বাংলা ফন্ট

রাঢ়েশ্বর ঈশ্বর ঘোষ ও তাম্রশাসন

01-03-2017
সৌমিত্র চক্রবর্তী, পশ্চিম বঙ্গ, ভারত

রাঢ়েশ্বর ঈশ্বর ঘোষ ও তাম্রশাসন

 ১৮৩৩ সালের প্রথমদিকের ঘটনা, প্রত্নতত্ববিদেরা আচমকাই আবিষ্কার করলেন ইতিহাসের এক বিদ্যুৎ চমক। বাংলাদেশের দিনাজপুর জেলার রানীসৈঙ্কল থানার অধীনস্থ রামগঞ্জ গ্রামে রাঢ়েশ্বর ঈশ্বর ঘোষের এক তাম্রশাসন পাওয়া গেল। কে এই ঈশ্বর ঘোষ? 

ধর্মমঙ্গল কাব্যখ্যাত ইছাই ঘোষই হলেন এই ঈশ্বর ঘোষ। যিনি রাঢ় অঞ্চলে সেইযুগে এক দোর্দণ্ডপ্রতাপ শাসক ছিলেন। তাম্রশাসনটি বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা অক্ষয় কুমার মৈত্র ও ননীগোপাল মজুমদার বঙ্গানুবাদ সহ সাহিত্য নামের এক পত্রিকায় বাংলা ১৩২০ সনে প্রকাশ করেন। 
কিন্তু সেখানে বিতর্কের এক অবকাশ থেকেই গেল, কারন এই তাম্রপত্রে কোনো সাল তারিখ খোদিত নেই। কেবল সেখানে খোদিত আছে, ‘মহামান্ডলিক ঈশ্বর ঘোষের ৩৫ তম রাজ্যাঙ্কে মার্গশীর্ষ মাসের প্রথম তারিখে তাম্রশাসনখানি সম্পাদিত হইয়াছিল’। তৎকালীন ঐতিহাসিকরা লিপিবিজ্ঞান, অক্ষরছন্দ এবং খোদাইয়ের রীতি ইত্যাদি বিচার করে এটি পালযুগের শেষ পর্বের বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন।
 
এই গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার থেকে রাঢ় অঞ্চলের এক বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ সময়ের ইতিহাস তথা পাল যুগের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার এক পরিষ্কার চিত্র পাওয়া যায়, যা অন্য কোনো তাম্রশাসনে আজও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। বিখ্যাত ঐতিহাসিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘বাঙলার ইতিহাস’ গ্রন্থে ঈশ্বর ঘোষের রামগঞ্জ তাম্রশাসনের কথা উল্লেখ করে লিখেছেন, “রাঢ়দেশের অধিপতির পুত্র ধূর্ত ঘোষ। তাঁর পুত্রের নাম শ্রী বাল ঘোষ। বাল ঘোষের পুত্রের নাম ধবল ঘোষ। সদ্ভাবনা নাম্নী পত্নীর গর্ভে ধবল ঘোষের ঈশ্বর ঘোষ নামক এক পুত্র জন্মগ্রহণ করিয়াছিল। ঈশ্বর ঘোষ ঢেক্করী হইতে পিয়াল্ল মন্ডলান্তপাতি গাল্লিটিপ্যাক্ বিষয় সম্ভোগ দিগ্য়া সোদিকা গ্রামটি ভার্গবগোত্রীয় ভট্ট শ্রী নিব্বোক শর্মা নামক জনৈক যদুর্বেদীয় ব্রাহ্মণকে মার্গ শীর্ষের সংক্রান্তিতে জটোদয় স্নান করিয়া প্রদান করিয়াছিলেন”। 

এই ঢেক্করীর অবস্থান নিয়ে মতভেদ আছে। ঐতিহাসিক নগেন্দ্র নাথ বসু ও ননীগোপাল মজুমদার মনে করেন ঢেক্করী আসামের গোয়ালপাড়া বাঃ কামরূপ জেলায়। তাঁদের যুক্তি জটোদা নদীর উল্লেখের ভিত্তিতে। অপরদিকে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ও অক্ষয় কুমার মৈত্র মনে করেন ঢেক্করী বর্দ্ধমান জেলায়। সন্ধ্যাকর নন্দী রচিত ‘রামচরিত মানস’ কাব্যগ্রন্থ থেকে জানা যায়, রাষ্ট্রবিপ্লবের সময়ে বরেন্দ্রভূমি পুণরুদ্ধারে যে সমস্ত রাজা রামপালকে সাহায্য করেছিলেন সৈন্যসামন্ত দিয়ে তাঁরা অধিকাংশই বঙ্গের পশ্চিম অঞ্চল বিশেষ করে রাঢ় অঞ্চলের। তাঁদের মধ্যে একজন ঢেক্করী প্রতাপ সিংহ। উড়িষ্যা - বাংলার সীমান্ত ও দক্ষিণ বিহার থেকে আরম্ভ করে মেদিনীপুর, হুগলী, মানভূম, বর্দ্ধমান, বীরভূম, রাজমহল পর্যন্ত এইসব সামন্ত রাজাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বাধীন রাজ্য বিস্তৃত ছিল। সেইসব সামন্ত রাজ্যের মধ্যে ঢেক্করী অন্যতম। সুতরাং ঢেক্করী আসামে হওয়া সম্ভব নয়। বর্দ্ধমানের ত্রিষষ্ঠি গড় – ঢেকুর ই সেই প্রাচীন ঢেক্করী। 
এই যুক্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন দুই দিকপাল ঐতিহাসিক হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ও অক্ষয় কুমার মৈত্র। ‘পশ্চিমবঙ্গ সংস্কৃতি’ র লেখক বিনয় ঘোষ ও এই একই মত পোষণ করেন। 
বীরভূম – বর্দ্ধমানের সীমান্তে ঢোকরা ত্রিষষ্ঠি গড়। প্রাচীন কাল থেকেই লোহার বিভিন্ন জিনিস বিশেষত অস্ত্র শস্ত্র নির্মাতা ‘ঢেকারু’ বা প্রচলিত কথ্য ভাষায় ‘ঢোকরা’ নামে এক জাতি ছিল। রাঢ় অঞ্চলে কিম্বা বর্তমান ঝারখন্ড, বিহার অঞ্চলে এখনও তাদের অস্তিত্ব আছে। এদের আরেক নাম লোহার। এই লোহার বা ঢোকরা বা ঢেকারু জাতির বসবাসের প্রাধান্যের জন্যই মনে হয় এই অঞ্চলের প্রাচীন নাম ছিল ঢেকুর বা ঢেক্করী। 
তাম্রশাসনে খোদিত আছে ধূর্ত ঘোষের পুত্র বাল ঘোষ ছিলেন যুদ্ধ ব্যবসায়ী এবং তিনি অনেক যুদ্ধে শত্রুদের পরাস্ত করেছিলেন। তাছাড়া যে কোনো যুগেই রাজ্য শাসনের জন্যেও অস্ত্রের প্রয়োজন। সুতরাং যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্র এই ঢেকারুরাই তৈরী করত এটা মেনে নেওয়া যেতে পারে।
তাম্রশাসনে খোদিত দিগ্য়া, সোদিকা এবং গাল্লিটিপ্যাক্ নামে যে গ্রামগুলির উল্লেখ করা হয়েছে ঐতিহাসিক হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের মতে বর্দ্ধমান জেলার গুসকরার উত্তরে দিঘা ও সোয়ারা নামের গ্রাম দুটি এবং কাছেই মঙ্গলকোট থানার গলিষ্ঠা বা গতিষ্ঠাই তাম্রশাসনে উল্লিখিত ওই সব গ্রাম।
রামগঞ্জ তাম্রশাসনে আরও বলা হয়েছে, ঢেকুরের রাজা ঈশ্বর ঘোষের কান্তি হার মানায় চন্দ্রের দ্যুতিকে। তিনি ছিলেন শৌর্যবীর্যে তুলনাহীন। মহামান্ডলিক ঈশ্বর ঘোষ তাঁর তাম্রশাসনে যাঁদের ওপরে আদেশ জারী করেছেন তাঁদের মধ্যে রাজন, রাজ্ঞী, রাজন্যক, রাজপুত্র, মহাকায়স্থ, দন্ডপাণিক, হট্টপতি, লেখক, মহাসামন্ত, শৌরাণিক প্রভৃতি রাজপুরুষের পরিচয় পাওয়া যায়। এত বিচিত্র রাজকর্মচারী, আমলা। অমাত্যের নাম সেই যুগে কোনো তাম্রশাসনে পাওয়া যায় না। এছাড়া হস্তী, অশ্ব, উষ্ট্র, গাভী, মহিষ, ছাগ, ভেড়া, খচ্চর প্রভৃতি জীবজন্তু তদারকির জন্য কর্মচারী নিযুক্ত ছিল সে উল্লেখও আছে সেখানে। তাছাড়াও সেই তাম্রশাসনে আছে নৌবাহিনী পরিচালনার জন্য উচ্চপদস্থ কর্মচারী নিযুক্তির কথা।

ঈশ্বর ঘোষ তথা ইছাই ঘোষ যে কোন সময়ে ঢেকুরের রাজা ছিলেন তা নিয়েও মতভেদ আছে। কোথাও সে সম্বন্ধে নির্দিষ্ট সাল তারিখের উল্লেখ নেই। এক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে ঐতিহাসিকদের অনুমানের মাধ্যমে এক পরিষ্কার চিত্র নির্মাণ ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিত মানসের টাকা ও খজুরবাহক মন্দির গাত্রে উৎকীর্ণ লিপি থেকে অনুমান করা যায় ঈশ্বর ঘোষ একাদশ শতকের পূর্ববর্তী কোনো সময়ে রাজত্ব করেছেন। ভারতের বিভিন্ন কোনায় তখন আছড়ে পড়ছে রাজেন্দ্র চোলের ভারত বিজয়ের প্রতাপ। আবার বিনয় ঘোষের মতে ঈশ্বর ঘোষ ছিলেন একাদশ শতকের সামন্তরাজা এবং মহীপালের সমসাময়িক। মহীপালের রাজত্বকালে বৈদেশিক মূলতঃ দাক্ষিণাত্যের রাজেন্দ্র চোলের আক্রমণে বঙ্গে যে রাজনৈতিক বিপর্যয় ঘটেছিল, সেই সুযোগেই ঈশ্বর ঘোষ বর্দ্ধমানের গোপভূমের বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল করে ঢেকুরে রাজধানী স্থাপন করেন।

রূপরাম চক্রবর্তী, ঘনরাম এবং মানিক গাঙ্গুলীর ধর্মমঙ্গল কাব্যের দৌলতে ঈশ্বর ঘোষের বা ইছাই ঘোষের নাম বাঙালীর কাছে বিশেষ পরিচিত। অবশ্য ধর্মমঙ্গল কাব্যে ইছাই ঘোষের পিতার নাম বলা হয়েছে সোম ঘোষ অথচ তাম্রশাসনে খোদিত আছে ঈশ্বর ঘোষ ধবল ঘোষের পুত্র। তাম্রশাসনের সঙ্গে মঙ্গলকাব্যের নামের মিল নাও থাকতে পারে কারন কুলপঞ্জী মিলিয়ে মঙ্গল কবিরা কাব্য লেখেন নি। তাছাড়া একাদশ শতাব্দীর ঐতিহাসিক কাহিনী কয়েকশো বছর লোকগাথা ও লোককথা হয়ে অবশেষে স্থান পেয়েছে ধর্মমঙ্গল কাব্যে। সুতরাং এতে বহুল পরিবর্তন হতেই পারে। 

ধর্মমঙ্গল কাব্যে আছে ইছাই ঘোষ কর্ণসেনের পুত্র লাউসেনের সঙ্গে যুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন। এই নিবন্ধের সঙ্গে প্রদত্ত ছবিতে যে বিশাল শিবমন্দির দেখা যাচ্ছে স্থানীয় ভাষায় তার নাম ইছাই ঘোষের ‘দেউল’, তার পাশেই অজয় নদের তীরে নাকি এই যুদ্ধ হয়েছিল বলে সেখানকার সাধারণ অধিবাসীরা বলেন। কর্ণসেন ছিলেন মেদিনীপুরের কোনো এক অঞ্চলের সামন্ত রাজা। তাঁর সেনাপতি ছিলেন ডোম জাতি সম্ভূত কালুবীর। এই কালুও সেই যুদ্ধে নিহত হন। ইছাই ঘোষের দেউল অজয় নদের দক্ষিণ তীরে অবস্থিত। অজয়ের উত্তর তীরে ‘লাউসেনতলা’ নামে এক গ্রাম আছে। স্থানীয় প্রবাদ লাউসেন এই গ্রামেই তাঁর সৈন্য শিবির স্থাপন করেছিলেন। এখনো ডোম জাতির মানুষেরা বহু দূর দূর অঞ্চল থেকে প্রতি বছর ১৩ই বৈশাখ তারিখে এসে তাঁদের স্বজাতি কালুবীরের পুজো করেন। ইছাই ঘোষ তথা ঈশ্বর ঘোষের সঙ্গে লাউসেনের যেখানে যুদ্ধ হয়েছিল সেই জায়গা অজয়ের দক্ষিণ তীরে, যার বর্তমান নাম ‘কাঁদুনে ডাঙা’। স্থানীয় লোকেরা সেই জায়গা দেখিয়ে আজও করুন সুরে গায় –

“শনিবার সপ্তমী সামনে বারবেলা।
আজি রণে যাইওনা ইছাই গোয়ালা”।।

ইছাই ঘোষ বা ঈশ্বর ঘোষের জাতি বা গোষ্ঠীর নির্ণয় করা অসাধ্য। ইছাই ঘোষ সম্পর্কে সঠিক ঐতিহাসিক তথ্য পাওয়া যায় না। ধর্মমঙ্গল কাব্য, প্রবাদ ও স্থানীয় জনশ্রুতির উপর নির্ভর করে কিছু তথ্য আহরণ করা হয়, বাকিটা অনুমান নির্ভর। তিনি জাতিতে গোপ (গোয়ালা) নাকি সদগোপ (চাষী) ছিলেন তা নিয়ে যথেষ্ট মতবিরোধ আছে। দুই গোষ্ঠীই ইছাই ঘোষকে নিজেদের ঘোষ্ঠীভূত বলে দাবী করেন। 
ধর্মমঙ্গলে তাঁকে বলা হয়েছে ‘ইছাই গোয়ালা’। এ ছাড়াও তাম্রশাসনে বংশ পরিচয় প্রসঙ্গে উল্লেখিত হয়েছে তিনি ছিলেন ‘ঘোষ কুলোদ্ভব’। অপরদিকে ওই একই সময়ে নিকটবর্তী যেসব সামন্ত রাজারা ছিলেন তাঁরা সবাই জাতিতে সদগোপ। এমনও হতে পারে সেই সময়ে জাতিভেদ এতটাই প্রবল ছিল যে সেই যুদ্ধের ভিত্তি ছিল এই গোপ বনাম সদগোপ বিদ্বেষ। রাজা ইছাই ঘোষ ও লাউসেনের কাহিনী ছাড়াও ধর্মমঙ্গলের আরও একটি কাহিনী আছে। তা হল রাজা হরিশ্চন্দ্রের কাহিনী। যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি মনে করেন হরিশ্চন্দ্র বর্দ্ধমান জেলার অন্তর্গত অমরাগড়ের রাজা ছিলেন। অমরাগড়ের রাজারা ছিলেন জাতিতে সদগোপ এবং একই সময়ে পাশাপাশি কাঁকসা, ভাল্কী, মাচান, দিকনগর, ওরগ্রাম প্রভৃতি অঞ্চলের সামন্ত রাজারা জাতিতে ছিলেন সদগোপ। অবশ্য এখানে বলে রাখা ভালো, এর কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই, কুলপঞ্জীর ওপর নির্ভর করে অনুমান মাত্র। অতীতে এই গোপ এবং সদগোপেরা একই গোষ্ঠীভূক্ত ছিলেন। গোপ – সদগোপরাই বঙ্গের পশুপালন ও কৃষি সভ্যতার স্রষ্টা ও অন্যতম ধারক ও বাহক। কৃষির স্তরীয় উন্নতির সাথে সাথে সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে এসে কেউ কেউ দলপতি, গোষ্ঠীপতি, কৌমপতি থেকে সামন্ত রাজা হয়েছিলেন। গোপভূমের এই সব রাজাদের মধ্যে মহামান্ডলিক ঈশ্বর ঘোষ প্রভাবশালী ছিলেন এবং সম্পূর্ণ স্বাধীন ঘোষণা করে রাজ্যের সীমানা অনেক দূর পর্যন্ত প্রসারিত করেছিলেন।

ইছাই ঘোষ শক্তির উপাসক ছিলেন। ঢেক্কুর ছিল বৌদ্ধতান্ত্রিক পীঠস্থান। পালযুগের রাজারা ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। অথচ এই সামন্ত রাজা ইছাই ঘোষ ছিলেন হিন্দু তন্ত্রবাদী। হয়তো তিনি তান্ত্রিক সাধকও ছিলেন। এবং ধর্মভিত্তিক তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থায় হয়তো এই কারনেই নিজের সামন্তরাজকে স্বাধীন ঘোষণা করেছিলেন। দুর্গাপুরের পাশেই অজয় নদের দক্ষিণ তীরে গড়জঙ্গল, যা একদিকে দলমা পাহাড় অন্যদিকে মেদিনীপুর পর্যন্ত বিস্তৃত। গড় জঙ্গল নামকরনের কারন সেখানে বহু যুগ আগে দুর্গ ছিল। অনুমান সেই দুর্গ ইছাই ঘোষ বা ঈশ্বর ঘোষের নির্মিত। স্থানীয় মানুষেরা একে বলেন ইছাই ঘোষের গড় বা শ্যামারূপার গড়। শ্যামারূপা দুর্গার আরেক রূপ, ইছাই ঘোষ ছিলেন তাঁর উপাসক। শ্যামারূপার গড়ের ভগ্নাবশেষ আজও সেই জঙ্গলের মধ্যে দেখা যায়। সেখানে আজও আছে শ্যামারূপার মন্দির, যেখানে বিপুল ধুমধাম করে এখনো দুর্গাপুজো হয়। মন্দিরের আসল মূর্তি চুরি হয়ে গেছে। বর্তমান মূর্তি কোনো এক সাধক বেনারস থেকে এনেছিলেন বলে জনশ্রুতি। এর কাছেই পোড়ামাটির ইঁট নির্মিত বিশাল রেখ দেউলটি আসলে শিব মন্দির। সেখানে সেই প্রাচীন যুগের বিশাল শিবলিঙ্গ আজও দেখা যায়। এই মন্দিরই ইছাই ঘোষের দেউল নামে পরিচিত। মন্দির স্থাপত্যে এই ইছাই ঘোষের দেউল বা তার নিকটবর্তী রাঢ়েশ্বর শিব মন্দির নির্মাণে দক্ষিণী স্থাপত্য ছাপ স্পষ্ট। সম্ভবতঃ রাজেন্দ্র চোলের বঙ্গ বিজয়ের প্রভাব বহন করে চলেছে এইসব প্রাচীন স্থাপত্য। এই দেউল নির্মাণ নিয়েও দ্বিমত আছে। একদল ঐতিহাসিক মনে করেন এটি ঈশ্বর ঘোষ তথা ইছাই ঘোষই নির্মাণ করেছিলেন, অন্যদল অনুমান করেন গোপভূমের সদগোপ রাজারা ইছাই ঘোষের নামটি স্মরণীয় করে রাখার জন্যি পরবর্তী কালে এই দেউল নির্মাণ করেন। তাঁদের অনুমান এটি পঞ্চদশ শতকের পরেই নির্মিত হয়েছিল।
ইছাই ঘোষ তথা ঈশ্বর ঘোষের কাল, শাসন, বিস্তৃতি বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য বা প্রমাণ খুব বেশী নেই। কিন্তু রামগঞ্জে প্রাপ্ত তাম্রশাসনের ঐতিহাসিক মূল্য অসীম, কারন তা পালযুগের এক অবর্ণিত অধ্যায়ের আবরণ উন্মোচিত করেছে। আর এর জন্যই রাঢ়বঙ্গ তথা রাঢ়ভূম বাংলা ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করতে পেরেছে। 

সর্বশেষ সংবাদ