বাংলা ফন্ট

ভারতীয় বাঙালী এবং ২১ শে ফেব্রুয়ারী

21-02-2018
পার্থ বসু

ভারতীয় বাঙালী এবং ২১ শে ফেব্রুয়ারী
আসামে এবং মহারাষ্ট্রেও,রাজস্থানে এবং নয়ডায় যারা বাস করেন পরিযায়ী বাঙালী শ্রমিক, এমনকি ভূমিপুত্র তারা কি বাঙালী? মানে ভারতীয় বাঙালী? বাংলা বললেই বাংলাদেশী এই সন্দেহ আর হুমকি সহ্য করছে কারা? প্রাণ বিপন্ন।রুজি বিপন্ন।সত্ত্বা বিপন্ন।জাতিসত্ত্বা।
সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালী মুসলমান পাকিস্তান গঠন করেছিলেন স্বাধিকারের প্রশ্নে।ধর্মের প্রশ্নে বিভাজনের গলদ তারা শুধরে নিলেন ভাষার প্রশ্নে সংহত হয়ে।ভারত ভূখণ্ডে অবশিষ্ট যে বাংলা সে কিন্তু কিছুই অর্জন করে নি।গত সত্তর বছরে তার ভাষা ক্রমশ প্রান্তিক।তার পরিচয় ছায়াচ্ছন্ন।সে ক্রমশ হিন্দুস্থান হমারা।তার স্তোক একটি জাতীয় সংগীত।জনগণমন।যদিও সরকারী দাবী গানটি হিন্দীতে আচমন করে শুদ্ধু হয়েছে।হিন্দী ভাষ্যটি রাষ্ট্র অনুমোদিত।উচ্চারণ জানাগাণামানা।
আর একটি জাতীয় স্তোত্র বন্দেমাতরম।এটিও সংস্কৃতায়িত বাংলায় লেখা।বন্দনা বাংলা মায়ের।সপ্তকোটি কণ্ঠের এই কলকল নিনাদ বঙ্কিমের সমকালীন অখণ্ড বাংলার জনসংখ্যা।এই গান বাঙালীর কণ্ঠে আরোপ করেছেন ঋষি বঙ্কিম।এ গানটিও লুঠ হয়ে গেছে।বন্দেমাতরম কবে হয়ে গেছে ভারতমাতার বন্দনা।
পূব বাংলায় বাঙালীরা পাকিস্তানের ভ্রান্তি কাটিয়ে রক্ত দিয়ে প্রথমে ভাষা পরে ভাষার প্রণোদনায় জাতিচেতনায় ভাস্বর হয়েছেন।একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ প্রতিষ্ঠা করেছেন।মাতৃভাষার আবিশ্ব মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছেন।বিপ্রতীপে এই যে ভারতীয় হিস্যার বাংলা তা আসলে দিল্লীর কলোনী মাত্র।হিন্দীগ্রস্ত।
‘আমরা' এখানে পারি নি।আমাদের যৌথ পরিবারের অতীত শরীক আজকের যে বাংলাদেশ তারা পেরেছেন।আমরার ভাই পেরেছেন।তাহারই গরবে-----
এই গৌরবে আমাদের অধিকার আছে তো? আমরার অংশ আছে? বরাক বাংলায় অন্তত ১৯ শে মে আছে।আছে বিশ্বের মাতৃভাষা আন্দোলনের প্রথম মহিলা শহীদ কমলা ভট্টাচার্য।আর তার দশ ভাই চম্পা।কিন্তু ভারতীয় বাঙালীরা ভারতের যে যেখানেই থাকুন যে সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব ও পোষণ কামনা করেন কোলকাতার কাছে, পশ্চিমবঙ্গের কাছে তা তারা পাচ্ছেন কই?তার অবদান?আছে তার বড় মুখ করে বলার মত কিছু?
ভারতে প্রবাসী বাঙালী আজ যত না বিপন্ন, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালী তারও চেয়ে দ্রুত পায়ের তলার মাটি হারাচ্ছেন।
গুগল ঘাঁটতে বসেছিলাম বাহান্নয় কোলকাতার কাগজে একুশের খবর কিভাবে ছাপা হয়েছিল।সেই সময়ের দুটি প্রধান কাগজ যুগান্তর আর বসুমতী বর্তমানে অবলুপ্ত।কোন হদিশ পেলাম না।আনন্দবাজারে দেখলাম প্রথম পাতায় শিরোনাম হয়েছিল।বরাকের আত্মবলিদান আলোড়ন তুলেছিল। ১৯ শে মে খবর হয়েছিল একষট্টিতে।
ওই পর্যন্তই।একুশের শিক্ষায় এপারের বাঙালী সে অর্থে শিক্ষিত হয় নি।হলে উনিশের আত্মবলিদান তার হাতে যে দুর্বার আয়ূধ তুলে দিয়েছিল ভারতের সমগ্র বাঙালীর হয়ে তার সদ্ব্যবহার সে করতে পারত ।বরাকের ভূমিপুত্র বাঙালীরা এমনকি স্বতন্ত্র রাজ্যের দাবীও তোলায় সমর্থ হন নি।বাঙালী জাতিসত্ত্বার ধারণাটিই অলীক অবাস্তব ভারতীয় জাতিকল্পনায় বিলীন হয়েছেহয়েছে দিনে দিনে।হিন্দীকে কেন্দ্র করে হিন্দীবলয় ছলে বলে কৌশলে গতরে বেড়েছে।একটি বাংলা বলয় কিন্তু বাংলাভাগের পরেও স্বাভাবিক বিকাশের সম্ভাবনায় ছিল।আমরা তার যত্ন নিই নি। 
আমরা শুধু দখল করেছি বক্তৃতার মঞ্চ।ভাষার জন্য আমরার ভাই যা করল তার জন্য একদিনের উৎসব।তারপর?
আমরা তো হেরে বসে আছি।
বাহান্নয় আমার বয়স ছিল চার+।একষট্টিতে আসামে বাঙালী খেদানোর বছরে আমি হাই স্কুলের ছাত্র।একুশের আবেগে শিলচরের ভাষা শহীদদের স্মরণ করেছি।কিন্তু একুশ বা উনিশ কোন দিনটিই উদযাপনের ধারাবাহিকতা তৈরী হয় নি তখনও।অন্তত আমি মফস্বলে যে গ্রামশহরে বাস করতাম।বাগনানে।একুশ সাড়ম্বরে পালিত হওয়ার একটি পরম্পরা এখানেও তৈরী হল একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার অভিঘাতে।
একটি ঘটনার কথা বলে আপাতত দাঁড়ি টানব।
একাত্তরেই,নাকি বাহাত্তরে,একুশে উদযাপনের জন্য রূপনারায়ণের দুই পারের দুই জেলার দুটি শহর জোট বাঁধল।উৎসব পালিত হবে বাগনান কলেজে।উদ্যোগ বাগনান কোলাঘাটের বুদ্ধিজীবীরা।ব্যানারে কি নাম ছিল মনে নেই।বক্তা হিসাবে আহূত তখন বাংলার চালচিত্র আর ইলিশমারির চর খ্যাত আবদুল জব্বার।
জব্বারের লেখার আমি তখনই ভক্ত হয়ে গেছি। মুক্তমনা। উদার। সাহসী। যুক্তিবাদী।ব্রাহ্মণ রোমান ক্যাথলিক সংবাদের আদলে তিনি তখন ধারাবাহিক লিখছেন যুক্তিবাদী আর মৌলবাদীর বিবাদবিসংবাদ।তাঁর লেখার শিরোনামটি মনে পড়ছে না যদিও।
মেঘনাদ সাহা যেমন বিদ্রূপে জর্জরিত করেছিলেন সব ব্যাদে আছে এই আপ্তবাক্য, জব্বার মৌলবীকে তীক্ষ্ণ প্রশ্নে জর্জরিত করছেন--- কোরানে সব আছে? তো কোন আয়াতে আছে আরবের মাটির তলায় তরল সোনার সুলুক বা তা উত্তোলনের সাধন? থাকলে আহা আরব লুঠপাট করে, ভিক্ষা করে হাজার বছর কাটাত না।বিজ্ঞান না দিলে আজকের বৈভব তারা পেত কোথায়? তালাক নিয়ে অকপটে লিখছেন কোন হিন্দু পাত্র যদি তার কণ্যার,পানিগ্রহণ করে তিনি আশ্বস্ত হবেন।জব্বার এসব লিখছেন তাঁর সম্প্রদায়ের পত্রপত্রিকাতেই।কই, অসহিষ্ণু প্রতিক্রিয়া তাঁকে সইতে হয় নি।আমার ওনাকে দেখার ও ওনার সাথে আলাপ করার তীব্র বাসনা ছিল।সুযোগ ছাড়লাম না।
মনে আছে প্রথম সাক্ষাতে আমি একটু হতাশ হয়েছিলাম। সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে সোচ্চার কথাকার এসেছিলেন মাথায় ফেজ, সাদা পায়জামা আর কুর্তায়।ঠোঁট তাম্বুল রঞ্জিত।দর্শনে হুজুর।পরে আলাপে জেনেছিলাম নামাজীও।ওনার জিহাদ বাইরে গিয়ে নয়।ভিতরে থেকেই।এমনটাই বলেছিলেন।
সে যাই হোক।জব্বার সাহেবের সেদিনের ভাষণ স্মৃতি থেকে শোনাই।
“আমার নাম আবদুল জব্বার।আমায় আজ এই অনুষ্ঠানে ভাষাদিবসের স্মরণে বলার জন্য ডাকা হয়েছে।আমাকেই কেন?আপনারা হয়তো আশা করেন আমি অন্যে যা বলে না তাই বলব।আমার মত বলব।
শুরুতেই বলি লিখে সম্প্রতি আমার একটু নামযশ হয়েছে বটে।একটি বই ইংরাজীতে অনুবাদও হচ্ছে।আমি ঠিক বেঠিক বুঝব না।বলে রাখি আমার স্কুলের বিদ্যে ক্লাস এইট।
আমার বাড়ি সাতগাছিয়ায়। আমার বাবা ছিলেন হাওড়ার একটি জুটমিলের শ্রমিক।জুটমিল বন্ধ থাকলে চাষী।গরীবের সংসার।মা সংসারে আয়ের জন্য লোকের বাড়ি বাসন মেজেছেন।মায়ের সাথে হাত লাগিয়েছি কখনও আমিও।আবার ক্ষেতে হালও টেনেছি বাবার সাথে।তো বুঝলেন কিনা বাংলা সাহিত্যে কলম ধরেছে এই প্রথম এক গাঁয়ের লেখক যে কিনা গায়ে গতরে  জানে কত ধানে কত চাল।এর আগে আমাদের সাহিত্যের গ্রামজীবনের তিন মহারথী বিভূতিবাবু,তারাশঙ্কর বা মাণিকবাবু তিনজনই বামুন।আমি লিখছি মাটির অভিজ্ঞতায়। তো আমি যে ভালো লিখব এতে আশ্চর্য কোথায়?”
এই ঢাক পেটানো বলা বাহূল্য কেমন উৎকট আর গ্রাম্য লাগল।জব্বার বলেই চললেন—"তারাশঙ্করের ওই গল্পটার কথা আপনাদের মনে করিয়ে দি তাহলে? ওই যে যেখানে তিনি লিখছেন – তখন উদয়নাগ ফণা তুলিয়া নাচিতে লাগিল।তা উদয়নাগের যে ফণা হয় না তা লেখক পাঠক দুজনেই জানেন না যখন রসগ্রহণে বাধা হয় না।কিন্তু আমার মত গেঁয়োর চোখে পড়লে মন খিচখিচ করেই।
প্রকৃতির থেকে পাঠ নিয়েছি।আমি অনেক শব্দের সুলুক জানি যা হয়তো অভিধানেও নেই, আপনাদের লব্জে নেই।সুপারী পাতার শিরাটিকে কি বলে জানেন? বা নারকেল গাছ বাইতে শিউলিরা প্রথম ডালটিকে কি নামে চেনে? চলিত নাম?
মুসলমান শ্রমিক ও এক কৃষক রমনীর হতদরিদ্র সন্তান আমি।বাংলায় কথা বলি।তবু কেউ আমায়, আমাদের বাঙালী বলে না।হিন্দুরা আমাদের পাড়া ঘিরে আছে।তাদের অনেক বর্ণময় বাহারী উৎসব।পুজোয় দেখতে গেছি উজ্জ্বল প্রতিমা।আলোর বাহার।হাত পেতে প্রসাদ নিয়েছি।মণ্ডপে মণ্ডপে।পেট ভরে।এবং হিংসায় জ্বলেছি।হ্যাঁ,হিংসায়।বাঙালীদের পুজো।কবে এই বাঙালীদের জাত মারব? 
আপনারা তো জানেন একজন মুসলমানের লালিত স্বপ্নই হল অন্তত একজন হিন্দুর জাত মারা।তাতে পূণ্য না হোক,প্রতিশোধ তো হয়!”
সর্বনাশ। এসব কি বলছেন জব্বার!উস্কানিমূলক!
• “ সত্যি কথা হল পশ্চিমবাংলার যেসব হিন্দুরা একদিন নিজেরা বাঙালী পরিচয়ের সত্ত্ব ভোগ করেছেন, বাংলাভাষী মুসলমান প্রতিবেশীকে বাঙালী বলেই স্বীকার করেন নি পাশের দেশ বাংলাদেশ আজ সত্যি সত্যিই তাদের জাতে মেরেছেন।বিশ্বের দরবারে সে দেশের সংখ্যাগুরু মুসলমান, ধর্মনির্বিশেষেই, বাঙালী।ভারত ভূখণ্ডে আপনাদের পরিচয়? “
বলার মোচড়ে আমি পুলকিত।কিন্তু জব্বার সাহেবের বিস্ফোরণ তখনও বাকি।
“ আমি আজ এই মঞ্চে আপনাদের খুশী করতে আসি নি।নিজেরা বিনা পরিশ্রমে, বিনা রক্তপাতে প্রতিবেশীর অর্জন নিয়ে মঞ্চ কাঁপাতে এসেছেন।মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় শিলচরের বাঙালীদের লড়াই তাও আপনাদের জাগাতে পারে নি।আপনারা ভীরু। প্রবঞ্চক। আত্মম্ভরী ।ভণ্ড।বাংলাভাষার শহীদদের স্মরণ করার যোগ্যতা অর্জন করুন আগে।তারপর মুখ দেখাবেন।
আপনাদের জন্য অজস্র ঘৃণা ছাড়া আমার আর কিছু দেওয়ার নেই।”
জব্বার মঞ্চ থেকে নেমে আতিথেয়তার কোন সুযোগ না দিয়েই নিষ্ক্রান্ত হলেন।
দিন কিন্তু বদলাচ্ছে।
ওপারে সবই সুখের ছবি নয়
ওপারে আছে দুঃখ বারোমাস
ওপারে তবু বাঙালী করে বাস
এপারে যারা কি তার পরিচয়?
একদিন লিখেছিলাম।বাংলাদেশ জীবনযাপনের নানা সূচকে আজ প্রতিবেশী ভারত বা এককালের কার্যত প্রভূ পাকিস্তানকেও টপকে গেছে।এখানে মাতৃভাষার অধিকার নিয়ে সরব হচ্ছেন নানা জাতি।ভারতীয় বাঙালীরাও ব্যতিক্রম নন।একুশের শিক্ষায় আর উনিশের শপথে উজ্জীবিত আজকের যুবকেরা। বাঙালীরা।এইখানেই আশা।আলো।
জয় বাংলা।

সৌজন্যে: সাপ্তাহিক ধাবমান

সর্বশেষ সংবাদ