেলা করেছেন তা রাউলের পক্ষে সম্ভব নয়। সম্ভবত রাউল নিজেও তা জানেন। তিনি পরিবর্তনকে কিছুটা মেনে নিয়েছেন আর ক্যাস্ত্রোর অনুপস্থিতি এই পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করবে বলেই ধারণা। কিউবার হোটেল, রিসোর্টে পতিতাবৃত্তিতে অর্জিত ডলারও তাই বলে। রাউল কতদিন ঠেকিয়ে রাখতে পারবেন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের প্রতীক কোকাকোলা আর ম্যাকডোনাল্ডস- প্রশ্ন সেটিই। আমরা বারাক ওবামাকে ২০১৬তে দেখেছি ৮৮ বছরের মধ্যে প্রথম কোনো মার্কিন রাষ্ট্রপতি হিসেবে কিউবা সফরে।
বাতাসে পরিবর্তনের দাবি। এবং তা অবশ্যম্ভাবী। একথা নিশ্চিত করেই বলা যায় ক্যাস্ত্রোর এক নিয়ন্ত্রণে থাকা কিউবার এক পরিবর্তিত রূপ সামনে অপেক্ষমান। সেইসাথে এও সত্য- গত অর্ধ শতাব্দি ধরে কিউবার মাটিতে বিশ্বাস আর স্বপ্নের যে বীজ তিনি বপন করেছেন সেই মাটিতে বেড়ে ওঠা প্রজন্মের হাত ধরেই আসবে এ পরিবর্তন। ক্যাস্ত্রো প্রাসঙ্গিক রইবেন আরো বহুদিন। তবে ফিদেল ক্যাস্ত্রোবিহীন কতটা পরিবর্তিত কিউবা আমরা দেখতে পাব সে প্রশ্ন সময়ের হাতে তোলা থাক।
ক্যাস্ত্রোর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী কিউবাতে তার কোনো মূর্তি গড়া বা তার নামে কোনো সড়কের নামকরণ করা হবে না। তবে একথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় জীবদ্দশায় যে ১১জন মার্কিন রাষ্ট্রপতির মোকাবেলা তিনি করেছেন কালের গর্ভে তাদের নাম হারিয়ে গেলেও ক্যাস্ত্রো বেঁচে রইবেন আরো হাজার বছর।

আপাতত ফিদেলের সম্মানে নীরবতা।

সর্বশেষ সংবাদ