বাংলা ফন্ট

একটি ‍আত্মহত্যা ‍এবং ‍আমরা

09-02-2017
মাহবুবা মিলি

 একটি ‍আত্মহত্যা ‍এবং ‍আমরা একটা পণ্য বাজারে ততদিনই টিকে থাকবে, যতদিন ক্রেতাদের কাছে সেই পণ্যের চাহিদা থাকবে।খেয়াল করবেন, আমি লিখেছি যতদিন চাহিদা থাকবে। তার মানে, চাহিদা পরিবর্তনশীল, যদিও এটা আমরা সবাই জানি। অর্থনীতিতে আমরা চাহিদার হ্রাস-বৃদ্ধি,চাহিদার স্থিতিস্থাপকতা, ভোগের সাথে চাহিদার সম্পর্ক, কতো কিছুই না পড়েছি। আর অল্প জ্ঞান নিয়ে বোঝার চেষ্টা করেছি, যেকোনো ভোগ্যপণ্যের চাহিদা কখনোই স্থির থাকেনা।

সম্প্রতি মডেল জ্যাকুলিন মিথিলার আত্নহত্যার নিউজ, তাকে নিয়ে বাজারে রমরমা গল্প, এবং তার কাস্টমারদের তাকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য এসব দেখতে -দেখতে এবং শুনতে-শুনতে কেন যেন পন্য আর চাহিদার কথা মাথায় চলে আসলো। যারা জ্যাকুলিন মিথিলাকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করছেন, তাদেরকে আমি কাস্টমার ছাড়া আর অন্যকোনো উপাধি দিতে পারলাম না, তার জন্যে দুঃখিত। কারণ কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যকারীরা সবাই জ্যাকুলিন মিথিলাকে সরাসরি ভোগ করার সু্যোগ না পেলেও, কল্পনায় তাকে ভোগ করেছেন, চোখ দিয়ে ভোগ করেছেন এবং তার ফেইসবুক লাইভ-এর দর্শক ছিলেন, তাহলে আপনাদের আমি কাস্টমার না বলে আর কী বলতে পারি?

যাই হোক, ভোগ্যপণ্য আর চাহিদার কথা এই কারণেই মাথায় এসেছিলো, কারণ এই জ্যাকুলিন মিথিলাও এই সমাজে একটি ভোগ্যপণ্য ছিলো।তার মতো করে যারা জীবন বেছে নিতে চেয়েছে বা নিয়েছে, সেই নায়লা নাঈম, সানি লিউন, মিয়া খলিফা এরা সবাই আমাদের কাছে এক একটি পণ্য।বর্তমানে এদের বাজার দর খুব ভালো বা শুধু ভালো, কিন্তু আগামী কয়েকবছর পরে এদের বাজার চাহিদাতেও বিশাল পরিবর্তন আসবে, তখন হয়তো অন্যকোনো নায়লা নাঈম, জ্যাকুলিন মিথিলারা বাজার দখল করে নেবে।মার্কেটিং আমরা পণ্যের জীবন চক্র পড়েছি, সেখানে জেনেছি,একটা নতুন পন্য বাজারে প্রবেশ করার পর কখন মুনাফা অর্জন করতে শুরু করবে, কখন সর্বোচ্চ মুনাফা লাভ করবে, কখন সেই পন্যের বাজারে ধস নামবে, এবং কখন পন্যটি বাজার থেকে হারিয়ে যাবে।ঠিক একইভাবে আমার এই জ্যাকুলিন মিথিলা, নায়লা নাঈমদের ক্ষেত্রেও মনে হয়। অর্থ্যাৎ, এরা একটা নতুন পন্য হিসেবে বাজারে প্রবেশ করেছিলো এবং সময়ের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে তারা বাজার থেকে হারিয়ে যাবে।একটা রক্ত-মাংসের মানুষকে পন্য বলতে আমার সবসময়ই খারাপ লাগে, তারপরেও কখনো কখনো বোঝার সুবিধার্থে বলি।

আমরা যেমন ভাত-মাছ খাই, আইস্ক্রিম -চকলেট খাই,পিজ্বা-বার্গার খাই, এগুলো খাবার জিনিস বলেই আমরা খাই,কিন্তু একটা রক্ত-মাংসের মানুষ কে কী আমরা ভাত-মাছ এর মতো খেতে পারি? এই লাইনটা একটু কেমন যেনো লাগছেনা? কিন্তু আমাদের ভোগবাদী সমাজ ব্যবস্থা এই মানুষদের আজ ভোগ্যপণ্য বানিয়ে বাজারে ছেড়ে দিয়েছে। আর সেই কাতারে আজ জ্যাকুলিন মিথিলারা এসে পড়েছে।এদেরকে হয়তো আমরা ভাত-মাছ এর মতো না খেয়ে একটু অন্যভাবে খাই, এই যা তফাৎ। যেহেতু কাস্টমার থাকে বলেই বাজারে পন্য টিকে থাকে, সেহেতু আমি বলতেই পারি, যেই জ্যাকুলিন মিথিলা আত্নহত্যা করলো, এখন যারা তাকে নিয়ে রমরমা গল্পের পসরা সাজিয়ে বসে আছেন, সেই জ্যাকুলিন মিথিলার কাস্টমার কারা? নিশ্চয় আপনারা, মানে পুরুষেরা। আর যাই হোক, জ্যাকুলিন মিথিলার নিশ্চয় মেয়ে কাস্টমার ছিলোনা। তো আপনাদের মতো পুরুষ কাস্টমাররা অলিতে-গলিতে ঘাপটি মেরে থাকে বলেই, জ্যাকুলিন রা বাজারে টিকে থাকে।দেশে যত পতিতালয় আছে,যেই পতিতারা টিকে আছে, তাদের কাস্টমার কারা? কাদের জন্যে তারা টিকে আছে, পুরুষ দের জন্যে তো? যারা কিনা আবার আপনার, আমার ঘরের বাপ-ভাই-স্বামী।যেই নারীটি বেঁচে থাকতে আপনারা বিনোদন নিয়েছেন, তার শরীরের প্রতিটি ভাঁজে আনন্দ খুঁজেছেন, সেই নারীটি আজ মরে যাওয়ার পর, আপনারা বেশ্যা -মাগী বলে গালি দিচ্ছেন। এসব কারনেই আমি আশে-পাশে পুরুষ দেখি, মানুষ পুরুষ তেমন দেখিনা।

ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম/এইচএমএল


সর্বশেষ সংবাদ