বাংলা ফন্ট

এবারের স্বাধীনতা পুরস্কার ও শহীদ ন ম নাজমুল আহসান

18-02-2017
আলম তালুকদার

এবারের স্বাধীনতা পুরস্কার ও শহীদ ন ম নাজমুল আহসান


সদাশয় সরকার এবারে যাঁদের নাম স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য ঘোষনা করেছেন তাঁদের মধ্যে আমাদের পরিচিত এক শহীদ মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের নাম দেখে বেদনামিশ্রিত আনন্দ নিয়ে সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। বেদনার কথাটা আগে বলি। শহীদের মা বাবা যতদিন তাঁদের পুত্রহারা যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে ছিলেন ততদিন এ রকম রাষ্ট্রীয়স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। তাঁরা বেঁচে থাকলে এই খবরটা তাদের শোক কিছুটা হলেও লাঘব হতে পারতো। পুরস্কারে আনন্দ উদযাপনের বিষয় কিছুটা হলেও থাকে।

যারা এ নামটির সাথে একেবারেই অপরিচিত তাদের জন্য আমার নিবেদন। শহীদ নাজমুল আহসানের জন্ম ১৯৪৯ সালের ২০ জানুয়ারি, আর শহীদ হবার তারিখ ১৯৭১ সালের ০৬ জুলাই। শহীদ নাজমুল একজন মেধাবী ছাত্র ছিলেন। শিক্ষক পিতা সেকান্দর আলী তালুকদারের প্রথম সন্তান ছিলেন। সবার আদরের ধন। যেমন ছিল তার চেহারা তেমন ছিল তার ব্যবহার আচার আচরণ। এলাকায় অসম্ভম জনপ্রিয় ছিলেন। তিনি ফাইভে ও এইটে বৃত্তি লাভ করেছিলেন। ১৯৬৫ সালে তখনকার দিনের পাড়াগা হতে প্রথম বিভাগে দুটি লেটার সহ কৃতিত্বের  সাথে এস এস সি পাশ করেন। তারপর তিনি তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ ভর্তি হন। ফাইনাল ইয়ার ১৯৭১। তখনকার দিনে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে খুবই পরিচিত মুখ, সবার প্রিয় নাজমুল ভাই। কোথায় তিনি ছিলেন না। নাটক লেখায়, গল্প লেখায়, অভিনয়ে, খেলাধুলায়, তর্কে, পরীক্ষায় সব জায়গায় তিনি অনন্য একক। তার বাচন ভঙ্গি, তার কথার মুগ্ধতায় শ্রেতারা বেসামাল। অসাধারণ আকষর্ণীয় ছিল তার ব্যক্তিত্ব। আর দেশ পেম? স্বাধীন দেশের জন্য তিনি তার অনুসারীদের নিয়ে ভারতে গিয়ে সফল প্রশিক্ষণ নিয়ে বেশ কয়েকটি সফল অপারেসন করে ভারতের মিত্রবাহিনীর দৃস্টি আকর্ষণ করনে। তিনি মা বাবার প্রথম সন্তান,মেধাবী, আকর্ষণীয় ব্যক্তি আগামী দিনের আশা ভরসা। মা বাবা তাকে নিষেধ করেনি। দেশের জন্য তাকে যুদ্ধ করার সাহস দিয়েছেন। তিনি মা বাবার জন্য স্বধীন দেশ উপহার দিয়ে পরকালে চলে গেলেন। কোনটা বড়? মা বাবা নাকি দেশ? হা, শহীদ নাজমুলের কাছে দেশ আগে পড়ে অন্য সব।

শেরপুর জেলার অনঅগ্রসর একটা থানার নাম নালিতাবাড়ি। কোনো পাকা রাস্তা ছিল না কাঁচা রাস্তা তাও আবার খনা-খন্দে ভরা। শেরপুর হতে তিনানি বাজারের দিকে যে রাস্তা সেটা শেরপুর সদর এলাকা। এ রাস্তা দিয়ে পাকি বাহিনী সীমান্ত এলাকায় গোলা বারুদ প্রেরণ করে থাকে। সীমান্ত এলাকার সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে হবে। কাটাখালি ব্রিজ উপরে ফেলতে হবে। এর আগে কয়েকটা কোম্পানি ব্যর্থ হয়েছে। কে করবে এই মহান কাজটি? খেঁজে খোঁজে বের করা হলো নাজমুল কোম্পানিকে। মিত্র বাহিনির কমন্ডার নাজমুলকে ডাকলেন। অপারেসনের গুরুত্ব বললেন। তুমি কী এই গুরুদায়িত্ব সফল ভাবে শেষ করতে পারবে? অকুতভয় কমান্ডারের জীবনে ব্যর্থতা বলতে কিছু নেই। সে একজন পেশাদার সৈনিকের মতো বললেন আমি অবশ্যই পারব। দেখ এর আগে কয়েকজন কমান্ডার পারেনি। তাতে সমস্যা নেই। নাজমুল পারেনা এমন কোনো অপারেসন নেই। হা, তার জীবনে পরিচালিত কোনো অপারেসন ব্যর্থ হয়নি। কাটাখালি অপারেসনও ব্যর্থ হয়নি। তবে সে মায়ের কোলে জীবিত অবস্থায় ফিরতে ব্যর্থ হয়েছিল। কয়েকদিন কয়েকরাত হেঁটে হেঁটে ভারত সীমান্ত হয়ে বর্ষার সময়ে কাদা জলে ভিজতে ভিজতে কাটাখালি। কয়েক ঘণ্টার মামলা জীবন মরণ পরীক্ষা। সাথে ৫৩ জন সহযোদ্ধা। প্রায় সবাই তার এলাকার। সাথে আছে চাচাতো ভাই, চাচা, জুনিয়ার সিনিয়ার ভাইরা। কাটাখালির ব্রিজ মাঝখানে উড়িয়ে দিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে পাশেই জলে ভাসা এক গ্রাম। গ্রামের নাম রাঙ্গামাটিয়া। পরিশ্রান্ত মুক্তিরা একটু বিশ্রামের আশায় এক বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এই বিশ্রাম নেওয়াটাই কাল হলো । গ্রামের রাজাকাররা ঠিক জায়গায় খবর দিয়েছিল॥ ফলে পুরা কোম্পানি ঘেরাও হয়ে গেল। একমাত্র বিল,ভরা পানির বিল ছাড়া পালানোর কোনো রাস্তা নেই। সবাইকে পানিতে নেমে যাবার হুকুম হলো খাওয়া আর ভাগ্যে হলো না। মার মার কাট কাট। সবাইকে বিলে নামিয়ে দিয়ে শেষে তিনি। তিনদিক হতে গুলি আসছে। সামনে অতল জলের বিশাল বিল। ডিফেন্স ফায়ার দিতে দিতে নিরাপদে ফিরে যাবার আকুতি ছাড়া আর কিছু নেই্। এর মধ্যে চাচাতো ভাই মোফাজ্জল গুলিবিদ্ধ, তার দিকে যেতেই আরেক পাশে ভাতিজা আলী হোসেন গুলিবিদ্ধ। আরেক পাশে গণি মাষ্টার গুলিবিদ্ধ। কমান্ডার নাজমুল কাকে বাঁচাবে? সে নিরাপদে জীবন বাঁচানোর চেষ্টা না করে সহযোদ্ধাদের বাঁচানোর চেষ্টা করতে গিয়ে একসময় নিজেই শত্রু পক্ষের গুলিতে পানিতে ডুবে গিয়ে প্রাণ হারায়। এই ভাবে তিনটি তাজা প্রাণ রাংগামাটিয়ার বিলে জলের তলে তলিয়ে গেল। মা বাবা হারালো তাদের আদরের প্রথম সন্তান। দেশ হারালো একজন কৃতি সন্তান। আমরা হারালাম একজন দরদী মানুষ। ঐ রাংগামাটিয়া জলের সাথে তিনজন মুক্তিযোদ্ধার রক্ত মিশে আরো রাংগা হয়ে গেল। মায়ের মন ভেংগে গেল। সহযোদ্ধারা একজন প্রকৃত কমান্ডার হারালেন। 

পানি নেমে যাবার পর তার ছোট বাই কামরুল বিলে লাশের বদলে হাড়-হাড্ডি নিয়ে কবরস্থ করেছিল। তারপরের ইতিহাস সবার জানা। দেশ স্বাধীন হলো। জাতির পিতা ফিরে আসলেন। নালিতাবাড়ির জনগণ নাজমুল আহসানের স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য একটি কলেজ স্থাপন করলেন। কলেজের নাম হলো ”শহীদ নাজমুল আহসান কলেজ”। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের কৃতি ছাত্রকে অমর রাখার জন্য স্থাপন করলেন”শহীদ নাজমুল আহসান হল” শহীদ নাজমুল আহসানকে নিয়ে তাঁর বন্ধুবান্ধবরা বিভিন্ন সময়ে ম্যাগাজিনে পত্র পত্রিকায় বিচ্ছিন্ন ভাবে লেখালেখি করেছেন। কিন্তু তাঁর যে প্রতিভা ছিল স্বল্প সময়ে তিনি যে সৃষ্টি রেখে গেছেন তার সঠিক মূল্যায়ণ হয়নি বলে আমাদের ধারণা। তাঁর লেখা কিছু অসাধারণ আধুনিক গল্প আছে, নাটক আছে যা গবেষণার বিষয়বস্তু হতে পারে। তবে কিছু যে হয়নি তা নয়। তার পরিবারের সদস্যদের উদ্যোগে ১৯৯৯ সালে একটি স্বারক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। যা সরকার ক্রয় করে ৬০০টি কলেজে বিতরণ করেছিল। গত বছর ঐ এলাকার আরেক কৃতিসন্তান জনাব আবদুস সামাদ ফারুক ”জল জোছনায় নাজমুল” এই নামে একটি গবেষণাধর্মী মূল্যবান গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। শহীদ নাজমুল আহসানকে নিয়ে কবি শামসুর রাহমান কবিতা লিখেছিলেন। ছড়াকার সুকুমার বড়–য়া একটি ছড়া লিখেছেন। পাঠকদের জন্য তুলে দিচ্ছি।

”বাংলার মাটি রক্ষা করতে বাঁচাতে একটি ফুল
তিরিশ লক্ষ শহীদের মাঝে আরো এক নাজমুল।
দু যুগ পেরিয়ে তিনযুগ হবে স্বাধীন বাংলা হলো
সর্বকালের শ্রেষ্ঠ তোমরা ইতিহাসে কথা বলো।
এত বড় দাম না দিলে হতোনা বাংলাদেশ 
তোমাদের সেই দানের মহিমা কখনো হবেনা শেষ।
নবপ্রজন্ম সালাম জানিয়ে মিনারে রাখবে ফুল
তিরিশ লক্ষ শহীদের সাথে তুমি এক নাজমুল”।

লেখক: একজন অবশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও শিশুসাহিত্যিক

সর্বশেষ সংবাদ