বাংলা ফন্ট

ইভিএম কার স্বার্থে, না বাণিজ্য?

12-09-2018
লোকমান তাজ

ইভিএম কার স্বার্থে, না বাণিজ্য?
সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সম্প্রতি রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে কোনো আলোচনা ছাড়াই হঠাৎ করে নির্বাচন কমিশন (ইসি) এ নির্বাচনে ইভিএম (ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন) ব্যবহারে অতি উৎসাহী হয়ে উঠেছে। আর তা করায় বাধা দূর করতে আরপিও (রিপ্রেজেন্টেশন অব পিপল অর্ডার) সংশোধনের কথা বলছে ইসি। যদিও এর আগে নির্বাচন কমিশন বলেছিল সব দল একমত না হলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হবে না। ফলে ইভিএম নিয়ে বিতর্ক প্রায় থেমেই গিয়েছিল। কিন্তু এখন দেশে এ নিয়ে আবার ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

প্রশ্ন উঠেছে- হঠাৎ করে নির্বাচন কমিশন কার স্বার্থে এ ধরনের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে। এই ক’দিন গণমাধ্যমে ইভিএম ব্যবহারের বিরুদ্ধে যেভাবে সমালোচনা এসেছে তাতে মনে হয়েছিল নির্বাচন কমিশন শিগগিরই ইভিএম ব্যবহার থেকে সরে আসার ঘোষণা দেবে। কিন্তু কার্যত ঘটেছে এর ঠিক উল্টো। গত ৩০ আগস্ট নির্বাচন কমিশন এ ব্যাপারে সর্বশেষ বৈঠক করে। বৈঠকে খোদ নির্বাচন কমিশনাররা ইভিএম ব্যবহারে একমত হতে না পারলেও শেষ পর্যন্ত মতানৈক্যের মধ্যেই কমিশন আগামী নির্বাচনে যাতে ইভিএম ব্যবহার করা যায়, সে জন্য আরপিও সংশোধনের পক্ষেই সিদ্ধান্ত নেয়। এখন সে প্রয়োজনে নির্বাচন কমিশন আরপিও সংশোধনের উদ্যোগ নেবে বলে বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়।
কিন্তু আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার পক্ষে সাতটি বিষয় তুলে ধরে সভায় আপত্তি (নোট অব ডিসেন্ট) লিখিত আকারে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালকদার। সভা শুরু হওয়ার আধঘণ্টার মধ্যে তিনি এই আপত্তির কথা জানিয়ে সভা বর্জন করে চলে যান। বৈঠকে ইভিএম প্রশ্নে কমিশনের অন্য কমিশনারদের সাথে দ্বিমত পোষণ করে মাহবুব তালুকদার লিখিত বক্তব্যে তার আপত্তির বিভিন্ন কারণ তুলে ধরেন। লিখিত বক্তব্যে তিনি যেসব মূল বিষয় উল্লেখ করেন এর মধ্যে রয়েছে : রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতার ভিত্তিতে ইভিএম ব্যবহারের সম্ভাবনা না থাকা, বিনা দরপত্রে কেনা ইভিএমে কারিগরি পরীক্ষার ঘাটতি, ইভিএম ব্যবহারে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা, ইভিএম ব্যবহার হলে আদালতে মামলার সম্ভাবনা, ইভিএম ব্যবহারে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব, ইভিএম নিয়ে ভোটারদের সন্দেহ ও জনভ্যস্ততা, জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারে আরো সময়ের প্রয়োজন।

ইভিএম সম্পর্কে বিএনপির অভিজ্ঞতা না থাকলেও বিরোধিতা করে যাচ্ছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের যেকোনো সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে হবে, বিষয়টা অনেকটা এ ধরনের। অবশ্য বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শুধু বিএনপি নয়, প্রায় সব রাজনৈতিক দলের অবস্থান আসলে এটাই।

তবে এই ইস্যুতে বিএনপির ‘পজিটিভ দিক’ হচ্ছে- জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি ইভিএম চায় না সেটা যেভাবেই হোক তারা এ বিষয়ে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে। এখন প্রশ্ন হলো- বিএনপি যেহেতু জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম চায় না, তাহলে এই পদ্ধতিতে নির্বাচন আসলে কে চায়? সরকার নাকি ইলেকশন কমিশন?

এসব প্রশ্নের জবাব উঠে এসেছে আওয়ামী লীগের নেতাদের কথায়। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন: 'জাতীয় নির্বাচনে ইভিএমের ব্যবহার আওয়ামী লীগের নতুন কোনো দাবি নয়। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপে আমরা ইভিএম ব্যবহারের দাবি জানিয়েছিলাম। আমরা আমাদের দাবিতে এখনও অটল। তারপরও এ বিষয়ে ইসি যে সিদ্ধান্ত নেবে তা সরকার মেনে নিবে।'

আওয়ামী লীগের আরও কয়েকজন সিনিয়র নেতা এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তাদেরই একজন দলটির উপদেষ্টাম-লীর সদস্য এবং বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। তার দাবি: ‘ইভিএম ব্যবহার সরকারের নয়, ইসির সিদ্ধান্ত। সিলেট ও রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইভিএম ব্যবহার করা হয়। এছাড়া পৃথিবীর এমন একটি দেশের নাম পাওয়া যাবে না, যেখানে নির্বাচন হওয়ার পর বিতর্ক ওঠেনি। এটি একটি স্বাভাবিক ঘটনা। তবে বিএনপি যেকোনো ভালো কাজেরই বিরোধিতা করে, সমালোচনা করে।’

ইভিএম ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রীকেও প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে। বিমসটেক’র চতুর্থ শীর্ষ সম্মেলন শেষে ঢাকায় ফিরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনের প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী বলেন: ‘আমরা চাই প্রযুক্তির উন্নয়নের জন্য ইভিএমের ব্যবহার শুরু হোক। এটা ঠিক যে টেকনোলজি যেমন সুবিধা দেয়, তেমনি অসুবিধাও আছে। তবে তাড়াহুড়া করে এটাকে চাপিয়ে দেয়া যাবে না।’

প্রধানমন্ত্রীর কথায় স্পষ্ট যে, তিনি বা তার দল আওয়ামী লীগ ইভিএম চাইলেও এখনই জনগণের ওপর এই প্রযুক্তি চাপিয়ে দিতে চান না। এরই প্রতিফলন দেখা গেছে ইসির আরপিও সংক্রান্ত বৈঠকে। তারাও আগামী জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি। তাহলে এখন প্রশ্ন হচ্ছে- আগামী নির্বাচনে যদি ইভিএম বিষয়ে সিদ্ধান্ত না হয়ে থাকে, তাহলে তড়িঘড়ি করে ইভিএম কেনার জন্য প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে কেন? এই টাকা কোথা থেকে আসবে সেটাও এখনও সেভাবে বলা হচ্ছে না!

দুঃখজনক হলেও কঠিন বাস্তবতায় আমরা বছরের পর দেখে আসছি, সরকারি কেনাকাটা মানেই সীমাহীন দুর্নীতি এবং অনিয়মের ঘটনা ঘটে। প্রায় চার হাজার কোটি টাকার এমন একটি সিদ্ধান্তহীন প্রজেক্টে যে এমনটা ঘটবে না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরং এখানে দুর্নীতি এবং লুটপাটের আশঙ্কা আরও বেশি। কারণ, এই প্রজেক্ট এমন সময়ে হাতে নেওয়া হয়েছে, যখন আওয়ামী লীগ সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদের সময় একেবারে শেষ পর্যায়ে, এমনকি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদেও পড়তে পারে।

ইভিএম এর বিষয়টি আওয়ামী লীগ নির্বাচন কমিশনের দিকে ঠেলে দিলেও সিইসি কে এম নূরুল হুদা ঠেলে দিয়েছেন সরকারের দিকে। তিনি বলেছেন: ‘সরকার চাইলে জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হবে।’ অর্থাৎ এখানে কোনো ধরনের অনিয়ম হলে দায় সম্পূর্ণ সরকারের। একইসঙ্গে তিনি আরও যেসব পয়েন্টে কথা বলেছেন, সেগুলোর মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই বলা যায়, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এত কম সময়ে ইভিএম পরিচালনার সক্ষমতা ও যথাযথ প্রশিক্ষণ ইসির সংশ্লিষ্টদের হবে না। আর রাজনৈতিক দলগুলোও এ বিষয়ে একমত না। এখন সরকার এবং ইলেকশন কমিশনকে পরিষ্কারভাবে বলতে হবে ইভিএম আসলে কে চায়।

আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে শীর্ষস্থানীয় দেশ জার্মানির ফেডারেল কোর্ট নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারকে সংবিধানবিরোধী বলে রায় দিয়েছেন-এমন একটি সংবাদ ছাপা হয়েছে। ভারতের আসন্ন নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে কংগ্রেসসহ সাতটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দল। বিষয়গুলো ভাবায়।

যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের রায় হ্যাকিং করে পাল্টে ফেলা হয়েছিল বলে ডেমোক্র্যাট শিবিরের অভিযোগ ছিল। সন্দেহের তির ছিল রাশিয়ার বিরুদ্ধে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন বলেছেন, চীনা হ্যাকাররা এ কাজ করেছে। জানা গেছে, আমাদের ইভিএম নাকি কেনা হবে চীন বা হংকং থেকে। এমনিতেই নির্বাচন-প্রক্রিয়ায় জনগণের আস্থায় চিড় ধরেছে। তার ওপর এই হ্যাকিংভীতি। হ্যাকাররা যদি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার সরিয়ে নিতে পারে, তাহলে ইভিএম হ্যাক করে ভোটের ফলাফল পাল্টে দেবে না, এর কী নিশ্চয়তা আছে? এই প্রশ্নগুলোর সদুত্তর পাওয়া খুবই জরুরি।

এছাড়া এখন কেনা ইভিএম মেশিন দিয়ে ভবিষ্যতে নির্বাচন পরিচালনা করা যাবে না। কারণ এখানে রক্ষণাবেক্ষণের বিষয় রয়েছে যেটা ইসির পক্ষে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে না। তাই প্রায় চার হাজার কোটির এই প্রজেক্টের নামে যেন জনগণের টাকা হরিলুট বা জলে ঢালা না হয়, সে বিষয়ে সরকার এবং ইলেকশন কমিশনকে আরও ভাবতে হবে।


সর্বশেষ সংবাদ